Advertisement
E-Paper

লাইন পেরোতে গিয়ে ট্রেনের ধাক্কায় মৃত ৩

বাপের বাড়িতে থাকা আট বছরের মেয়ের কান্নাকাটি জুড়েছিল ফোনে। রাতে তা শুনে সকালেই তাকে দেখতে বেরিয়েছিলেন ফারিদা বিবি। সঙ্গে ছিল চার বছরের একমাত্র ছেলে। আকলিমা বিবি সারারাত প্রচণ্ড পেটের যন্ত্রণায় কাহিল হয়েও সকালে চার ছেলেমেয়েকে পান্তাভাত খাইয়ে বের হয়েছিলেন।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১২ ডিসেম্বর ২০১৫ ০২:৫৪
কান্নায় ভেঙে পড়েছেন মৃতদের পরিজনেরা। ছবি: বাপি মজুমদার।

কান্নায় ভেঙে পড়েছেন মৃতদের পরিজনেরা। ছবি: বাপি মজুমদার।

বাপের বাড়িতে থাকা আট বছরের মেয়ের কান্নাকাটি জুড়েছিল ফোনে। রাতে তা শুনে সকালেই তাকে দেখতে বেরিয়েছিলেন ফারিদা বিবি। সঙ্গে ছিল চার বছরের একমাত্র ছেলে। আকলিমা বিবি সারারাত প্রচণ্ড পেটের যন্ত্রণায় কাহিল হয়েও সকালে চার ছেলেমেয়েকে পান্তাভাত খাইয়ে বের হয়েছিলেন। যদি ফিরতে দেরি হয় এই ভেবে। কোলে ছিল দু’বছরের ছেলে। যন্ত্রণায় সামলাতে না পেরে কোলে নিয়েও ফের নামিয়ে বাড়িতে রেখে যান ছেলেকে। রাস্তায় বেরিয়ে দেখা হয়ে গিয়েছিল প্রতিবেশী ওই দুই মহিলার।

বাসস্ট্যান্ডে যাওয়ার জন্য একই সঙ্গে রেললাইন পার হচ্ছিলেন তাঁরা। কিন্তু যাওয়া আর হল না। লাইন পেরোনোর সময় ট্রেনের ধাক্কায় ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল তাঁদের দেহ। ফারিদার কোলে থাকা জখম রুহুল আমিনকে মালদহ মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যাওয়ার আগেই মৃত্যু হল তারও। মালদহের চাঁচলের কান্ডারনে সামসি স্টেশনের অদূরে শুক্রবার সকাল আটটায় ওই দুর্ঘটনার পর এলাকা জুড়েই শোকার্ত বাসিন্দারা। রাঁচিগামী ঝাঝা এক্সপ্রেসের ধাক্কায় ওই তিনজনের মৃত্যু হয়েছে বলে রেল পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। কুয়াশার জন্যই প্রচণ্ড গতিতে ছুটে আসা এক্সপ্রেস ট্রেনটির গতিবিধি তাদের নজরে আসেনি বলে প্রাথমিকভাবে সন্দেহ রেল পুলিশের। মালদহ জিআরপির আইসি কৃষ্ণগোপাল দত্ত বলেন, ‘‘কুয়াশা, নাকি তড়িঘড়ি পার হতে গিয়ে দুর্ঘটনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’’ গত বছর অগস্টের সাত তারিখে হরিশ্চন্দ্রপুরের কুমেদপুরে ধনেপাড়া এলাকায় রেলসেতু পার হওয়ার সময় শতাব্দী এক্সপ্রেসের ধাক্কায় তিন শিশু ও তিন মহিলা-সহ ছ’জনের মৃত্যু হয়।

মৃত ফারিদা বিবি (২৫), তাঁর শিশুপুত্র রুহুল আমিন (৪) ও আকলিমা বিবি-র(৩৫) বাড়ি রেললাইনের ওপারে কান্ডারন ভেস্টপাড়ায়। ফারিদা বিবির স্বামী শেখ ইব্রাহিম দিনমজুর। তাঁর বড় মেয়ে শামিমা খাতুন রতুয়ার ভাদোতে মামাবাড়িতে থেকে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। দেড় মাস বাবা-মাকে দেখতে না পেয়ে বৃহস্পতিবার রাতে তাকে দেখতে যাওয়ার জন্য বাবার কাছে ফোনে কান্নাকাটি জুড়ে দেয় সে। ধান ঝাড়াইয়ের কাজ থাকায় এ দিন স্ত্রীকে মেয়েকে দেখতে পাঠান ইব্রাহিম। চার বছরের ছেলেও ছিল তাঁর সঙ্গে। আর আকলিমার স্বামী আব্দুস সামাদ ভিন রাজ্যে শ্রমিকের কাজ করেন। রাত থেকে পেটে ব্যথা শুরু হওয়ায় সকালে সামসিতে ওষুধ আনতে বের হন তিনি। ফিরতে দেরি হতে পারে ভেবে এক ছেলে ও তিন মেয়েকে পান্তাভাত খাইয়ে দু’বছরের ছেলে মহম্মদ আসিফকে কোলে নিয়ে বের হতে যান। কিন্তু পেটে ব্যথার জন্য কোলে নিতে অসুবিধে হওয়ায় তাকে ফের নামিয়ে দেন।

Advertisement

রাস্তায় বেরিয়ে দেখা হয়ে যায় ফারিদা ও আকলিমার। রেললাইনের ওপারে বাড়ি হওয়ায় লাইন পেরিয়েই যাতায়াত করতে হয় তাদের। আপ লাইন পেরিয়ে গেলেও ডাউন লাইনে ছুটে আসা ঝাঝা এক্সপ্রেসের ধাক্কায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় দুই মহিলার দেহ। রুহুল মায়ের কোল থেকে ছিটকে গুরুতর জখম হয়। ট্রেনযাত্রীদের চিত্কারে কিছুটা এগিয়েই ট্রেন থেমে যায়। যাত্রীদের চিত্কারে প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। তখনও রুহুল বেঁচে থাকায় রেল পুলিশ ওই ট্রেনেই তাকে মালদহে নিয়ে যায়। পথেই মৃত্যু হয় তার।

ফারিদার স্বামী ইব্রাহিম কাঁদতে কাঁদতে কোনও রকমে বলেন, ‘‘আমি সঙ্গে থাকলে আমার স্ত্রী ও ছেলেকে এ ভাবে মরতে হত না।’’ আকলিমার স্বামী ভিন্‌ রাজ্যে। তাঁর তিন মেয়ে ও ছেলে জানেই না যে মা আর ফিরবে না।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy