‘নির্মল জেলা’-র তকমা এসেছে। কিন্তু একটিও শৌচালয় নেই আদিবাসী অধ্যুষিত বিষ্ণুপুরের কানগড় গ্রামে। এলাকায় হাতির উপদ্রব থাকায় ভোরে বাড়ির বাইরে বেরোতে আতঙ্কে থাকেন বাসিন্দারা।
স্বাধীনতার এত যুগ পরে প্রথমবার দেশের জাতীয় পতাকা কানগড়ে উঠেছিল বছর দুয়েক আগে। বিষ্ণুপুর শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে থাকলেও কার্যত রাস্তাহীন এই গ্রাম যেন প্রত্যন্ত রয়ে গিয়েছে। পতাকা ওঠার খবর সামনে আসার পরে এই গ্রামের বঞ্চনার তালিকা কিছুটা ছোট হয়েছে। কিন্তু কেন তাঁরা সরকারি ভাবে শৌচালয় পাননি, তা অজানা বাসিন্দাদের কাছে। প্রশাসন সূত্রের খবর, কয়েক বছর আগে যখন জেলার প্রতিটি গ্রামে শৌচালয় নির্মাণের কাজ চলছিল, তখন যে কোনও কারণে বেলশুলিয়া পঞ্চায়েতের কানগড় গ্রাম বাদ পড়ে গিয়েছিল। বাসিন্দাদের দাবি, বছর খানেক আগে নিজেদের চেষ্টায় শৌচালয়ের আবেদন-সহ নথিপত্র তাঁরা স্থানীয় পঞ্চায়েতে জমা দিয়েছেন। তবুও শৌচালয় পাননি। এখনও গ্রামের শতাধিক মানুষের ভরসা খোলা মাঠ।
কানগড় আদিবাসী গ্রামে ২২টি পরিবারের বাস। অধিকাংশই দিনমজুর। মাটির ভাঙা বাড়িতেই তাঁদের বাস। বাড়ির একাংশ ভেঙে গেলে ত্রিপল দিয়ে ঢেকে দেন। কিন্তু বাড়ি বা শৌচালয় তৈরির সামর্থ্য তাঁদের নেই। বাসিন্দাদের আক্ষেপ, গ্রামের একজনও সরকারি আবাস প্রকল্পে বাড়ি পাননি। ১৩টি পরিবারকে জানানো হয়েছে, পরের দফায় তাঁরা বাড়ির টাকা পাবেন।
গ্রামের পাশেই রয়েছে বাসুদেবপুরের গভীর জঙ্গল। সেখানে থেকে লোকালয়ে চলে আসে হাতির পাল। কয়েক বছর আগে হাতির হানায় মৃত্যু হয় কানগড়ের এক বাসিন্দার। বাসিন্দাদের দাবি, রাতবিরেতে শৌচকর্ম করতে বেরিয়ে মাঝে মধ্যেই হাতির মুখে পড়তে হয় তাঁদের। তারপরেও কেন শৌচালয় তাঁরা পাননি, জানেন না গ্রামবাসী।
বিধবা সুমিত্রা সরেন বাঁশের খুঁটিতে ত্রিপল দিয়ে কোনওরকমে নাবালিকা মেয়েকে নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘‘জমিজমা নেই। অকালে স্বামী মারা গেল। দিনমজুরি করে এক বেলা খেয়ে জঙ্গলে পাতা কুড়িয়ে বেঁচে আছি। প্রচন্ড শীতে পলিথিন জড়িয়ে মা-মেয়ে রাত কাটিয়েছি। সরকারি বাড়ি জুটল না। শৌচাগারও পেলাম না।’’
স্থানীয় স্বর্ণময়ী মান্ডি, মমতা সরেন, সুন্দরী মান্ডি, মাকু মান্ডিরা জানান, জঙ্গলে হাতির আতঙ্ক নিয়ে তাঁদের শৌচকর্মে যেতে হয়। তাঁরা বলেন, ‘‘আমাদের স্কুল-কলেজে পড়া মেয়েরা আর জঙ্গলে শৌচকর্ম করতে যেতে চায় না। জঙ্গলে শুধু হাতি নয়, বদ লোকেরও অভাব নেই। সাপের ছোবল খাওয়ার ভয়ও আছে। সব গ্রামে সরকার শৌচালয় তৈরি করে দিলেও আমাদের কেন বাদ দিল বুঝতে পারছি না।’’
বেলশুলিয়া পঞ্চায়েতের নির্মাণ সহায়ক দুর্গাপদ দাস জানান, আগে কানগড় গ্রামের বাসিন্দারা পঞ্চায়েতে আবেদন করেছিলেন। তা ব্লক অফিসে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু এখন নিয়ম বদলেছে। এখন অনলাইনে আবেদন করার পরে পঞ্চায়েতে জানাতে হয়। তারপরেই কিছু পদ্ধতিগত কাজ করার পরে দু’টি কিস্তিতে শৌচাগার তৈরির জন্য ১২ হাজার টাকা দেওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘‘এ বার বাসিন্দারা পঞ্চায়েতে এলে আমরাই তাঁদের অনলাইনে আবেদনের ব্যবস্থা করে দেব।’’
বিডিও (বিষ্ণুপুর) সোমশঙ্কর মণ্ডল বলেন, “গ্রামের মানুষ শৌচালয় নির্মাণ করে ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট নম্বর ও আধার কার্ডের প্রত্যায়িত কপি জমা দিলে এক সপ্তাহের মধ্যেই
সরকার তাঁদের দু’দফায় ১২ হাজার টাকা দিচ্ছে। গ্রামবাসী ব্লক অফিসে এসে কথা বলুন। নথিপত্র দিয়ে আমরাই শৌচালয়ের ব্যবস্থা
করে দেব।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)