মালিকপক্ষ নন, রাজ্য সরকার-ই চা বাগানের দায়িত্ব নিক, মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে দেওয়া স্মারকলিপিতে এমনই আর্জি জানালেন রেডব্যাঙ্কের শ্রমিকদের। বুধবার মাদারিহাটে সরকারি সভায় বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধে বিলি করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মুখ্যমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দিতে বানারহাটের রেডব্যাঙ্ক চা বাগানের শ্রমিকরা এ দিন মাদারিহাটে এসেছিলেন। সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পৌঁছতে না পারলেও, সরকারি অফিসারদের হাতে স্মারকলিপি দেন তাঁরা। শ্রমিক রাজু গুরুঙ্গ বলেন, “অফিসারেরা স্মারকলিপি নিয়েছেন। আমরা চাই রাজ্য সরকার বাগানের দায়িত্ব নিক। মুখ্যমন্ত্রীও একবার বাগানে আসুন, দুর্দশা দেখুন।”
শ্রমিকেরা জানান, ২০০৩ সালে প্রথমবার বাগান বন্ধ হয়ে যায়। তারপরে গত ১১ বছর ধরে কয়েক দফায় বাগান খুললেও, দু’তিন মাস বাদেই ফের বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বারবার বাগান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অর্ধাহার অপুষ্টি জাঁকিয়ে বসেছে। গত সোমবার বাগানের শ্রমিক জুলা ওঁরাওয়ের (৫০) বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ। এ নিয়ে অপুষ্টি, অর্ধাহারে বাগানে ৩৭ জনের মৃত্যু হল শ্রমিকদের দাবি। বন্ধ বাগানে বিদ্যুৎ নেই, পানীয় জলের সঙ্কটও তীব্র। নদী, ঝোরার জল পান করতে হয়। আগামী বর্ষার মরসুমে জলবাহিত রোগের প্রকোপের আশঙ্কা করছেন শ্রমিকরা। বাগানে অ্যাম্বুলেন্সও নেই। সপ্তাহে দু’দিন চিকিৎসক আসলেও, রাতে কেউ অসুস্থ হলে বাগানের বাইরে নিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। বন্ধ বাগানে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কায় রয়েছেন শ্রমিকরা। এই পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দিয়ে রাজ্য সরকারের ছত্রছায়ায় আসতে চেয়েছেন শ্রমিকরা। মুখ্যমন্ত্রী ডুয়ার্স সফরে এসে, বন্ধ বাগান খোলাতে উদ্যোগী হবেন বলে আশাবাদী রেডব্যাঙ্ক গ্রুপের দেড় হাজারেরও বেশি শ্রমিক। এ দিন রাজু গুরুঙ্গ, শক্তি থাপার নেতৃত্বে অন্য শ্রমিকরা সভায় এসেছিলেন।
শ্রমিকদের দাবিকে সমর্থন জানিয়েছে আদিবাসী বিকাশ পরিষদও। পরিষদের রাজ্য সম্পাদক তেজকুমার টোপ্পো বলেন, “ডুয়ার্সের যে সব বাগানে মালিকপক্ষের থেকে বাগান খোলার বিষয়ে কোনও সদর্থক ইঙ্গিত মিলছে না, তাদের মধ্যে রেডব্যাঙ্ক অন্যতম। রাজ্য সরকার নিজেই যাতে বাগান অধিগ্রহণ করে চালায় সে বিষয়টি আমরাও মুখ্যমন্ত্রীকে জানাব।” প্রসঙ্গত আজ, বৃহস্পতিবার মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে পরিষদের নেতাদের বৈঠক রয়েছে। উল্লেখ্য ১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ৫৫৩ হেক্টরের চা বাগান রেডব্যাঙ্ক ডুয়ার্সের অন্যতম। আশির দশকের গোড়া থেকেই বাগানে নানান সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে বলে অভিযোগ। শ্রমিকদের অভিযোগ ২০০৩ সালের পর থেকেই বাগান দফায় দফায় বন্ধ হতে শুরু করে। গত বছরের ১৯ অক্টোবর বন্ধ হওয়ার পরে বাগানটি আর খোলেনি। বাধ্য হয়ে বাগানের অনেকেই শ্রমিকের কাজ নিয়ে ভিনরাজ্যেও চলে গিয়েছেন বলে অভিযোগ।
বাগানের শ্রমিক বাঁশদেও ওঁরাও, সুনীতা ওঁরাওদের কথায়, “পাতা তোলার কাজ ছাড়া অন্য কাজ শিখিনি। তাই আমাদের অন্য কাজে নিতে কেউ উৎসাহও দেখায় না। কতদিন কাজ না করে চলবে জানি না। ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করে রয়েছে তাও জানি না।” বাগানের প্রধান করণিক দেবব্রত পাল বলেন, “বর্ষা এসে গিয়েছে। বাগানের চা গাছে নতুন পাতাও গজিয়েছে। দ্রুত বাগান না খুললে এবারের বর্ষায় পাতা নষ্ট হয়ে যাবে। বাগান আগাছায় ঢেকে যাবে। তখন আর বাগান খুলেও কোনও লাভ নেই. আমরা মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের আশায় রয়েছি।”
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, পাশাপাশি তিনটে বাগান একসঙ্গে রেডব্যাঙ্ক বলে পরিচিত। এর মধ্যে মূল রেডব্যাঙ্ক বাগানে শ্রমিক সংখ্যা ৮৮৬, সুরেন্দ্রনগর চা বাগানে ৩১৪ এবং ধরণীপুরে ৩৫৭ জন শ্রমিক রয়েছে। তিনটে বাগানের কারখানাও এক।