পরিযায়ীরা এ বার কোন দলকে ভরসা করল? দলে দলে পরিযায়ী শ্রমিকদের ভোটদানের পরে এ বার এই নিয়ে জল্পনা চলছে রাজনৈতিক মহলে।
রাজনৈতিক দলগুলি জানাচ্ছেন, পরিযায়ী শ্রমিকদের সাধারণত পঞ্চায়েত ভোটেই বাড়ি ফিরতে দেখা যেত। অতীতে তাঁদের সে ভাবে লোকসভা ও বিধানসভা ভোটে অংশ নিতে দেখা যেত না। এ বারে ছবিটা ভিন্ন। রাজ্যের অন্য জেলাগুলির মতোই পুরুলিয়ার পরিযায়ী শ্রমিকেরাও বিধানসভা ভোট উপলক্ষে দলে দলে বাড়ি ফেরেন। সকাল সকাল ভোটও দিয়েছেন তাঁরা।
রাজনৈতিক দলগুলির মতে, এই জেলায় এসআইআর-এ খুব বেশি নাম বাদ যায়নি। তাঁদের মতে, এ বার জেলার ভোটদানের হার বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিকের ভোটদানের সক্রিয় অংশগ্রহণ। বাড়ির কাছে কর্মসংস্থান না হওয়ায় শ্রমিকদের ক্ষোভ রয়েছে। তা শাসকদলের বিরুদ্ধে যেতে পারে। আবার বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাংলাভাষী শ্রমিকদের উপরে নির্যাতনের অভিযোগকে ঘিরে পরিযায়ী শ্রমিকদের একাংশ আতঙ্কে রয়েছেন। তা গেরুয়া শিবিরের বিপক্ষেও যেতে পারে। তাই এ বারের বিপুল সংখ্যক পরিযায়ী শ্রমিকদের ভোট কোন পক্ষে গিয়েছে, তা নিয়ে জল্পনার শেষ নেই।
পুরুলিয়ার পরিযায়ী শ্রমিকের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রশাসনের কাছেও নেই।
তবে সূত্রের খবর, পুরুলিয়ার প্রায় ১৭ হাজার পরিযায়ী শ্রমিক রাজ্যের সামাজিক সুরক্ষা যোজনার সুবিধা পেতে তাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তবে রাজনৈতিক দলগুলির দাবি, এই জেলার অন্তত ৭০-৮০ হাজার মানুষ ভিন্ রাজ্যে কাজ করেন। আরও প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক ভিন্ জেলায় কাজ করেন। সব মিলিয়ে সংখ্যাটা এক লক্ষের কাছাকাছি হতে পারে।
এ বার ভোটের ক’দিন আগে থেকেই ট্রেনে, বাসে প্রচুর পরিযায়ী শ্রমিককে বাড়ি ফিরতে দেখা গিয়েছে। ফলে তাঁদের ভোটপ্রার্থীদের ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা নিতে চলেছে বলে অনেকের মত। বিশেষ করে যে সব আসনে শাসক ও বিরোধীর মধ্যে জোর লড়াই হতে চলে, সেখানে এ বার পরিযায়ী-ভোট ‘ফ্যাক্টর’ হতে পারে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশ জানাচ্ছেন, সাধারণ পঞ্চায়েত ভোটে প্রার্থীরাই তাঁদের এলাকার পরিযায়ী শ্রমিকদের বাড়িতে আনার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু এ বার বিধানসভা ভোটে শ্রমিকদের নিজেদের তাদিগ ছিল বেশি। তবে বিভিন্ন সূত্রের খবর, পরিযায়ী শ্রমিকদের বড় অংশকেই এ বারে বাড়িতে ফেরানোর জন্য বিশেষ ভাবে উদ্যোগী হয়েছিল বিজেপি। পুরুলিয়া জেলার সভায় বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও জানিয়েছিলেন, পরিযায়ী শ্রমিকদের বাড়ি ফেরাতে রেলমন্ত্রক বহু ট্রেনের ব্যবস্থা করেছে। বিজেপির স্থানীয় নেতারাও ওই শ্রমিকেরা যাতে ফেরেন, সে জন্য নানা ভাবে উদ্যোগী হয়েছিল। বিজেপির পুরুলিয়া সাংগঠনিক জেলা সভাপতি শঙ্কর মাহাতোও বলেন, ‘‘তৃণমূল শাসিত এই রাজ্যে কাজ নেই বলেই ঘরের ছেলেরা আজ পরিযায়ী শ্রমিক হয়েছেন। তাই তাঁরা এ রাজ্যেই কাজের সুযোগ পেতে রাজ্যে পরিবর্তনের পক্ষেই বিজেপি প্রার্থীদের সমর্থন জুগিয়েছেন।’’
শঙ্করের যুক্তি, দেশের শিল্পোন্নত রাজ্যগুলি বিজেপি-শাসিত। সেখানে কাজ করতে গিয়ে ওই শ্রমিকেরা দেখছেন, কী ভাবে বিজেপি ওই সব রাজ্যের আর্থ-সামাজিক মানোন্নয়ন করছে। বাংলাকেও শিল্পোন্নত করতে তাঁরা বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন।
তবে তৃণমূলের দাবি, পরিযায়ী শ্রমিকেরা জানেন বিজেপির নির্দেশেই নির্বাচন কমিশন এ রাজ্যে লক্ষ, লক্ষ বৈধ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে।তাই সেই ক্ষোভ থেকেই তাঁরা বিজেপিকে এ রাজ্যে ঠেকাতে তৃণমূলকে ঢেলে ভোট দিয়েছেন।
তৃণমূলের পুরুলিয়ার সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট সুষেণ মাঝি বলেন, ‘‘বিজেপি শাসিত রাজ্যেগুলিতে বাংলায় কথা বললে শ্রমিকদের বাংলাদেশি তকমা দিয়ে অত্যাচার করার স্মৃতি এখনও টাটকা। বাংলা বিদ্বেষী বিজেপিকে হারাতেই রেকর্ড সংখ্যক পরিযায়ী শ্রমিক এ বার বাড়ি ফিরে ভোট দিয়েছেন।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)