বিচিত্রার ‘সপ্তবর্ণা নাট্যোৎসব’
উত্তর দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জে ‘বিচিত্রা’ নাট্যসংস্থার ৫০তম বছর পূর্তি উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হল ‘সপ্তবর্ণা নাট্যোৎসব’। সাত দিনের এই অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব সুধাংশু দে। উৎসবের প্রথম দিন মঞ্চস্থ হয় কলকাতার রঙরূপ প্রযোজিত নাটক ‘মায়ের মতো’। প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর সন্তান ভুলে যায় মা-বাবার প্রতি কর্তব্য পালনের কথা, ভুলে যায় তাঁদের যত্ন নিতে। এ নাটক সে কথাই বলে। রচনা-নির্দেশনা মোহিত চট্টোপাধ্যায় ও সীমা মুখোপাধ্যায়। দ্বিতীয় দিনেও মঞ্চস্থ হল রঙরূপেরই নাটক ‘অধরা মাধুরী’। নাট্যকার ও নির্দেশক তীর্থঙ্কর চন্দ ও সীমা মুখোপাধ্যায়। হাস্যরসাত্মক নাটকটিতে বিভিন্ন বিজ্ঞাপন যেমন ‘রোগা হওয়ার সহজ উপায়’, ‘ফ্রি গিফট’ কী ভাবে পারিবারিক দ্বন্দ্ব বয়ে আনে, তারই কাহিনি আবর্তিত হয়েছে। শিলিগুড়ির থিয়েটার আকাদেমি মঞ্চস্থ করে নাটক ‘বনরাজ’। এক নেতার স্ত্রীর উপস্থিতিতে নিছক দুর্ঘটনাবশত বনবাংলোর এক সাফাইকর্মীর মৃত্যু হয়। ঘটনাটিকে চাপা দেওয়ার জন্য সেই দম্পতি মৃত কর্মীর ছেলেটিকে দত্তক নেয়। পরবর্তী কালে ছেলেটি জঙ্গলেই ফিরে আসে এবং বনবাসীদের উন্নয়নে সামিল হয়। নাট্যরূপ ও পরিচালনা রমাপ্রসাদ বণিক ও কুন্তল ঘোষ। এক সংগীত-শিক্ষিকার স্বামী কী ভাবে তাঁর স্ত্রী ও পরিজনদের প্রবঞ্চনা করে সিনেমাজগতে প্রতিষ্ঠা পায়, তা ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়েছে ঋষি মুখোপাধ্যায় রচিত ও নির্দেশিত ‘পরিচিতি’ নাটকটিতে। কলকাতার নবময়ূখ সংস্থার নিজস্ব প্রযোজনা এটি। জলপাইগুড়ির কলাকুশলী-র নিবেদন ছিল নাটক ‘ভোকাট্টা’। স্কুলছুট এক ছেলের গল্প।—রচনা ও পরিচালনা: তমোজিৎ রায়। উৎসবের পঞ্চম দিনে মঞ্চস্থ হয় কোচবিহারের ইন্দ্রায়ুধ-এর নাটক ‘শেষ শিক্ষা’। রবীন্দ্রনাথের কবিতা অবলম্বনে গুরুগোবিন্দ সিংহের জীবনাশ্রিত এই নাটক প্রশ্ন জাগায়, রক্তের বদলে শুধু কি রক্তই, না কি ভালবাসা? নাট্যকার: সৌমিত্র বসু, নির্দেশনা: দীপায়ন ভট্টাচার্য। ষষ্ঠ দিনে অভিনীত হয় বহরমপুরের ‘ঋত্বিক’ নাট্যগোষ্ঠীর নাটক ‘আদি রাজা’। মূল নাটক জগদীশচন্দ্র মাথুর। নাটকটির উৎস কল্পকাহিনি। শেষ দিন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে বাংলাদেশের ‘আমাদের থিয়েটার’ নাট্যসংস্থা মঞ্চস্থ করে ‘প্রাগৈতিহাসিক’ নাটকটি। নাট্যকার ও পরিচালক মাহামুদুল ইসলাম সেলিম ও নয়ন বার্টেল।
মনীষী স্মরণে
মনীষী পঞ্চানন বর্মার সার্ধ শতবর্ষ উদযাপন করল ময়নাগুড়ির পঞ্চানন বর্মা স্মারক কমিটি। স্মরণ অনুষ্ঠান উপলক্ষে বসেছিল আলোচনা সভা। শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারে পঞ্চানন বর্মার ভাবনার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বলেন ড: আনন্দগোপাল ঘোষ। অধ্যাপক দীপককুমার রায়ের কাছ থেকে জানা যায়, ময়নাগুড়ি এলাকায় পঞ্চাননের ভাবাদর্শ কী ভাবে সমাজে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং সমাজসংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে কী ভাবে জনগণকে তিনি প্রভাবিত করেছিলেন। উমেশ শর্মার বক্তব্যে ধরা পড়ে, নতুন প্রজন্মের চোখে পঞ্চানন বর্মা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ডালিতে ছিল লোকনৃত্য ও লোকগান। চৈতন্যদেব রায় ও মনা রায়ের একক নিবেদনে ভাওয়াইয়া। তুক্ষ্যা আকাদেমি অব পারফর্মিং আর্টস পরিবেশন করে লুপ্তপ্রায় দোতারাডাঙা ও পালাটিয়া নৃত্য। রাজবংশী ভাষায় আধুনিক গান ও রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে শোনান সুজিত রায় ও চৈতালী ভট্টাচার্য। সবশেষে ছিল রাজবংশী ভাষায় লোকনাটক ‘রাবাণ’। রচনা ও নির্দেশনা: দীনেশ রায় এবং তীর্থঙ্কর রায়। সমীক্ষণ নাট্যগোষ্ঠী প্রযোজিত এই নাটকটি দর্শকদের মন ছুঁয়ে যায়। সমগ্র অনুষ্ঠানটির সূচনা করেন পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সুধাংশু- শেখর চট্টোপাধ্যায়। উপস্থিত ছিলেন সাংসদ বিজয়চন্দ্র বর্মন, বিধায়ক অনন্তদেব অধিকারী, হরিদয়াল রায়-সহ নানা বিশিষ্ট জন।
লিসবনের গ্যালারিতে হিমালয়
লিসবনের কলোরিডা আর্ট গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হল চন্দ্রনাথ দাসের ছবির প্রদর্শনী। দার্জিলিংয়ের হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের কিউরেটর চন্দ্রনাথের ছবির বিষয় হিসাবে উঠে এসেছে চার পাশের প্রকৃতি ও জীবন। মাধ্যম অ্যাক্রিলিক। ২০টি ছবির এই প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘হিলস বেকন’। এতে ‘টিবেটিয়ান ডান্সিং ওম্যান’ নামের ছবিটিতে ধরা পড়েছে লোসার উৎসবে নৃত্যরতা মহিলারা। ‘কুইন অব দ্য হিলস’ ছবিটির বিষয় দার্জিলিংয়ের ঐতিহ্যবাহী টয় ট্রেন। পাহাড়ে বসন্তকে বন্দি করেছেন তিনি রডোডেনড্রনের প্রতীকে। ‘মনসুন অব দ্য হিমালয়া’ ছবিটিতে বাঁধা পড়েছে বৃষ্টিভেজা দিনে পাহাড়ি পথে রঙিন ছাতার আশ্রয়ে পথচলতি মানুষজন—কাঞ্চনজঙ্ঘা ও এভারেস্টের তুষারে ঢাকা শৃঙ্গ ধরা পড়েছে ক্যানভাসের বুকে। এখানে প্রদর্শিত সব ছবিরই উৎস হিমালয়। হিমালয়কেন্দ্রিক ছবিগুলির প্রদর্শনী এর আগে অনুষ্ঠিত হয়েছে দিল্লি, কলকাতা, ইতালি ও লন্ডনে।
এবং রোদ্দুর
‘‘একটু একটু করে বাঁধটা’’ ক্রমশ ‘‘এতটাই বড় ও উঁচু’’ হয়ে গেছে যে সহজে ওপারে পৌঁছনো যায় না। ওপারের সোনালি রোদ্দুরে ঝিলিক দেয় অজস্র বর্ণ। বাঁধের বাধা পেড়িয়ে ‘‘রোদ্দুরে পথ’’ হাঁটলেন মনোনীতা, অভিজিৎ, শিপ্রা ও সুদীপ্তরা। পৌঁছে গেলেন ওপারে। তুলে আনলেন একটি একটি বর্ণ। তাঁদের বর্ণবিন্যাসে জন্ম নিল গভীর কবিতা। সুশান্ত ও অঙ্গন জাতক স্রষ্ঠাদের ছবি আঁকলেন। পাশে সাজিয়ে দিলেন তাঁদের নিজস্ব হস্তলিপির সৃষ্টি। সৃষ্টি বলল,‘‘ যদি ভালোবাসো / বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ব/জীবনের ক্যানভাসে।’’ সেই ক্যানভাসে ধরা থাকল জনপদ ইসলামপুরের নকশিকাঁথা ‘‘এবং রোদ্দুর’’(সম্পাদনা: সুশান্ত নন্দী)।
লেখা ও ছবি: সুদীপ দত্ত।
পত্রিকার উদ্যোগে আড্ডার আসর
‘আজকের অনুভব’ পত্রিকা গোষ্ঠী উত্তরবঙ্গ শাখার উদ্যোগে সম্প্রতি বসেছিল এক সাহিত্য আড্ডার আসর। সূচনায় গোপা ঘোষের কণ্ঠে নজরুলগীতি ‘তোমার মহাবিশ্বে’ এবং বহুশ্রুত আধুনিক গান ‘ওগো বৃষ্টি আমার চোখের পাতা’ প্রার্থিত আবহ রচনা করে দেয়। শ্যামানন্দ ব্রহ্মচারী বলেন, ‘‘আনন্দ কাকে বলে, তার স্বরূপ কেমন।’’ স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন অর্চনা মিত্র, বিবেক কবিরাজ, রঞ্জন সাহা, পারুল কর্মকার, অরুণ সরকার প্রমুখ। বাংলা শায়েরি শোনান অপর্ণা নন্দী। বর্ষীয়ান শিল্পী শ্যামলকৃষ্ণ দে’র গাওয়া ‘মন মেতেছে নীল আকাশে রাজহংসের ঝাঁকে’ শুনতে ভাল লাগে। ড: আনন্দগোপাল ঘোষ আলাপচারিতার ফাঁকে জানান, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিস্তৃত জনপদের কোনও মুখপত্র নেই। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে সাহিত্য-সংস্কৃতি ও দেশজ ঐতিহ্য চর্চায় বাংলাদেশের মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছে, সেখানে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় যেন নিষ্প্রভ। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নিয়ে এক রম্যরচনা পাঠ করেন বঙ্কিম সরকার ও কাকলি মুখোপাধ্যায়। আসরে জয় গোস্বামীর ‘মেঘবালিকা’ আবৃত্তি করেন শিপ্রা পাল এবং শায়েরি নিয়ে অন্য এক মেজাজে ধরা দেন ফাদার ফ্রেডরিক। আসর জমিয়ে দেয় অবশ্য সাত্ত্বিক আর অয়নের সুফি গান। এখানে বলতেই হয় সজলকুমার গুহর কথা। ওঁর সরস সঞ্চালনা আড্ডায় সম্পূর্ণ অন্য এক মাত্রা যোগ করেছিল। আড্ডা বসেছিল উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন শিবমন্দির এলাকার বর্ষীয়ান লেখক ক্ষিতীশ মুখোপাধ্যায়ের ‘ইংকং’ (বাংলায় যার অর্থ সমতলভূমি’) গৃহাঙ্গনে। উপস্থিত ছিলেন ময়নাগুড়ি বিএড কলেজের অধ্যক্ষ ড. অসীম রায়-সহ আরও অনেকে।
লেখা ও ছবি: অনিতা দত্ত।
হুল দিবসের অনুষ্ঠান
জেলা তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের উদ্যোগে ‘হুল দিবস’ পালিত হল মালবাজারের ন্যাশনাল হিন্দি স্কুল প্রাঙ্গণে। এই উৎসবের সূচনা হয় সিধু-কানহুর প্রতিকৃতিতে বিশিষ্ট জনেদের মাল্যদানের মাধ্যমে। জেলা তথ্য ও সংস্কৃতি আধিকারিক জগদীশচন্দ্র রায় তাঁর স্বাগত ভাষণে বলেন, সিধু-কানহুর আদর্শকে সামনে রেখে সমাজের বঞ্চনা, কুসংস্কার ও শোষণ দূর করার জন্য সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। সাঁওতাল আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন ড. আনন্দগোপাল ঘোষ। সাঁওতালদের অতিথি আপ্যায়নের নিজস্ব রীতিনীতি গানে গানে পরিবেশন করেন বাবলু কিসকু। ধামসা-মাদলে সাঁওতালি নৃত্য পরিবেশনায় ছিলেন কবিতা গোরে ও তাঁর সহশিল্পীরা। ওঁরাও জনগোষ্ঠীর নৃত্যগীত পেশ করেন রবিনাথ ওঁরাও, রামকুমার ওঁরাও, রিমা ওঁরাও এবং তাঁদের সম্প্রদায়। উৎসবের উদ্বোধক ছিলেন সাংসদ বিজয়চন্দ্র বর্মন।