Advertisement
E-Paper

সানগ্লাসটা এক বার খুলুন না দিদি

তাঁর কর্মীসভায় লোক হয় না। দলে তাঁর বিরোধীরা মুখ বেঁকিয়ে বলছেন, ‘‘অমন নাক উঁচু বিধায়কের ডাকে কে সাড়া দেবে বলুন তো!’’ সামনে নির্বাচন, পায়ের নীচে চেনা জমিও কেমন পিছলে যাচ্ছে যেন।

সুস্মিত হালদার

শেষ আপডেট: ২৯ জানুয়ারি ২০১৬ ০২:০৬
মঞ্চে তখন দেবশ্রী রায়। বৃহস্পতিবার চাপড়ায় সুদীপ ভট্টাচার্যের তোলা ছবি।

মঞ্চে তখন দেবশ্রী রায়। বৃহস্পতিবার চাপড়ায় সুদীপ ভট্টাচার্যের তোলা ছবি।

তাঁর কর্মীসভায় লোক হয় না। দলে তাঁর বিরোধীরা মুখ বেঁকিয়ে বলছেন, ‘‘অমন নাক উঁচু বিধায়কের ডাকে কে সাড়া দেবে বলুন তো!’’

সামনে নির্বাচন, পায়ের নীচে চেনা জমিও কেমন পিছলে যাচ্ছে যেন। টিকিট নিশ্চিত করতে দলনেত্রীর নির্দেশ মেনে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের বৈঠকে ডেকেছিলেন চাপড়ার বিধায়ক রুকবানুর রহমান। কিন্তু, সবাই আসবে তো? দলের অন্দরে কানাঘুষো,অনিশ্চয়তা দূর করতে তাই ‘নায়িকা’র ভরসায় বুক বেঁধেছিলেন তিনি। গ্রামীণ কর্মীদের মন জয় করতে কলকাতা থেকে ধুলো উড়িয়ে সটান হাজির করেছিলেন রুপোলি পর্দার একদা ঝলমলে নায়িকাকে। যেমন ভাবা গিয়েছিল— বৃহস্পতিবার, চাপড়ায় রুরবানুরের কর্মী সম্মেলন উপচে পড়ল দেবশ্রী-দর্শনে।

রুকবানুরের এক ঘনিষ্ঠ অনুগামী বলছেন, দেবশ্রী রায়কে দেখতে এ দিন সম্মেলনে হাজির হয়েছিলেন বিধায়কের ঘোর বিরোধী বলে পরিচিত পরিমল বিশ্বাসও। যাঁকে, রুকবানুরের সঙ্গে এক মঞ্চে শেষ কবে দেখা গিয়েছে, মনে করতে পারছেন না দলীয় কর্মীরা।

সম্মেলনর ভিড় যে তাঁকে যথেষ্ট স্বস্তি দিয়েছে ঘনিষ্ঠদের কাছে তা কবুলও করেছেন রুকবানুর। বলছেন, ‘‘কাল থেকে আমার কাছে কত যে ফোন এসেছ, একটাই প্রশ্ন—দেবশ্রীদি আসছেন তো? তাহলে আমরা ভিড় করে যাব।’’

চাপড়ায় তাঁকে দেখা যায় ‘কচ্চিৎ’, অভিযোগটা তাঁর দলীয় কর্মীদের। প্রাপক: দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পার্ক সার্কাসের গলি থেকে হাত ধরে রাজনীতির উঠোনে তাঁকে নিয়ে এসেছিলেন নেত্রী। চাপড়ায় প্রার্থী করে জানিয়ে গিয়েছিলেন, ‘‘ছেলেটাকে পাঠাবেন বিধানসভায়, দেখবেন ঠকবেন না।’’ মমতার ছায়ায় বেড়ে ওঠা রুকবানুরের অতঃপর প্রতিপত্তি ছড়াতে বিলম্ব হয়নি। দলের এক জেলা নেতার কথায়, ‘‘সেটাই কাল হয়েছিল ওঁর (রুকবানুর)। স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে এমন ব্যবহার করতেন যে, শেষ দিকে কেউ আর ওঁর কাছে ঘেঁষতেই চাইত না।’’

সেই রুকবানুর, এ দিন অন্তত দেবশ্রীর ধাক্কায় চাপড়া ‘জয়’ করলেন। কিন্তু বহিরাগত দেবশ্রীকেই আনতে হল কেন?

দলীয় সূত্রেই জানা গিয়েছে, তাঁর সম্মেলনে বিধায়ক নিজে কতটা কর্মীদের টানতে পারবেন, তা নিয়ে সংশয় ছিল প্রথম থেকেই। তা নিয়ে ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনাও করেছিলেন বিধায়ক। দিন কয়েক আগে তাঁদের পরামর্শ ছিল— দলের ‘ঝলমলে’ কোনও চরিত্রকে আনতে পারলে পরিস্থিতি অনেকটা সামাল দেওয়া যাবে। সেই মতো খোঁজ করে এক মাত্র রায়দিঘির বিধায়ক দেবশ্রী রায়কেই ‘ফাঁকা’ পাওয়া গিয়েছিল বলে দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। তিনি রাজি হওয়ায় আর দেরি করেননি রুকবানুর। ডাক দেওয়া হয়েছিল কর্মী সম্মেলনের। দিন কয়েক ধরে প্রচারেও তাই কর্মী সম্মেলন নয়, সামনে রাখা হয়েছিল দেবশ্রীর আগমনের খবর।

বৃহস্পতিবার দুপুরে, চাপড়ার ইনসাফ ক্লাব মাঠে চাপড়া-২ অঞ্চল কমিটির কর্মী সম্মেলনের শুরু থেকেই তাই ভিড় করেছিলেন কর্মীরা। বাচ্চা কোলে মহিলা থেকে গ্রামীণ বৃদ্ধ, নায়িকা দর্শনে দেখা গিয়েছে সব বয়সী মুখই। জেলা সভাপতি গৌরিশঙ্কর দত্ত-ও ঘুরে গিয়েছেন এক দফা। একে একে হাজির হন কৃষ্ণগঞ্জের বিধায়ক সত্যজিৎ বিশ্বাস, জেলা পরিষদের সভাধিপতি বাণিকুমার রায় সহ জেলা পরিষদের একাধিক কর্মাধ্যক্ষ।

তাঁরা বক্তব্য রাখতে উঠতেই ভিড় থেকে ভেসে আসতে থাকে, ‘‘দিদি (দেবশ্রী) এ বার কিছু বলুন।’’ জেলা নেতাদের উন্নয়নের খতিয়ান নয়, কর্মীরা তখন দেবশ্রী-দর্শনে উন্মুখ। সম্মেলনে নেতাদের গাড়ি ঢুকছে আর জনতা সোল্লাশে ফেটে পড়ছেন, ‘ওই এসে গিয়েছে!’ শেষতক, বাণিকুমার রায়ের বক্তব্যের মাঝেই কৃষ্ণনগর-করিমপুর সড়কে ধুলো উড়িয়ে মাঠের ভিতরে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ল দেবশ্রী রায়ের গাড়ি।

মুহূর্তে সভা চঞ্চল হয়ে উঠল। গাড়ি থেকে নামার পর কর্মীরা ব্যারিকেড করে তাকে নিয়ে গেলেন মঞ্চে। কর্মী সম্মেলনে উপস্থিত কর্মীদের হুড়োহুড়ি দেখে মঞ্চ থেকে ঘোষণা শুরু হল ‘‘আপনারা শান্ত হোন। অভিনেত্রী দেবশ্রী রায়কে সবাই দেখতে পাবেন। কডলেস মাইক হাতে উনি মঞ্চে ঘুরেই বক্তব্য রাখবেন।’’

কিন্তু, অভিনেত্রীর চোখে যে সানগ্লাস? কর্মীদের ভিড় থেকে সানগ্লায় খুলে ফেলার দাবি আসতে থাকল। তা না হলে যে পুরো মুখটা দেখা যাচ্ছে না! এরই মধ্যে বক্তব্য রাখতে উঠে চাপড়ার বিধায়ক রুকবানুর রহমান বলতে শুরু করেন, ‘‘আমি বেশিক্ষণ বলব না। কারণ আপনারা অধৈর্য্য হয়ে পড়েছেন...।’’ তাঁর কথা আর শোনা যায় না। কর্মীরা ততক্ষণে মোবাইল নিয়ে ছবি তুলতে ভেঙে পড়েছেন মঞ্চের সামনে।

দেবশ্রী শুরু করেন, ‘‘রুকবানুর বলল, তাই সানগ্লাস খুলে ফেললাম। ঠিক আছে তো? তবে আপনারা কিন্তু, রুকবানুরকে আবার বিপুল ভোটে জয়ী করবেন।’’ তার পর কর্মীদের অনুরোধে ‘নয়ণমনি’ সিনেমার একটা গান গেয়ে মঞ্চ থেকে নেমে গেলেন। কর্মীদের উদ্দেশ্যে তখন প্রবল আকুতি চলছে— ‘‘আপনারা কেউ চলে যাবেন না। আমাদের সম্মেলন এখনও শেষ হয় নি।’’ কিন্তু কে শোনে সে কথা।

ভিড় ঠেলে মাঠের ধুলো উড়িয়ে চলে যায় দেবশ্রীর গাড়ি। তার পিছনে তখন ধাওয়া করেছেন কর্মীরা। আর, পিছনে পড়ে থাকল প্রায় ফাঁকা সম্মেলনের ম্যারাপ।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy