তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা ওরাকল সম্প্রতি এক দিনের নোটিসে বিশ্বব্যাপী বিপুল সংখ্যক কর্মী ছাঁটাই করেছে, এবং ভারতেও সেই সংখ্যাটি উল্লেখযোগ্য। সমগ্র বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সংস্থাটি জানিয়েছে, এই ছাঁটাই তাদের ‘কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস’-এর অঙ্গ। তাদের আধিকারিকরা দ্বিধাহীন ভাষায় জানিয়েছেন, তাঁরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই পরিকাঠামোতে বিপুল বিনিয়োগ করেছেন, এবং সেই কারণে বেতন বা চাকরির উপরে কোপ স্বাভাবিক ছিল। অর্থাৎ, ওরাকল-এর এই সিদ্ধান্ত আদৌ তাদের আর্থিক দুরবস্থার জন্য নয়— বরং পরিবর্তিত বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ-মুনাফা বৃদ্ধির পথে হাঁটার একটি ধাপ।
শুধু তা-ই নয়, একটু পিছনে তাকালেই দেখা যায় যে ২০২৬-এর শুরু থেকে প্রযুক্তি সংস্থাগুলিতে বড় মাপের কর্মী ছাঁটাইয়ের ঢেউ দেখা গিয়েছে, যাদের মধ্যে আইবিএম, অ্যামাজ়ন প্রভৃতি সংস্থাও রয়েছে, এবং যাদের উদ্দেশ্য মোটামুটি অভিন্ন। এগুলি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এক বৃহত্তর প্রবণতারই ইঙ্গিত। সাম্প্রতিক কিছু কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত তথ্য ইঙ্গিত করছে যে, যেখানে সাধারণ প্রযুক্তিবিদের চাহিদা কিছুটা কমেছে, সেখানে এআই-সম্পর্কিত দক্ষতার চাহিদা তুলনামূলক ভাবে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ছবি়টা স্পষ্ট— প্রযুক্তি সংস্থাগুলি ক্রমশ এআই-সংক্রান্ত কাজের দিকে ঝুঁকছে, এবং সেই প্রক্রিয়ায় প্রচলিত কাজের সুযোগ কমছে।
এই এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মূলত চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং সংশ্লিষ্ট উদ্ভাবনের ফসল। এই ডিজিটাল বিপ্লব উৎপাদন ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রযুক্তির সম্মিলন ঘটিয়ে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে যন্ত্র কেবল তথ্য প্রক্রিয়াকরণই নয়, বিশ্লেষণ এবং সিদ্ধান্তগ্রহণেও ক্রমশ সক্ষম হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কার্যত সমগ্র ব্যবস্থার ‘মস্তিষ্ক’ হিসেবে কাজ করছে। ফলে আশঙ্কা স্বাভাবিক— যদি যন্ত্র এতটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ, দক্ষ এবং ত্রুটিহীন হয়ে ওঠে, তা হলে ভারতের মতো শ্রমনির্ভর অর্থনীতিতে মানব শ্রমের ভূমিকা কোথায় দাঁড়াবে? শ্রমশক্তির উপরে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে— এই সম্ভাবনাকে অস্বীকার করা কঠিন।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে নব্বইয়ের দশকের তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবের প্রসঙ্গ উঠে আসে। সেই বিপ্লব ভারতে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ঘটালেও দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমের মধ্যে একটি স্পষ্ট বিভাজন তৈরি করেছিল। ভারতীয় শ্রমবাজারে অদক্ষ শ্রমিকের আধিক্যের পিছনে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থার ঘাটতি। ফলে অদক্ষ শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা কম ছিল এবং তথ্যপ্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষমতাও সীমিত ছিল। এর ফলে আয়গত বৈষম্য বৃদ্ধি পায় এবং একটি সুস্পষ্ট ‘ডিজিটাল ডিভাইড’ তৈরি হয়।
কিন্তু চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এই বিভাজনকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে। এআই প্রযুক্তির প্রয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের প্রেক্ষাপটে বড় মাপের কর্মী-ছাঁটাই একটি নতুন শ্রেণির জন্ম দিচ্ছে— যাঁরা দক্ষ, কিন্তু এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনুপযোগী। এই কর্মীরা এত দিন প্রযুক্তিগত দক্ষতার ভিত্তিতেই তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় কর্মরত ছিলেন। কিন্তু প্রযুক্তির সংজ্ঞা বদলে যাওয়ার ফলে তাঁরা শুধু কর্মহীনই হচ্ছেন না, অর্থনীতির মূলস্রোতে থাকার সম্ভাবনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
এই প্রবণতার পিছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক যুক্তিও কাজ করছে বলে মনে হয়। অনেক সংস্থা হয়তো মনে করছে, বর্তমান কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণের তুলনায় নতুন প্রজন্মের এআই-প্রশিক্ষিত কর্মী নিয়োগ করা তুলনামূলক ভাবে সহজ ও লাভজনক। একই সঙ্গে, দ্রুত পরিবর্তনশীল বাজারের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিদ্যমান কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন সব সময় সম্ভব নাও হতে পারে— এই ধারণাও ক্রমশ জোরদার হচ্ছে। ফলে দক্ষ শ্রমশক্তির একাংশ বাজারের বাইরে সরে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।
আমরা জানি, ভারতের মতো দেশে এআই সফল ভাবে প্রয়োগ করতে গেলে প্রয়োজন উপযুক্ত পরিকাঠামো, যা উৎপাদনশীলতা এবং কর্মসংস্থান— উভয়েরই বৃদ্ধি ঘটাতে পারে। কিন্তু এই বৃহত্তর প্রশ্নের বাইরে, এআই ইতিমধ্যেই শ্রমবাজারের শ্রেণিগত কাঠামোকে নতুন করে বিন্যস্ত করছে। অদক্ষ শ্রমিকের সমস্যা দীর্ঘ দিনের। কিন্তু এখন দক্ষ শ্রমিকদের মধ্যেও বিভাজন তৈরি হচ্ছে— যাঁরা এআই-সক্ষম এবং যাঁরা নন।
এই নতুন বিভাজন আর্থিক অসাম্যকে আরও তীব্র করতে পারে। কারণ, এক দিকে এআই-সক্ষম শ্রমশক্তির চাহিদা বাড়বে, অন্য দিকে একটি অংশ দক্ষ হয়েও কর্মসংস্থানের বাইরে চলে যেতে পারে। এই শ্রমশক্তি কি অভিযোজনের মাধ্যমে আবার অর্থনীতির মূলস্রোতে ফিরতে পারবে, না কি স্থায়ী ভাবে বেকারত্ব বৃদ্ধি করবে— সেটাই আগামী দিনের মূল প্রশ্ন।
অধ্যক্ষ, নেতাজিনগর কলেজ
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)