অফিস-ঘরে ছাত্রীর গালে চুমু খাওয়ার অভিযোগে বেধড়ক মারধরের জেরে অসুস্থ সেই কলেজ-কর্মীর মৃত্যু হল। শুক্রবার সকালে শিলিগুড়ির একটি নার্সিংহোমে মারা যান দেবরাজ ভৌমিক (৩২) নামে শহরের উপকণ্ঠে দাগাপুরের একটি বেসরকারি কলেজের ওই কর্মী। গত সোমবার তাঁর বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ করেন প্রথম বর্ষের এক ছাত্রী। মঙ্গলবার কলেজে ঢুকে তাঁকে মারধর করা হয়। অভিযোগ, ওই ছাত্রীর আত্মীয়-স্বজনদের একাংশই দেবরাজবাবুকে মারধর করেছেন। তাতে কলেজের একাংশও সামিল হন। মারের চোটে মাথায় আঘাত পেলে তাঁকে নার্সিংহোমে ভর্তি করানো হয়। এদিন সকালে তাঁর মৃত্যু হয়।
পুলিশ জানায়, দেবরাজবাবুর বাবা জগন্নাথবাবু কলেজ কর্তৃপক্ষের দিকেই অভিযোগের আঙুল তুলেছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে ফের পুলিশে অভিযোগ করবেন বলেও জানান তিনি। জগন্নাথবাবু বলেন, ‘‘কলেজ কর্তৃপক্ষ সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশে জানালে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যেত। তা হলে এমন ঘটনার অবকাশ থাকত বলে মনে হয় না। আমি কলেজ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ফের অভিযোগ করব।’’ সেই সঙ্গে যাঁরা আইন নিজেদের হাতে তুলে নিয়ে তাঁর ছেলেকে মারধর করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছেন, তাঁদের গ্রেফতার করে কড়া শাস্তির দাবি তুলেছেন জগন্নাথবাবু।
যদিও কলেজ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে অন্যতম কর্ণধার সুজিত রাহা বলেছেন, ‘‘আমাদের তরফে গাফিলতি হয়নি। যে দিন অভিযোগ হয়েছে, পরদিন মিটিং ডাকা হয়। মিটিঙের আগেই কলেজে ঢুকে দেবরাজকে মারধর করা হয়েছে। আমরা পুলিশের কাছে অভিযোগ জানিয়েছি। আশা করব, দেবরাজকে দুনিয়া থেকে যাঁরা সরিয়ে দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’ মৃতের পরিবারকে সব রকম সাহায্য করা হবে বলে সুজিতবাবু জানিয়েছেন।
শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশনার মনোজ বর্মা বলেন, ‘‘অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হবে। তাঁদের খোঁজে তল্লাশি চলছে। সকলেই ঘটনার পর থেকে পলাতক। তবে কলেজ কর্তৃপক্ষের গাফিলতি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’ পুলিশ কমিশনার জানান, কোনও কলেজে যৌন হয়রানি রুখতে কলেজ কমিটি তৈরি করতে পারে। তাঁর কথায়, ‘‘কমিটি কর্মীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের জন্য। কিন্তু, পুলিশকেও তখনই জানানো বাধ্যতামূলক। গোটা বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’’
এদিন সকাল ১১ টা ৪০ মিনিটে মারা যান দেবরাজবাবু। তাঁর খুলির ডান পাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। প্রচুর রক্তক্ষরণও হয় বলে নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। মঙ্গলবার সকালে তাঁকে মারধর করে কিছু ছাত্রছাত্রী ও বহিরাগতরা। তারপরেই গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে নার্সিংহোমে ভর্তি করানো হয়।
বন্ধ বিশ্ববিদ্যালয়। রায়গঞ্জে।
এদিন নার্সিংহোমে দাঁড়িয়েই কান্নায় ভেঙে পড়েন মৃতের বাবা ও ভাই। জগন্নাথবাবু অভিযোগ করেন, ‘‘ছেলেকে মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসানো হয়েছে। তবে সত্যি-মিথ্যা যাচাই করবে পুলিশ। কলেজের পক্ষ থেকে তখনই পুলিশকে জানানো উচিত ছিল। আমি কলেজের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করব।’’ কলেজে কর্মীদের নিরাপত্তার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। কলেজের অন্যতম কর্ণধার জি এস হোরা অবশ্য নিজেদের কোনও গাফিলতি দেখছেন না। তিনি বলেন, ‘‘আমরা ঘটনার কথা জানতে পেরে আমাদের কলেজের নিজস্ব সেলের মাধ্যমে দু’পক্ষকে নিয়ে আলোচনা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সে সুযোগই পেলাম না। কিছু ছাত্র ও বহিরাগতরা ঢুকে মারধর শুরু করল।’’ কিন্তু যদি ছাত্রীর শ্লীলতাহানির অভিযোগ হয়, তাহলে তা বিচার করার অধিকার কলেজের রয়েছে কি? এর জবাবে সুজিতবাবু বলেন, ‘‘আমরা প্রাথমিক আলোচনা করে পুলিশে অভিযোগ দায়ের করার কথা ভেবেছিলাম।’’
পুলিশ ও কলেজ সূত্রে জানা গিয়েছে, গত সোমবার দাগাপুরের একটি বেসরকারি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের এক ছাত্রী অভিযোগ করেন, অফিস-ঘরে তাঁর গালে জোর করে চুমু খান ওই কর্মী। ওই ছাত্রী কলেজের অধ্যক্ষা শম্পা ঘোষকে অভিযোগ জানালে তিনি বৈঠকে ডাকেন ওই কর্মী ও ছাত্রীকে। মঙ্গলবার ওই বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। সেখানেই বৈঠক চলাকালীন কিছু ছাত্র ও বহিরাগতরা গিয়ে ওই কর্মীকে বের করে মাটিতে ফেলে মারধর করেন বলে অভিযোগ। মাথায় গুরুতর চোট লাগে তাঁর।