Advertisement
২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

সাড়ে ৬ বছর জেলে থেকে বেকসুর মুক্ত

জীবনের সাড়ে ছ’টি বছর সংশোধনাগারে কাটিয়ে নির্দোষ প্রমাণিত হলেন স্ত্রী খুনে অভিযুক্ত স্বামী।

অসীমকুমার দাস। বাঁকুড়া আদালতে। নিজস্ব চিত্র

অসীমকুমার দাস। বাঁকুড়া আদালতে। নিজস্ব চিত্র

রাজদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় 
বাঁকুড়া শেষ আপডেট: ৩১ জানুয়ারি ২০১৯ ০৪:৩২
Share: Save:

জীবনের সাড়ে ছ’টি বছর সংশোধনাগারে কাটিয়ে নির্দোষ প্রমাণিত হলেন স্ত্রী খুনে অভিযুক্ত স্বামী। অভিযুক্তকে এত দিন জেলে আটকে রাখা হয়েছিল যে ময়না তদন্তের রিপোর্টের ভিত্তিতে, সেটিই ভুল প্রমাণিত হয়েছে আদালতে। এত গুলি বছর নষ্ট হওয়ার দায় কে নেবে, সেই প্রশ্ন তুলেছেন জেল-খাটা যুবকের পরিজনেরা।

২০১২ সালের ১৯ জুন শ্বশুরবাড়ি খাতড়ার দহলা গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে অগ্নিদগ্ধ হন সঞ্চিতা দাস। তাঁকে খুন ও বধূ নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে স্বামী অসীমকুমার দাস-সহ পরিবারের পাঁচ জনের বিরুদ্ধে। বাকিরা জামিন পেলেও ২০১২ সালের ২০ জুন গ্রেফতারের পর থেকে টানা জেলেই ছিলেন অসীমকুমার। বুধবার বাঁকুড়ার অতিরিক্ত জেলা দায়রা বিচারক (১) মনোজ্যোতি ভট্টাচার্য অসীমকুমার-সহ বাকি অভিযুক্তদের নির্দোষ ঘোষণা করেন। বধূ হত্যা ও বধূ নির্যাতনের দু’টি মামলাতেই তাঁরা নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন।

আসামি পক্ষের আইনজীবী পূর্ণানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, ২০০১ সালে অসীমকুমারের সঙ্গে বিয়ে হয় খাতড়া থানারই সিড়কাবাইদ গ্রামের বাসিন্দা সঞ্চিতার (২৬)। তাঁদের একটি ছেলে ও একটি মেয়ে রয়েছে। শ্বশুরবাড়িতে সঞ্চিতা অগ্নিদগ্ধ হওয়ার পরেই আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে প্রথমে খাতড়া মহকুমা হাসপাতাল ও পরে বাঁকুড়া মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়া হয়। বাঁকুড়া মেডিক্যালে ভর্তি করার কিছুক্ষণের মধ্যেই মৃত্যু হয় তাঁর।

সেই রাতেই অসীমকুমার-সহ তাঁর বাবা, মা, বিবাহিতা বোন ও ভাইয়ের বিরুদ্ধে খাতড়া থানায় বধূ হত্যা ও বধূ নির্যাতনের অভিযোগ দায়ের করেন সঞ্চিতার বাবা সুশীল দাস। পরের দিন গ্রেফতার করা হয় অসীমকুমারকে। তিনি আর জামিন পাননি। বাকি অভিযুক্তদের মধ্যে অসীমকুমারের দিদি আগাম জামিন পান। অন্যদের ধাপে ধাপে গ্রেফতার করা হলে তাঁরাও জামিন পেয়ে যান। তদন্ত করে পুলিশ আদালতে চার্জশিট জমা করে ২০১২ সালের ৩০ অগস্ট।

কী ভাবে নির্দোষ প্রমাণিত হলেন অসীমকুমাররা?

অভিযুক্ত পক্ষের আইনজীবীর দাবি, “ময়না-তদন্তের রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ওই বধূকে প্রথমে শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়। তারপর তাঁর গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু, পুলিশের জমা দেওয়া চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, ওই বধূর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে। বাঁকুড়া মেডিক্যালের যে ডাক্তার সঞ্চিতার চিকিৎসা করেছিলেন, তিনিও আদালতে গিয়ে এ ব্যাপারে সাক্ষ্য দেন। সমস্ত সাক্ষ্য প্রমাণ ময়না-তদন্তের রিপোর্টের বিরুদ্ধে গিয়েছে। খুনের তত্ত্ব তাতেই খারিজ হয়ে যায়।’’ তিনি দাবি করেছেন, বধূ নির্যাতনের স্বপক্ষেও উপযুক্ত প্রমাণ দেখানো যায়নি। তাই বিচারক অভিযুক্তদের নির্দোষ ঘোষণা করেন। সরকার পক্ষের আইনজীবী অমিয় চক্রবর্তী অবশ্য এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাবেন বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, “এখানে অসীমকুমার ছাড়া পেলেও আমরা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাব।”

এ দিনই বাঁকুড়া সংশোধনাগার থেকে ছাড়া পান বছর সাঁইত্রিশের অসীমকুমার। তিনি জানান, বাংলা নিয়ে স্নাতকোত্তর পাশ করে সরকারি চাকরির চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। সংসার চালাতে বিমা সংস্থার এজেন্টের কাজ করতেন। স্ত্রীর মৃত্যুর পরে তাঁর ছেলে ও মেয়েকে শ্বশুরবাড়ির লোকজন নিয়ে চলে যান। তিনি বলেন, ‘‘শেষ পর্যন্ত সুবিচার পেলেও একটা মিথ্যা রিপোর্ট আমার জীবনের বহু মুল্যবান সময় কেড়ে নিল। ছেলেমেয়েগুলোকে খুব দেখতে ইচ্ছা করত। কিন্তু, শ্বশুরবাড়ির লোকেরা একবারও ওদের আমার কাছে নিয়ে আসেনি। এই দুঃখ কী ভাবে পূরণ হবে?’’ এ দিন চেষ্টা করেও সঞ্চিতার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement

Share this article

CLOSE