নানা টানাপড়েন শেষে কলেজে ভর্তি না-হয় হওয়া গেল। কিন্তু ক্লাসে উপস্থিতি কমতে শুরু করে প্রথম দু’-একটি সিমেস্টারেই। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলছিলেন, “স্কুল বা কলেজে চাকরির পরীক্ষা অনিয়মিত হওয়ার পরে ছাত্রছাত্রীরা কেউ ক্লাসে না-এলেও বকাবকি করার মুখ নেই শিক্ষক-শিক্ষিকাদের। সেই সঙ্গে জাতীয় শিক্ষা নীতি মেনে চার বছরের শিক্ষাক্রম চালু হওয়ার পরে পড়াশোনা ব্যাপারটাই ঘেঁটে গিয়েছে।”
কলকাতার বহু নামী কলেজের অধ্যক্ষই এখন কোন সিমেস্টারে কোন পেপারের পরীক্ষা, কতগুলো মেজর, কতগুলো মাইনর বুঝতে হিমশিম খান। আমেরিকান ধাঁচের নয়া পাঠ্যক্রমে অনার্স, পাস হয়েছে মেজর, মাইনর। সেই সঙ্গে রয়েছে গুচ্ছের ভ্যালু-অ্যাডেড কোর্স, ভাষা-শিক্ষা, পরিবেশ, সংবিধানের মতো বিষয়, সর্বোপরি ‘ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেম’-এর আওতায় সনাতনী জ্ঞান ভান্ডার। প্রাচীন গণিতশাস্ত্র বা বৈদিক গণিতের মতো বিষয়ও কলকাতার কলেজে পড়ানো হচ্ছে। মেদিনীপুরে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বললেন, “এখন তিন কি চার নম্বর সিমেস্টারের মাথায় পড়াতে গিয়ে এক-এক সময় মনে হয়, আসলের চেয়ে সুদের ধাক্কা বেশি। মেজর (অনার্স) এর থেকে আনুষঙ্গিক নানা বিষয়ের চাপটাই কঠিন হয়ে পড়েছে। অনার্সের বিষয় ছাড়াও অমানুষিক চাপ সইতে হয় শিক্ষার্থীদের। যদিও ক্লাসের সংখ্যা পাকেচক্রে অনেক কমে গিয়েছে।”
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আশুতোষ ঘোষ সিমেস্টার পিছু অন্তত ১৫০টি ক্লাস সুনিশ্চিত করতে চেষ্টা চালাচ্ছেন। সব কলেজেই মেজর ও অন্য বিষয় মিলিয়ে পরীক্ষার এত চাপ, তাতে যাঁদের পরীক্ষা নেই, তাঁদেরও ক্লাস নেওয়া মুশকিল হচ্ছে। পঠনপাঠনের সুবিন্যস্ত ক্যালেন্ডার সাজিয়ে মুশকিল আসানের চেষ্টা চলছে। প্রশ্ন উঠছে, এর পাশাপাশি ক্লাস থেকে কেন মুখ ফেরাচ্ছেন পড়ুয়ারা? কলকাতার আশুতোষ কলেজের এক শিক্ষিকা বললেন, “অনেক ছাত্রই গিগকর্মী বা অন্য ছোট কাজ করেন। রুটিরুজির টানে ক্লাসেই আসতে পারেন না। অনেকেই ছুটি নিয়ে শুধু পরীক্ষাটা দেন।” নানা বিষয়ের চাপ সামলাতে না-পেরে শিক্ষা ব্যবস্থাটারই ঢাকের দায়ে মনসা বিকোনোর জোগাড়। এমনিতেই ভর্তির হার কমছে। তার পরেও ড্রপআউট হয়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় উজাড় হওয়ার দশা।
গত বছর ওবিসি সংরক্ষণ নীতি নিয়ে জটিল সংশয়ের শেষে অনেক দেরিতে স্নাতকে ভর্তির প্রক্রিয়া শেষ হয় রাজ্যে। দেরির চোটে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনে স্নাতকোত্তরের পাঠ শুরুই করা যায়নি। স্নাতকে সংযুক্ত পোর্টাল মারফত ১৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৬০টি কলেজে সাড়ে ন’লক্ষ আসন রাখা হয়েছিল। চার লক্ষের কিছু বেশি, ৪৩ শতাংশ মাত্র ভর্তি হয়েছে। এর বাইরে সর্বাধিক প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮৭ শতাংশ, যাদবপুরে ৭৯ শতাংশ শেষমেশ ভর্তি হয় বলে উচ্চ শিক্ষা দফতর সূত্রের দাবি।
তবে এর থেকেও বড় সমস্যা স্কুল শিক্ষার মান বা কলেজ শিক্ষার নড়বড়ে ভিত নিয়েই! তাতে চার বছরের নতুন শিক্ষাক্রমে জটিল বিষয়ের চাপ সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে। অগত্যা অনেক ক্ষেত্রেই যে ভাবে হোক পাশ করানোর সংস্কৃতিই জাঁকিয়ে বসছে। এর আগে দেখা যাক, ড্রপআউটের ছবিটা ঠিক কী রকম! সমাজবিজ্ঞানী-অর্থনীতিবিদ অচিন চক্রবর্তী বলছেন, “বিভিন্ন সমীক্ষায় প্রকাশ, তামিলনাড়ুতে স্নাতক স্তরে ১৮-১৯ বছরের জনসংখ্যার শতকরা ৪৪ ভাগ কলেজে ভর্তি হলে পশ্চিমবঙ্গে তা শতকরা ২০ ভাগ হবে কি না সন্দেহ!” কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের সংযুক্ত জেলা-ভিত্তিক তথ্য ব্যবস্থা (ইউডাইস) বলছে, নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে ড্রপআউটের হার অবিসংবাদিত ভাবে ভারত-সেরা। ২০২৪-২৫ সালে ২৩% ছাত্র এবং ১৭.৮% ছাত্রী মিলিয়ে শিক্ষাছুট ২০.৩ শতাংশ। বিহার, উত্তরপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, মহারাষ্ট্র, গুজরাত, কর্নাটক— এরা কেউই শিক্ষাছুটের সংখ্যায় ১৫ শতাংশেও পৌঁছয় না।
এ সমীক্ষা যে অপপ্রচার নয়, তা বছর বছর রাজ্যে বাজেট বক্তৃতার হিসাবেও স্পষ্ট। ২০১০-১১য় উচ্চ শিক্ষার ছাত্রসংখ্যা ১৩.২৪ লক্ষ থেকে একটা পর্যায় পর্যন্ত বাড়লেও এখন ধারাবাহিক ভাবে কমছে। সরকারি হিসাবই বলছে, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের ২৭.২২ লক্ষ ছাত্রসংখ্যা ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ২০.৫৩ লক্ষে নেমে গিয়েছে। বিকাশ ভবনের এক শীর্ষ স্তরের কর্তা নাম প্রকাশ না করে বলছেন, “সংখ্যাটা কমছে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর থেকেই। সবুজসাথীর সাইকেল কিংবা ট্যাবের ১০ হাজার টাকার জন্য পরীক্ষায় নাম নথিভুক্তির পরে সব কিছু পেয়ে-টেয়ে অনেকেই পরীক্ষায় বসছেন না।”
তবে উচ্চ শিক্ষার মাধ্যমে চাকরি পাওয়ার আশা কমে যাওয়া, নতুন শিক্ষানীতির চাপ কলেজ বিমুখতার কারণ ধরেও অচিন বলছেন, “বহু কলেজেই কিন্তু পঠনপাঠনের মান, ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে সংযোগ নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।” কেউ কেউ বলছেন, অনেক কলেজেই শিক্ষক হয়তো ভোরের দূরপাল্লার ট্রেনে ক্লাসে আসেন। তারপর দুপুর হতেই বাঁধাধরা রিকশায় স্টেশনে পৌঁছে ফিরতি ট্রেনে ফের কলকাতা বা অন্য কোনও শহর। ক্লাস হচ্ছে নমো-নমো করেই।
স্নাতক স্তর থেকে এখন বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর জন্যই মাসে ১৫০০-২০০০ টাকার অন্তত বৃত্তির বন্দোবস্ত। যা দেখা যাচ্ছে, রাজ্যের বাজেট বিবৃতিতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর স্তরে স্বামী বিবেকানন্দ মেধা বৃত্তি আবেদনও বছর বছর লাখখানেক করে কমছে। এ বার যুবসাথী চালুর পরে পড়াশোনায় উৎসাহ আরও বেশি ধাক্কা খাওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
তবে এত শত সঙ্কটেও কোনও পড়ুয়াকে পরীক্ষায় পাশ করানোর জন্য সব অদৃশ্য শক্তি একজোট হয়। পেপার পিছু কলেজের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে ২৫ নম্বরে ২০-২২ অন্তত পাইয়ে দেওয়ার রীতিই বহুল প্রচলিত। বাকি ৭৫ নম্বরে ২০ উঠলেই শতকরা ৪০ নম্বর উঠে আসা বিচিত্র নয়। মাইনর বা পাস পরীক্ষার খাতাও অনেক সময়ে নিজের কলেজে দেখা হচ্ছে। আর ক্লাস না-করলেও পরীক্ষা পাশে শিক্ষার্থীদের হাতে নব যুগের অস্ত্র এখন চ্যাটজিপিটি। গেরিলা কায়দায় কিংবা পরীক্ষকদের প্রশ্রয়ে তাতেও নম্বর সমস্যার একটা সহজ সমাধান ঘটছে।
তোতাকে আর বিদ্যে গিলতে শ্রম করতে হয় না। কিন্তু নিদারুণ তেজে শিক্ষা ‘সম্পূর্ণ’ হচ্ছে।
(শেষ)
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)