কপিল মুনির আশ্রম তল্লাটে মুহুর্মুহু ঘোষণা হচ্ছে, গঙ্গাসাগর সেতু শিলান্যাসের। আজ, সোমবার বেলা আড়াইটেয় সাগরের হেলিপ্যাড থেকেই তা সারবেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আশ্রম তল্লাটেই স্মার্টফোনে, কলকাতার ময়দানে গরিব প্যাটিস বিক্রেতাকে নিগ্রহের প্রতিবাদে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তৃতা শোনা গেল।
রবিবার সন্ধ্যায় আখড়ার সাধুদের নিয়ে বসে মোবাইলে স্পিকারে প্যাটিস বিক্রেতাকে নিয়ে বক্তৃতা শুনছিলেন থানাপতি মোহন্ত নিত্যানন্দ গিরি। আখড়ার জটলার সামনে দাঁড়ানোর একটু বাদেই বাবাজীর নজরে পড়া গেল। বছর চল্লিশের সাধুবাবা এ বার বললেন, “কই এ মেলায় আমার আখড়ার পাশেই তো মুরগির ডিম, মাংস বিক্রি হচ্ছে। এখানকার এটা খাবার। চিকেন প্যাটিস বিক্রি একটা লোকের রুটিরুজি! তুমি চেয়ে ভুল করেছ, এর জন্য তাকে মারধর করবে?” কামাখ্যা মন্দির থেকে আগত দেশময় ঘুরে বেড়ানো নাগা সন্ন্যাসী গত বার মহাকুম্ভে গিয়েছেন। দুর্গাপুজো আর পৌষ সংক্রান্তির পুণ্যস্নান লগ্নে সাধারণত গঙ্গাসাগরে আসেন।
শ্রী শ্রী ১০০৮ মহামণ্ডলেশ্বর প্রজ্ঞানন্দ গিরি মহারাজের শিষ্য নিত্যানন্দের গোপন রাজনৈতিক পরিচয় বাজিয়ে দেখার চেষ্টা করে অবশ্য সুবিধা হল না। বললেন, “আমি আগে মানুষ মানি। হিন্দু, মুসলিম, শিখ, ঈশাই পরের কথা।” এ কালের বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরভুক্ত ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ সাধুবাবাদের ভিড়ে এ সব বাণী খানিক ব্যতিক্রমীই শোনাল।
তা এই সাধুবাবারাও এখন রাজ্য সরকারের ‘গঙ্গাসাগর সেতু’র জাঁকালো প্রচারে মুগ্ধ। কপিল মুনির আশ্রমের প্রধান পুরোহিত জ্ঞানদাস মোহন্তের উত্তরাধিকারী সঞ্জয় দাস থেকে নিত্যানন্দ গিরি সক্কলে এ বিষয়ে এক সুর। ১২ বছর ধরে চেষ্টা করেও গঙ্গাসাগর সেতুর জন্য কেন্দ্রের সাহায্য না-পাওয়ার কথা ক’দিন আগে নিউ টাউনের দুর্গাঙ্গনেরবক্তৃতাতেই শুনিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তা নিয়েও চর্চা চলছে কপিল মুনির আশ্রম তল্লাট থেকে সাগরদ্বীপের অন্যত্র।
আলপনায় সেজে উঠছে কপিলমুনির মন্দির চত্বর। রবিবার। ছবি: বিশ্বনাথ বণিক।
জেটির ব্যস্ত অটোচালক আকবর খান থেকে স্থানীয় পানের বরজের মালিক উৎপল সামন্তেরা এক বাক্যে বলেন, “ভাটার সময়ে মুড়িগঙ্গার বুকে চড়ায় ঠেকে দেড়-দু’ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়। কুয়াশার জন্য ভেসেল চলাচল বন্ধ হয় যখন-তখন। গঙ্গাসাগর সেতু তৈরি হলে সত্যি জীবনটাই পাল্টে যাবে।” রুদ্রনগর গ্রামীণ হাসপাতালের এক ডাক্তারও বললেন, “রক্তের আকালে গুরুতর অসুস্থ রোগীর চিকিৎসা এক দিন আটকে থেকেছে এমনও হয়েছে।” রাজ্য সরকার একার চেষ্টায় বিজন দ্বীপবাসীর জীবনে বিরাট পরিবর্তন আনছে বলে মেলে ধরা হচ্ছে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী অবশ্য সম্প্রতি বলেছেন, বাংলাদেশ ঘেঁষা তল্লাটে এই সেতু কেন্দ্রের ছাড়পত্র ছাড়া গড়া যাবে না।
সাগরদ্বীপ জুড়ে বিরাট বিরাট তোরণে অবশ্য লেখা মুড়িগঙ্গার উপরে চার লেনের ৪.৭৫ কিলোমিটারের সেতু কাকদ্বীপ ও গঙ্গাসাগরকে জুড়বে। লার্সন অ্যান্ড টুব্রোকে দিয়ে ১৬৭০ কোটি টাকায় সেতু নির্মাণের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে। দুর্গাঙ্গন উদ্বোধনের বক্তৃতায় দু’বছরে সেতু নির্মাণ শেষ করার কথাও সদ্য বলেছেন মমতা।
গঙ্গাসাগর মেলা শুরুর এখনও দিন চারেক বাকি। কপিল মুনির আশ্রম তল্লাট এর মধ্যেই আলোয় আলোয় উজ্জ্বল। ঘুগনি-মুড়ি থেকে চিকিৎসার উপযোগী কড লিভারের তেল ঢালাও বিক্রি হচ্ছে। তবে সাগরদ্বীপের ব্যবস্থাপনা নিয়ে খুচখাচ অভিযোগও শোনা যাচ্ছে। আশ্রমের উল্টো দিকেই কাশীর বড়া হনুমান ঘাটের বাবাজি আশীর্বাদের আশ্বাস দিয়ে অনলাইনে ভিক্ষার স্ক্যানার কোড দেখাচ্ছিলেন। বললেন, “এখন মেলা বলে এখানটা পরিষ্কার! অন্য সময়ে নোংরায় হাঁটতেই পারতে না!”
মহারাষ্ট্রের ঔরঙ্গাবাদের বাবুলাল রোন্ডেরাম গৌড়ে, চন্দ্রভানু বাবুলাল পোখরেরা দুপুরেই স্নান সেরে জেটি থেকে ফিরতি ভেসেল ধরেছেন। রাজস্থানের বিকানিরের দম্পতি তেজপাল পুরোহিত এবং শান্তা বেন বিকেলে স্নান সেরে সন্ধ্যার মুখে কপিল মুনির আশ্রমের সামনে ছবি তুলছিলেন। বার বার একটি গরু ফ্রেমে ঢুকে পড়ায় তাঁরা হেসে কুটিপাটি। পুণ্যার্থীরা এক সুর, সংক্রান্তির পুণ্য ডুব না হলেও গঙ্গাসাগর গঙ্গাসাগরই! সংক্রান্তির আগের পূর্ণিমা সদ্য পার হয়েছে। এখন স্নান করলেও পুণ্যে কমতি হবে না। এই বিশ্বাসই মেলার আগেই মানুষকে সাগরে টানতেশুরু করেছে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)