Advertisement
E-Paper

সাইকেল চেয়ে স্তব্ধ শিলিগুড়ি

সাইকেল না-পাওয়ার ক্ষোভ পথ অবরোধ পর্যন্ত গড়িয়েছিল গত সোমবারেই। মুখ্যমন্ত্রী সে দিন পড়ুয়াদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, সবাই পাবে ধীরে ধীরে। তাতেও যে ক্ষোভ পুরোপুরি কমেনি, সেটা বোঝা গেল ৪৮ ঘণ্টা পরেই।

কৌশিক চৌধুরী

শেষ আপডেট: ২৮ জানুয়ারি ২০১৬ ০১:৫৩
(বাঁ দিকে) অবরোধের জেরে থমকে মহানন্দা সেতু। (ডান দিকে) থমকে বাস। উদ্বিগ্ন, ক্লান্ত খুদে পড়ুয়ারা। ছবি: সন্দীপ পাল ও বিশ্বরূপ বসাক।

(বাঁ দিকে) অবরোধের জেরে থমকে মহানন্দা সেতু। (ডান দিকে) থমকে বাস। উদ্বিগ্ন, ক্লান্ত খুদে পড়ুয়ারা। ছবি: সন্দীপ পাল ও বিশ্বরূপ বসাক।

সাইকেল না-পাওয়ার ক্ষোভ পথ অবরোধ পর্যন্ত গড়িয়েছিল গত সোমবারেই। মুখ্যমন্ত্রী সে দিন পড়ুয়াদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, সবাই পাবে ধীরে ধীরে। তাতেও যে ক্ষোভ পুরোপুরি কমেনি, সেটা বোঝা গেল ৪৮ ঘণ্টা পরেই। সাইকেল না পেয়ে শিলিগুড়ির একাধিক মোড় অবরোধে অচল করে দেয় পড়ুয়ারা। স্টেশন ফিডার রোড, জলপাই মোড় হয়ে হাসমি চক— আটকে যায় শহরের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু রাস্তা। এয়ারভিউ মোড় থেকে শহরের বহু গাড়িকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। তাতেও যানজট ঠেকানো যায়নি। প্রায় চার ঘণ্টা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে শহরের জনজীবন।

মাটিগাড়ার কাছে খাপরাইল মোড়ে ছাত্রছাত্রীরা একই দাবিতে অবরোধ করলে জাতীয় সড়কে যানজট হয়ে যায়। সন্ধ্যায় ফের বাগরাকোট এলাকায় সাইকেলের গুদামের সামনেও বিক্ষোভ দেখায় পড়ুয়ারা।

কেন বুধবার ফের অবরোধ? পড়ুয়াদের দাবি, তাদের অবিলম্বে সাইকেল দিতে হবে। তাদের অভিযোগ, এই নিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা সত্ত্বেও শিলিগুড়ির মহকুমাশাসক রাজনভির সিংহ কপূরের দেখা মেলেনি। তিনি না পৌঁছনো অবধি অবরোধ চলবে বলে তখন জানিয়ে দেয় আন্দোলনকারীরা। বেলা পৌনে ৩টে নাগাদ এসডিও এসে ঘোষণা করেন, সকলেই সাইকেল পাবে। কোন স্কুল কবে পাবে, তা-ও জানান তিনি। তার পরে পরিস্থিতি শান্ত হয়। এই ভোগান্তির জন্য তিনি ছাত্রছাত্রীদের কাছে দুঃখপ্রকাশও করেন। বলেন, ‘‘সাইকেলের যন্ত্রাংশ জুড়ে তা বিলি করতে হচ্ছে। একসঙ্গে বেশি তৈরি করা সম্ভব হচ্ছিল না। আমরা ৫০ জন অতিরিক্ত মেকানিককে কাজে লাগিয়েছি।’’ তাঁর কথায়, জেলাশাসকের নির্দেশে ৪ ফেব্রুয়ারির পর থেকে ধাপে ধারে এই সব সাইকেল বিলি করা হবে।

শহরের মেয়র অশোক ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘‘একসঙ্গে সবাই সাইকেল পাবে বলে দেওয়ায় বিভ্রান্তি ছড়ায়। প্রশাসন সঠিক ভূমিকা নেয়নি। তাতেই শহর নাকাল হল।’’

সাধারণ মানুষও স্কুলগুলির সঙ্গে আঙুল তুলেছেন প্রশাসনের দিকেও। তাঁদের বক্তব্য, পরপর দু’টো কাজের দিনে এমন পরিস্থিতি তৈরি হল। সোমবার অবরোধ হওয়া সত্ত্বেও বুধবার প্রশাসন আগাম কোনও ব্যবস্থাই নেয়নি। এ দিনও যে গোলমাল হতে পারে, তার কোনও ধারণাই ছিল না পুলিশ-প্রশাসনের। ফলে এ দিন ভোগান্তি হয়েছে অনেক বেশি।

উড়ালপুলের দিক থেকে হিলকার্ট রোডের দিকে ছুটোছুটি করছিলেন রুচিকা অগ্রবাল, পিন্টু সরকার, দেবপ্রিয় বিশ্বাসেরা। দাগাপুর, আড়াই মাইল এলাকায় তাঁদের ছেলেমেয়েদের স্কুল ১টা পর ছুটি হয়ে গেলেও বাস হিলকার্ট রোড, বিধানসভা রোড প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে স্তব্ধ। ফলে আটকে ছিল এই পড়ুয়ারা।

গুরুঙ্গবস্তি থেকে হিলকার্ট রোড হয়ে হাকিমপাড়ার নার্সিংহোমে ডাক্তার দেখাতে যাচ্ছিলেন সিমি তামাঙ্গরা। ছাত্রছাত্রীদের তাঁদের রাস্তা পার হতেও বাধা দেয়। শেষে পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। এনজেপি থেকে লোকাল বাস ধরে আশ্রমপাড়ায় ফিরছিলেন, বিনোদ শাহ, প্রীতি শাহ’রা। তাঁরা জানান, ‘‘আত্মীয়দের রাজধানী এক্সপ্রেসে তুলে বাড়ি ফিরছিলাম। হাসমি চকে প্রায় দুই ঘণ্টা দাঁড়াতে হয়েছে।’’ সেবক রোড থেকে মেয়েকে নিয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা পরে বাড়ি পৌঁছেছেন মহানন্দাপাড়ার বাসিন্দা কুন্তল গোস্বামী।

এ দিন সকাল ৯টা নাগাদ প্রথমে হিন্দি বালিকা বিদ্যালয়ের মেয়েরা স্টেশন ফিডার রোডে, হিন্দি হাইস্কুলের ছেলেরা জলপাই মোড়ে অবরোধ করে। এর পরে আর এক দফায় স্টেশন ফিডার রোডে দুই স্কুলের ছেলেমেয়েরা অবরোধ করে। পরে তাদের সঙ্গে গার্লস হাইস্কুল, বয়েজ হাইস্কুল, বালিকা বিদ্যালয়, বরদাকান্ত স্কুল, নীলনলিনী বিদ্যামন্দির, কৃষ্ণমায়া স্কুল, রবীন্দ্রনগর স্কুলের ছেলেমেয়েরা যোগ দেয়। গার্লস স্কুলের অলিভিয়া সরকার, প্রত্যুষা হাজরা হিন্দি বালিকা স্কুলের কোমল পাশোয়ান, নিকিতা ভুজেল বা বালিকা বিদ্যালয়েক কেয়া বণিক, নিশা সাহারা জানান, ‘‘২৫ জানুয়ারি থেকে আমাদের নানা ভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া হয়নি। শিক্ষক, শিক্ষিকারাও কিছু বলতে পারছেন না। তাই রাস্তায় বসা ছাড়া আমাদের উপায় নেই।’’

বেলা গড়াতেই ছেলেমেয়েদের সঙ্গে যোগ দেন বাবা-মায়েরা। তা নিয়ে কয়েক দফায় তাঁদের সঙ্গে পুলিশের কথা কাটাকাটিও হয়। স্বপ্না চক্রবর্তী, দেবশ্রী পাল, জয়া রায়, মৌমিতা আচার্যের মতো অভিভাবকেরা জানান, ১ ফেব্রুয়ারি থেকে মাধ্যমিক, ১৫ ফেব্রুয়ারি উচ্চ মাধ্যমিক। তার আগে ছেলেমেয়েগুলিকে এ ভাবে হেনস্থা করার কোনও মানে হয় না।

এ দিন সন্ধ্যায় সার্কিট হাউসে এক বৈঠকে মহকুমাশাসক স্কুলগুলিকে জানিয়ে দেন, আগের তিন দফার নিয়ম বাতিল করা হয়েছে। সমস্ত সাইকেল তৈরি করে ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে বিলি করা হবে। কিন্তু হাসমি চকে তিনিই এ দিন ঘোষণা করেছিলেন ২৮-২৯ জানুয়ারি দশম, ১-২ ফেব্রুয়ারি একাদশ এবং ৪-৫ তারিখ দ্বাদশ শ্রেণিকে সাইকেল দেওয়া হবে। এ দিন স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নিয়ে গেলে সাইকেল মিলবে। তা হলে কি এ মাসের শেষে আবার গোলমাল দেখা দেবে সাইকেল বিলি নিয়ে? বুধবার রাতে দ্বিধা নিয়েই ঘুমোতে গেল শিলিগুড়ি শহর।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy