বরাবরই তিনি চেয়েছেন এলাকার ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ায় বই যেন কোনও ভাবেই বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। সেই লক্ষ্যেই দুবরাজপুরের কুখুটিয়া গ্রামে তৈরি করেছেন পাঠাগার। প্রতি বৃহস্পতি ও শনিবার বিকেলে সেখানে ভিড় জমে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বসতে আগ্রহীদের। ওই গ্রন্থাগারে পাঠ্যপুস্তক, সহায়িকা ও গল্পের বই মেলে।
কিরীটীভূষণ রুজ স্মৃতি গ্রন্থাগার নিজের উদ্যোগে তৈরি করেছেন কুখুটিয়া গ্রামের ভূমিপুত্র বিশ্বজিৎ রুজের উদ্যোগে তৈরি। তিনি ছিলেন কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রকের অধীন দুর্গাপুর সিএসআইআর (সেন্ট্রাল মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট)-এর প্রধান বিজ্ঞানী (চিফ সায়েন্টিস্ট)। এখন তিনি অবসরপ্রাপ্ত। অবসর নেওয়ার পরে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁর প্রয়াত পিতার নামে ওই গ্রন্থাগার গড়ে তোলেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত ভাবে সাহায্য করতেন বিশ্বজিৎ রুজ। গত তিন দশক কৃতী ছাত্রছাত্রীদের সংবর্ধনাও দিয়ে আসছেন। এ বার গ্রন্থাগার তৈরি করে দেওয়ায় এলাকার পড়ুয়াদের বিরাট উপকার হয়েছে। বিশ্বজিতের কথায়, “বাবা স্কুল শিক্ষিক ছিলেন। কিন্তু, প্রত্যন্ত এলাকা থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সহজ ছিল না। আমি পারলে এলাকার অন্যেরাও পারবে। তবে, উপযুক্ত বইয়ের অভাবে তাদের পড়াশোনা যাতে থেমে না যায়, সেই ভাবনা থেকেই এই গ্রন্থাগার।”
জানা গিয়েছে, দুঃস্থ পড়ুয়াদের প্রয়োজনীয় বই এই গ্রন্থাগার থেকে নেওয়া যায়। আর যে সব পড়ুয়ার সেই সমস্যা নেই, তাঁরা এসে ন্যূনতম ১৫ দিনের জন্য গ্রন্থাগার থেকে বই নিতে পারেন। সদস্য হতেও কোনও টাকা লাগে না। তৃতীয় শ্রেণি থেকে স্নাতকোত্তর ও চাকরির পরীক্ষার্থীদের জন্য বই রয়েছে। বিশেষ বইয়ের প্রয়োজন থাকলে, তারও জোগান দেওয়া হয়। প্রশান্ত ভান্ডারী নামে একজন গ্রন্থাগারের দায়িত্বে রয়েছেন। আগে শুধু কুখুটিয়া গ্রামের পড়ুয়ারা আসতেন, এখন মুখে মুখে প্রচারের ফলে মহুলা, চণ্ডীপুর, গড়গড়া, বনবন্দুরা, বাবুবেড়া, দৌলতপুর, বনকাটি, পটলপুর-সহ ১৪টি গ্রামের ছাত্র-ছাত্রী আসেন। বর্তমানে ৮০০টি বই রয়েছে, সদস্য সংখ্যা ৪৪০। উপকৃত সকলেই।
গ্রন্থাগারে দেখা হল বনবন্দুরা গ্রামের নবম শ্রেণির শিল্পা মহাজন, পটলপুরের দিশা মণ্ডল, কুখুটিয়ার সপ্তম শ্রেণির বুলা দে-র সঙ্গে। প্রত্যেকের মতে, প্রয়োজনীয় সব বই, বিশেষ করে সহায়িকা কিনতে টাকা লাগে, এখানে নিখরচায় সেটা পায় তারা। বিশ্বভারতী থেকে সদ্য স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ সুব্রত ধীবরের কথায়, “প্রয়োজনীয় সব বই এখান থেকে পেয়েছি। বিশ্বজিৎ স্যারকে ধন্যবাদ।” একই অভিজ্ঞতা স্নাতক স্তরের ছাত্র সুরজিৎ দাসও।
এই উদ্যোগ সকলকে অনুপ্রাণিত করেছে। জানা গিয়েছে, বিশ্বজিতের সব কৃতী ছাত্রেরাও বই কিনতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। সাহায্য করছেন স্থানীয় মানুষও। এমনকি, এলাকার ছাত্র-ছাত্রীরাও উঁচু শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হলে সযত্নে রাখা বই গ্রন্থাগারকে দান করে দিচ্ছেন স্বেচ্ছায়।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)