পুলকারে চড়ে আট-দশ কিলোমিটার পথ উজিয়ে রোজ অনেক ছাত্রছাত্রী রঘুনাথপুর থেকে আদ্রার ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলিতে পড়তে যায়। কিন্তু রঘুনাথপুর শহর থেকে মেরেকেটে তিন কিলোমিটার দূরের খোদ সরকারি ইংরেজি মাধ্যম মডেল স্কুল ভুগছে পড়ুয়ার অভাবে।
বছর দু’য়েক আগে তৈরি হয়েছিল ওই স্কুলটি। শুরুর সময় পড়ুয়া সংখ্যা ছিল আশি জন। এই বছর সেটি কমে দাঁড়িয়েছে পঞ্চাশে। নতুন শিক্ষাবর্ষে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে মাত্র আট জন। বর্তমানে অনেক অভিভাবকই ইংরেজি মাধ্যমে সন্তানদের পড়াতে চান। সেই সূত্রে শহর বা মফস্সল এলাকায় ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠছে ছোট বড় বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল। সেগুলিতে পড়াশোনার খরচ বেশ কিছুটাই চড়া।
সরকারি এই ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ার জন্য কোনও টাকাকড়ি লাগে না। তা সত্বেও অভিভাবকদের অনীহা কেন? স্কুলটির শিক্ষক এবং অভিভাবকদের একাংশ এই প্রসঙ্গে মূলত প্রচার, পরিকাঠামো, শিক্ষকের অভাবের কথা বলছেন।
স্কুল সূত্রে জানা গিয়েছে, বর্তমানে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া রয়েছে মাত্র ৮ জন। সপ্তম শ্রেণিতে ১২ জন, অষ্টম শ্রেণিতে ১৮জন, নবম শ্রেণিতে ১২ জন। দু’বছর পরে নবম শ্রেণির পড়ুয়ারা মাধ্যমিক পাশ করে বেরিয়ে যাবে। এই পরিস্থিতিতে যদি পরের শিক্ষাবর্ষে ষষ্ঠ শ্রেণি ভাল সংখ্যক পড়ুয়া ভর্তি না হয়, তাহলে স্কুলে পড়ুয়া সংখ্যা অনেকটাই কমে যাবে বলে তাঁদের আশঙ্কা। রঘুনাথপুর মডেল স্কুলের এক শিক্ষকের দাবি, ‘‘পরিকাঠামোগত সমস্যা তো রয়েছেই, তার চেয়ে আরও বেশি সমস্যা হচ্ছে বিনা খরচে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ার সুযোগ নিয়ে যথেষ্ট প্রচার করা হচ্ছে না।’’
কিছু সমস্যা যে রয়েছে, সে কথা মেনে নিয়েছেন মহকুমাশাসক (রঘুনাথপুর) দেবময় চট্টোপাধ্যায়ও। তিনি বলেন, ‘‘শিক্ষকের সমস্যা কিছুটা মিটেছে। পরিকাঠামো ও অন্য দিকগুলির দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে।’’
জেলার দু’টি ব্লক— রঘুনাথপুর ২ ও বান্দোয়ানে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের আর্থিক সহায়তায় দু’টি মডেল স্কুল গড়ে তোলা হয়েছে। রঘুনাথপুর শহর বা পাশের এলাকায় ইংরেজি মাধ্যম হাইস্কুল নেই বললেই চলে। ওই এলাকায় তেমন একটি স্কুলের চাহিদা ছিলই। প্রশাসনের আশা ছিল, শহর ঘেঁষা রঘুনাথপুর ২ ব্লকের কুলসড়া গ্রামের মডেল স্কুলটিতে শুরু থেকেই ভাল সংখ্যক পড়ুয়া ভর্তি হব। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে হয়েছে উল্টো।
শিক্ষকদের একাংশের দাবি, এই পরিস্থিতির জন্য নিয়মের গেরো একটা বড় কারণ। খাতায় কলমে রঘুনাথপুর ২ ব্লকে হলেও, আদপে স্কুলটির অবস্থান রঘুনাথপুর ১ ব্লক এবং পুরশহর ঘেঁষা এলাকায়। কিন্তু নিয়মমাফিক, যে ব্লকে স্কুল রয়েছে, সেই ব্লকের বাসিন্দা ছাত্রছাত্রীরাই সেখানে ভর্তি হতে পারবে। তাঁদের দাবি, পুরশহর বা রঘুনাথপুর ১ ব্লকের অভিভাবকেরা ইচ্ছা থাকলেও সহজে সন্তানদের ভর্তি করতে পারছেন না স্কুলটিতে। শহরের বাসিন্দা কিছু অভিভাবকের কথায়, ‘‘হাতের নাগালে স্কুল থাকতেও শহরের বাসিন্দা হওয়ায় সেখানে ভর্তি করাতে পারছি না। দশ কিলোমিটার দূরে আদ্রার বেসরকারি স্কুলে ছেলেমেয়েদের পাঠাতে হচ্ছে।’’
অন্য দিকে রঘুনাথপুর ২ ব্লক সদর চেলিয়ামা থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের স্কুলে ভর্তি করাতে গিয়ে যাতায়াতের সমস্যার কথা ভেবে অনেকেই পিছিয়ে যাচ্ছেন। প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে বাসও চলে অল্প। রঘুনাথপুর মডেল স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মলয় রায়ের মতে, সমস্যা বেড়েছে স্কুলে হস্টেল না থাকায়। সেই সুযোগ থাকলে দূরের গ্রামগুলির পড়ুয়ারা যাতায়াতের সমস্যা এড়াতে পারত। তিনি বলেন, ‘‘প্রতি বছরই অনেক অবিভাবক স্কুলে হস্টেল নেই শুনে পিছিয়ে যান।’’ শিক্ষকদের একাংশের দাবি, যাতায়াতের সমস্যার জন্য ভর্তি হওয়ার পরেও বেশ কিছু পড়ুয়া স্কুল ছেড়ে দেয়।
সরকারি মডেল স্কুলগুলিতে মধ্যশিক্ষা পর্ষদের পাঠ্যক্রম ইংরেজিতে পড়ানো হন। বিভিন্ন স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ শিক্ষকদের নিয়োগ করা হয়। রঘুনাথপুরের স্কুলটিতে সম্প্রতি ভূগোল শিক্ষকের একটি শূন্য পদে নিয়োগ হয়েছে। কিন্তু এখনও শিক্ষক নেই কর্মশিক্ষা এবং শরীরশিক্ষার। স্কুল সূত্রে জানা গিয়েছে, অশিক্ষক কর্মীর সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। এক জন করণিক থাকলেও তাঁকে স্কুলের বদলে মহকুমাশাসকের দফতরে কাজ করতে হয়। সাফাইকর্মী নেই। নেই নৈশ প্রহরী। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সেই সুযোগ নিয়ে রাতে পাথর ছুঁড়ে কে বা কারা স্কুলের জানলার সমস্ত কাঁচ ভেঙে দিয়েছে। এ ছাড়াও পাঁচিল নেই। মিড-ডে মিল রান্নার ঘর নেই।
শিক্ষকদের একাংশের অভিযোগ, স্কুলের উন্নয়নে প্রশাসনের কার্যত নজরই নেই। তাঁরা জানান, স্কুল পরিচালনার জন্য বরাদ্দ অর্থ মিলছে না গত দু’বছর ধরে। গত সাত মাস ধরে বেতনও মেলেনি। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মলয়বাবুর দাবি, উল্টে নিজের খরচে বাজার থেকে চক, ডাস্টার, পরীক্ষার খাতা কিনতে হচ্ছে। স্কুল সূত্রে জানা গিয়েছে, ইউনিট টেস্টের প্রশ্নপত্র ছাপানোর টাকাও পাওয়া যাচ্ছে না।
মডেল স্কুলের সমস্যাগুলি তাঁদের নজরে রয়েছে বলে জানিয়েছেন রঘুনাথপুর মহকুমাশাসক। তাঁর আশ্বাস, ‘‘পরিকাঠামোগত সমস্যাগুলির সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। আশা করছি শীঘ্রই হাল ফিরবে।’’ তবে অন্য ব্লকের ছাত্র ভর্তির জন্য নিয়মের বদল করা মহকুমা প্রশাসনের এক্তিয়ারে নেই বলেই জানিয়েছেন তিনি।