Advertisement
E-Paper

ব্যাধি ও দারিদ্রের পাহাড় টপকে উড়ান

কারও দেহে থাবা বসিয়েছে ভয়ঙ্কর ব্যাধি। কারও বা জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধকতা সঙ্গী। তবুও ওরা থেমে যায়নি। মাধ্যমিক পরীক্ষায় এই লড়াকু ছেলেমেয়েরাই এ বার নজরকাড়া ফল করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ২৯ মে ২০১৫ ০১:৫৮
লড়াকুরা। (উপরে বাঁ দিক থেকে) পার্থ মণ্ডল, সঙ্গীতা ধাড়া, শিল্পা দেওঘরিয়া, (নীচে বাঁ দিক থেকে) তুহিনশুভ্র পাল, কার্তিক দাস ও বিক্রম মণ্ডল। —নিজস্ব চিত্র।

লড়াকুরা। (উপরে বাঁ দিক থেকে) পার্থ মণ্ডল, সঙ্গীতা ধাড়া, শিল্পা দেওঘরিয়া, (নীচে বাঁ দিক থেকে) তুহিনশুভ্র পাল, কার্তিক দাস ও বিক্রম মণ্ডল। —নিজস্ব চিত্র।

কারও দেহে থাবা বসিয়েছে ভয়ঙ্কর ব্যাধি। কারও বা জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধকতা সঙ্গী। তবুও ওরা থেমে যায়নি। মাধ্যমিক পরীক্ষায় এই লড়াকু ছেলেমেয়েরাই এ বার নজরকাড়া ফল করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।

কোতুলপুর ব্লকের সাঁইতাড়া গ্রামের পার্থ মণ্ডল জন্ম থেকেই হিমোফিলিয়া রোগে আক্রান্ত। তার দেহের কোথাও কেটে গেলে রক্ত পড়া থামে না। কারণ এই রোগে রক্ত জমাট বাধে না। দামি ইঞ্জেকশন দিয়ে তবে রক্তপাত থামানো যায়। কিন্তু এই পরিবারে সে জন্ম থেকেই দেখে আসছে দারিদ্র। সেই ঘরেরই ছেলে পার্থ এ বার মাধ্যমিকে ৬৪৮ নম্বর পেয়ে স্কুলের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপক হয়েছে। এত প্রতিবন্ধকতা নিয়ে সে বরাবরই স্কুলে প্রথম হয়ে এসেছে। সেই পার্থর কথায়, ‘‘শরীরে নানা সমস্যা। হাড়েও আমার সমস্যা। কলম ধরে দ্রুত লিখতে পারি না। তবুও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাই। বিজ্ঞান নিয়েই উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ব।’’

কিন্তু দারিদ্রের কারণে কী ভাবে ছেলেকে উচ্চশিক্ষা দেবেন, সেই ভাবনাতেই আকূল পার্থর বাবা আনন্দময় মণ্ডল। তিনি জানান, দেড় বিঘা জমিতে চাষ করে সংসার চালিয়ে ছেলের চিকিৎসা করাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এক ছেলে ও এক মেয়ের পড়াশোনা চালাতে তাই তিনি অনেকাংশেই আত্মীয় ও পড়শিদের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু উচ্চশিক্ষার খরচের কতটার ভাগ তাঁরা নেবেন, দুর্ভাবনায় পার্থর পরিবার। পার্থর স্কুল মির্জাপুর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক দুঃখনিবারণ দাসও বলেন, “শারীরিক এত প্রতিবন্ধকতা নিয়েও বরাবর প্রথম হয়ে এসেছে ছেলেটি। বাড়িতে দারিদ্র্যও প্রকট। এই অবস্থায় ওর ভবিষ্যত পড়াশোনা নিয়ে আমরাও চিন্তায় রয়েছি।”

মাধ্যমিকে ভাল ফল করে একই ভাবে চিন্তায় পড়েছে সোনামুখীর রাঙ্গামাটি ইউ সি এম বিদ্যাপীঠের ছাত্রী সঙ্গীতা ধাড়া। সে জন্ম প্রতিবন্ধী। চোখে কম দেখে। ৬২৩ নম্বর পাওয়া এই মেয়ে ভবিষ্যতে স্কুল শিক্ষিকা হতে চায়। তার কথায়, ‘‘চোখে ভাল করে দেখতে পাই না। খুব কষ্ট করে পড়ি। তবু আমি কলা বিভাগে আরও পড়তে চাই। শিক্ষিকা হতে চাই। কিন্তু বাড়ির যা অবস্থা। সেই সুযোগ হবে তো!’’ বাড়িতে দারিদ্র্যের আঁধারের জন্য নিজের ভবিষ্যত নিয়ে সংশয় শোনা যায় এই মেধাবীর গলায়। সঙ্গীতার বাড়ি সোনামুখীর কেনেটি মানায়। ফি বর্ষায় দামোদরের জল ঘরে ঢোকে। সেই ঘর মেরামত হয় না। তাই গোয়ালেই কোনওরকমে সে পড়াশোনা করে এসেছে। তার বাবা বাসুদেব ধাড়া নিজের এক বিঘা জমিতে চাষ করে সংসার চালান। তিন মেয়েকে নিয়ে সংসার চালাতে এমনিতে নাজেহাল অবস্থা তাঁরা। তিনি বলেন, ‘‘মেয়ে ভাল ফল করায় আনন্দ যেমন হচ্ছে, তেমনই ভয়ও করছে। ওকে অনেক দূর পর্যন্ত পড়ানোর ইচ্ছে। কিন্তু কী ভাবে পড়াব?’’ সঙ্গীতার স্কুলের শিক্ষক রামপ্রসাদ বিশ্বাস বলেন, “অপুষ্টি থেকে ওই ছাত্রীটির আজন্ম চোখের অসুখ। এই অবস্থাতেও ভাল ফল করা চাট্টিখানি কথা নয়। পড়ার সুযোগ পেলে ও অনেক দূর পর্যন্ত এগোতে পারবে।’’

একই রকম দৃষ্টি প্রতিবন্ধী পাড়া থানার ভাগাবাঁধ হাইস্কুলের ছাত্রী শিল্পা দেওঘরিয়া। পলমা গ্রামের এই মেধাবী মাধ্যমিকে ৬৩৭ নম্বর নিয়ে স্কুলের সেরা হয়েছে। তার কথায়, ‘‘চোখের সামনে বই ধরলে তবেই অক্ষরগুলো ফুটে ওঠে। কিন্তু তাও বেশিক্ষণ পড়া যায় না। চোখ টনটন করে।’’ তার ইচ্ছা, উচ্চমাধ্যমিকের পরে জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষা দিয়ে চিকিৎসক হবে। তবে সাধ পূরণে বাধা সেই দারিদ্র। বাবা প্রদীপ দেওঘরিয়া বিমা সংস্থার এজেন্ট। কিন্তু বিভিন্ন বেসরকারি অর্থলগ্নি সংস্থার ভরাডুবির জেরে তাঁরও রোজগারে টান পড়েছে। তারই মধ্যে মেয়ের চিকিৎসা খরচ রয়েছে। তবে শিল্পার কথায়, ‘‘চোখের সমস্যার থেকে আমার সামনে চ্যালেঞ্জ স্বাবলম্বী হয়ে পরিবারের সবার দেখাশোনা করা।’’

নবম শ্রেণিতে পড়তে পড়তে বাঁ পায়ে ক্যান্সার ধরা পড়ে কোতুলপুর ব্লকের তাজপুর গ্রামের রামচরণ হাইস্কুলের ছাত্র তুহিনশুভ্র পালের। তখন চিকিৎসকরা তার বাঁ পা বাদ দেন। তবু ওই ছেলের মনোবলে চিড় ধরেনি। ওই অবস্থাতেই এ বার মাধ্যমিকে সে ৬৫১ নম্বর পেয়েছে। শুধু তাই নয়, ওটাই এ বার স্কুলের সেরা নম্বর। তাজপুরে গ্রামে তার বাড়ি। স্কুল গ্রামে হলেও ক্র্যাচে ভর করে রোজ স্কুলে যেতে খুব কষ্ট হয়। তুহিনের বাবা তরুণ পাল স্থানীয় একটি স্কুলের প্রাথমিক শিক্ষক। তিনিও অসুস্থ। তাঁর দু’টি কিডনি আক্রান্ত। বাবা ও ছেলের চিকিৎসা করাতে গিয়ে এই পরিবারের পুঁজি বলতে আর কিছু নেই। তাই নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তুার স্বর শোনা গিয়েছে এই মেধাবীর কথায়। তার কথায়, ‘‘আমি বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে চাই। কিন্তু জানি না কী ভাবে কী হবে!” স্কুলের শিক্ষক সৈকত রায় জানান, তাঁরা স্কুল থেকে বিনা খরচে তুহিনের ভর্তির ব্যবস্থা করেছেন। বইপত্রও কিনে দেওয়া হবে।

বিষ্ণুপুরের বড়ামতলা এলাকার কার্তিক দাস লোকের বাড়ি থেকে বই চেয়ে এনে পড়েছে। সেই ছেলেই এ বার বিষ্ণুপুর কৃত্তিবাস উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিকে ৬০০ নম্বর পাওয়ায় তাজ্জব পড়শিরা। ছেলেবেলাতেই বাবাকে হারায় কার্তিক। তার মা সরস্বতী লোকের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করেন। তাঁর চিন্তা, ‘‘বাড়িতে টিনের চালা। বর্ষায় জল পড়ে। লোকের বাড়িতে কাজ করে দিনে কুড়ি-পঁচিশ টাকা রোজগার। ছেলেকে বই কিনে দিতে পারব না।” তবু কার্তিকের বায়না, ‘‘অঙ্ক ও ইতিহাস আমার প্রিয় বিষয়। যে কোনও একটা বিষয়ের আমি স্কুল শিক্ষক হতে চাই। তাই আরও পড়তে চাই।’’ স্কুলের প্রধান শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ পাত্র জানিয়েছে, তাঁরা কার্তিককে উচ্চ মাধ্যমিকে নিখরচায় ভর্তি করবেন।

গণিত ও ভৌতবিজ্ঞানে ১০০ এবং জীবন বিজ্ঞানে ৯৯ নম্বর পেয়ে সবার চোখও টেনেছে রামহরিপুর রামকৃষ্ণ মিশন উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্র বড়জোড়ার নিরিশা গ্রামের বিক্রম মণ্ডল। মাধ্যমিকে ৬৩১ নম্বর এই ছেলে ডাক্তার হয়ে গরিব মানুষদের পাশে দাঁড়াতে চায়। কিন্তু বাধা পরিবারের দারিদ্র। বাবা নিমাই মণ্ডল ভাগ চাষি। বিক্রম জানায়, মিশনের পাঠাগার সে বই পেয়েছে। স্কুলের এক শিক্ষক বিনামূল্যে টিউশন পড়িয়েছেন। তিলি সমাজও বই দিয়েছে। তার আশঙ্কা, ‘‘কিন্তু উচ্চমাধ্যমিকের পড়ার খরচ অনেক। কতদূর পড়াশোনা করতে পারব জানি না।’’

madhyamik strugglers poverty and diseases kotulpur madhyamik candidate purulia madhyamik star candidate birbhum madhyamik star candidate
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy