Advertisement
E-Paper

তাড়িই লক্ষ্মী অভাবের সংসারে

তাড়ি— গ্রীষ্মের সকালে গ্রাম বাংলায় ঠান্ডা, মিষ্টি, উত্তেজক এই পানীয়টির সন্ধান মেলে। কিন্তু বেলা গড়িয়ে ওই রস যখন ‘ফ্রাগমেন্টেড’ হয়ে নেশার সামগ্রীতে রূপান্তরিত হয়, তখন তার কদর বাড়ে নেশারুদের মধ্যে। সে তখন তাড়ি। আদিবাসীদের প্রিয় নেশার দ্রব্য তো বটেই, দেশজ মদের স্বাদ নিতে আদিবাসী পাড়ায় ভিড় জমান আসক্তেরাও।

দয়াল সেনগুপ্ত

শেষ আপডেট: ২৭ মে ২০১৬ ০১:৫০
তৈরি হচ্ছে পাটালি। — নিজস্ব চিত্র।

তৈরি হচ্ছে পাটালি। — নিজস্ব চিত্র।

তাড়ি— গ্রীষ্মের সকালে গ্রাম বাংলায় ঠান্ডা, মিষ্টি, উত্তেজক এই পানীয়টির সন্ধান মেলে।

কিন্তু বেলা গড়িয়ে ওই রস যখন ‘ফ্রাগমেন্টেড’ হয়ে নেশার সামগ্রীতে রূপান্তরিত হয়, তখন তার কদর বাড়ে নেশারুদের মধ্যে। সে তখন তাড়ি। আদিবাসীদের প্রিয় নেশার দ্রব্য তো বটেই, দেশজ মদের স্বাদ নিতে আদিবাসী পাড়ায় ভিড় জমান আসক্তেরাও।

চৈত্র মাসের শুরু থেকে জৈষ্ঠ্যের মাঝামাঝি এমন তাড়িতেই বুঁদ হয়ে থাকতেন রাজনগরের লাটুলতলা গ্রামের আদিবাসী পুরুষেরাও। কাজ ছেড়ে শুধু নেশায় মেতে থাকলে অশান্তি হত পরিবারে। এ বার ওই গ্রামে ছবিটা বদলে গিয়েছে। তালের রস থেকে তাড়ি নয়, তৈরি হচ্ছে তালের গুড়/ পাটালি। আর সেটাই হাতে কলমে শিখছেন গ্রামের ১৩টি পরিবারের পুরুষ সদস্যরা। সৌজন্যে একটি স্বেচ্ছা সেবী সংস্থা (ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ কমিউনিকেশন অ্যাণ্ড সার্ভিসেস সেন্টার)। তাঁদের উদ্দেশ্য, প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর মানুষকে আর্থিক স্বচ্ছলতা দেওয়া। তারই অঙ্গ হিসাবে ওই গ্রামে চলছে আড়াই মাসের তালের পাটালি, তাল মিছরি তৈরির প্রশিক্ষণ। যা শুরু হয়েছে গত ২৩ মার্চ থেকে।

রাজনগর ব্লকের তাঁতিপাড়া পাঞ্চায়েতের ওই গ্রামে গিয়ে দেখা গেল, যে ভাবে খেজুর গুড় তৈরি হয়ে থাকে প্রায় একই পদ্ধতিতে একটি বিশাল মাপের উনোনের উপর চাপানো একটি বড় অ্যালুমনিয়াম ট্রে-তে জ্বাল দেওয়া হচ্ছে তালরস। আর সেদিকে নজর রেখে চলেছেন গণেশ হাঁসদা, সুনীল মূর্মু, সীতালাল মুর্মু, কাজল হেমব্রম, শঙ্কর সরেনরা। একটি কাঠের হাতা দিয়ে ক্রমাগত নেড়ে দেওয়া হচ্ছে ক্রমশ ঘন হয়ে আসা রস। আর তাঁর ছাত্রেরা সব কাজ সঠিক পদ্ধতিতে করছেন কিনা সেটা দেখেছেন প্রশিক্ষক তিলক মুর্মু। কিছুক্ষণ পরেই ঘন ফুটন্ত রসকে কাঠের হাতা দিয়ে ঘসে ঘসে গুড় তৈরি করে কাঠের তৈরি ছাঁচে ঢেলে দিলেন গণেশরা। বালির উপর সাদা পরিস্কার কাপড়ের উপর রাখা কাঠের ছাঁচের মধ্যে ঠাণ্ডা হয়ে সাবানের আকারে জমে উঠল তাল পাটালি। খুশি সকলেই। খুশি পাশে দাঁড়িয়ে বসে থাকা খুদেরাও।

প্রশিক্ষক তিলক এসেছেন বাকুঁড়ার ওন্দা ব্লকের রামকৃষ্ণপুর থেকে। তিলক বলেন, ‘‘নিজেও বছর দু’য়েক আগে ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কাছে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম। এখন প্রশিক্ষণ দিচ্ছি।’’ আর তাঁর সঙ্গে যাঁরা এ কাজ শিখেছিলেন তাঁরা প্রাত্যেকেই তালের গুড় বানানোকে সাময়িক পেশা হিসাবে নিয়েছেন। সংস্থা বলছে, ‘‘এই গ্রামেও যাঁরা এই মুহূর্তে শিখছেন তাঁরাও একদিন হয় কাউকে শেখাবেন নয় নিজেরা গুড় তৈরি করবেন।

লাটুলতলায় ৪৫ ঘর আদিবাসীর বাস। তালগাছ রয়েছে গোটা চল্লিশেক। এবার সেই তালের রস ভিন্ন কাজে লাগছে। তিলক বলছেন, নতুন একটি তালগাছগাছ থেকে ৫ লিটার রস পাওয়া যায়। যদি গাছটি পুরানো হয় সেখান থেকে ২০ লিটার পর্যন্ত রস প্রতিদিন সংগ্রহ করা সম্ভব। খেজুর গুড়ের ঠিক পড়েই চৈত্র মাস থেকই চলতে পারে তালের গুড় তৈরি। আয় হতে পারে প্রত্যেকের দিনে ৪০০ টাকা পর্যন্ত। সংস্থার পক্ষে জেলা ইনচার্জ রাখী বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাজনগরের ইউনিট ইনচার্জ শেখ রেজাউদ্দিন বলেন, ‘‘সেটাই তো চাওয়া।’’

বীরভূমে রাজ্য সরকারের খাদি ও গ্রামোদ্যোগের আধিকারিক ছিলেন দীপক ঘোষ।

অবসরের পর যিনি ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্মী হয়ে বাঁকুড়ার দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি জানালেন, ‘‘একটি তাল ও একটি খেজুড় গাছ একজন মানুষকে ২৪০ দিনের কাজ দিতে পারে। ৯০ দিন খেজুর গুড় ৯০ দিন তালের গুড় এবং পাতা ও আঁশ থেকে সামগ্রী তৈরি করে চলতে পারে আরও ৬০ দিন। এই বিষয়টিকে দক্ষিণভারত খুব ভাল ভাবে কাজে লাগিয়েছে।’’ সংস্থার পক্ষ থেকে ওই আধিকারিক জানাচ্ছেন, এই সময়টায় একফসলি জমি থাকা মানুষেদের আয়ের সমস্যা দেখা দেয়। অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষদের বিকল্প রোজগার দেওয়ার লক্ষ্যে এই ভাবনা। বাঁকুড়া জেলার বহু গ্রামে এই বিষয়টি সাফল্যে পেয়েছে। বীরভূমেরও প্রভূত সম্ভবনা রয়েছে। আর একবার আয়ের স্বাদ পেলে তখন নেশা করাও বন্ধ হবে।

কী বলছেন যাঁরা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন?

সুনীল, সীতালাল, কাজল, গণেশরা বলছেন, ‘‘অন্য বছর এই সময়টায় চাষের কাজ থাকে না। ১০০ দিনের কাজ পেলে ভাল না হলে অন্যজেলায় খাটতে যেত দু’ একজন। অনেকে বাড়িতেই পড়ে থাকত। এ বার একটা অন্য রাস্তা পেলাম। আমরা তালের গুড় তৈরি করে বিক্রি করব এর পর থেকে। বর্ষা এলে আবার চাষে লাগব।’’ খুশি তাঁদের স্ত্রী-রাও। পুতুল হেমব্রম, পার্বতী মুর্মু, লক্ষ্মী হেমব্রমরা বলছেন, ‘‘এই সময়টায় পুরুষরা নেশা করে ঘরে থাকলে অশান্তি লেগেই থাকত। এ বার সেটা হয়নি। আরও ভাল লাগছে।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy