বাতিল নোটে হোঁচট খেল এ বারের বিষ্ণুপুর শিশু বইমেলা। আজ, রবিবার বিষ্ণুপুর স্টেডিয়াম চত্বরে মেলার শেষ দিন। শুরু হয়েছিল চলতি মাসের ২১ তারিখ থেকে। তখন পাঁচশো এবং হাজার টাকার নোট বাতিলের পরে বেশ কিছু দিন কেটে গিয়েছে। ফলে একটা ধাক্কা যে আসতে চলেছে তা বিলক্ষণ টের পেয়েছিলেন মেলা কমিটির কর্তারা। মোকাবিলার জন্য বেশ কিছু চেষ্টাও করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু তাঁদেরই অনেকে এখন মনে করছেন, শেষ পর্যন্ত ফাঁড়া পুরোপুরি কাটানো গেল না।
সম্প্রতি মেলায় গিয়ে দেখা গেল, অধিকাংশ দোকানেই বিক্রেতারা কার্যত মাছি তাড়াচ্ছেন। একটি প্রকাশনা সংস্থার পক্ষ থেকে ধনঞ্জয় গড়াই বলেন, ‘‘এতটা কম বিক্রি হবে সেটা আগে থেকে আঁচ করতে পারিনি। কলকাতা থেকে বইপত্র নিয়ে এসেছি। পরতায় পোষাচ্ছে না।’’ এই পরিস্থিতিতে অনেক বিক্রেতাই জানান, বেশি বই নিয়ে ফিরতে হলে ফের বিস্তর খরচ হবে। তাই একটু বেশি ছাড় দিয়ে মেলাতেই বই বিক্রি করে দিতে চাইছেন তাঁরা।
গত বছর মেলায় ২৪টি সংস্থা স্টল দিয়েছিল। সেই সংখ্যাটা এ বারে কমে হয়েছে ২১। মেলা কমিটির কর্তাদের দাবি, সমস্যা হবে বুঝতে পেরে বাতিল নোটের মোকাবিলায় তাঁরা রীতিমতো তৈরি হয়ে মাঠে নেমেছিলেন। মেলায় আসা প্রকাশনা সংস্থাগুলির কাছে ক্রেতাদের থেকে পাঁচশো টাকার পুরনো নোট নেওয়ার জন্য আবেদন করা হয়েছিল। মেলা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক রবীন্দ্রনাথ পাত্র জানান, পাততাড়ি গোটানোর আগেই বিক্রেতাদের সেই বাতিল নোট বদল করে দেবেন তাঁরা। নোটগুলি নিয়ে জমা করা হবে কমিটির অ্যাকাউন্টে। তার আগে কয়েক জন সদস্য ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে রাখবেন। সেগুলিই নোটের বদলে হাতে হাতে দিয়ে দেওয়া হবে বিক্রেতাদের।
কিন্তু তার পরেও অধিকাংশ বিক্রেতা সেই আবেদনে সাড়া দেননি। তাঁদের আশঙ্কা বাতিল নোট নিয়ে ফেলে শেষ মুহূর্তে কোনও সমস্যায় না পড়তে হয়! গুটিকয় দোকানে অবশ্য পাঁচশো টাকার পুরনো নোট নেওয়া হচ্ছে। তেমনই একটি সংস্থার পক্ষ থেকে সমর পাল জানান, নিদেন পক্ষে চারশো টাকার বই কিনলে তাঁরা পাঁচশো টাকার বাতিল নোট নিচ্ছেন। কিন্তু তাঁদের মতে, নোট বাতিলের থেকেও বেশি সমস্যা হচ্ছে অ্যাকাউন্টের টাকা তোলার সীমা বেঁধে দেওয়ায়।
গৃহস্থের হাতে থাকা বাতিল নোটের বেশ কিছুটারই এক প্রকার গতি এই ক’দিনে হয়ে গিয়েছে। কিন্তু নতুন করে বেশি টাকা তুলতে না পেয়ে আতান্তরে পড়েছেন অনেকে। কেন্দ্রীয় সরকারের এই পর্যন্ত শেষ ঘোষণা অনুযায়ী গ্রাহকদের যে পরিমান টাকা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে তুলতে পারার কথা, জেলার বেশ কিছু ব্যাঙ্কেই সেই মতো জোগান নেই। সেখানে এক লপ্তে হাজার পাঁচেক টাকা পাচ্ছেন অনেকে। যার সিংহ ভাগই সংসার খরচে চলে যাচ্ছে। তাই মেলায় এসে বই কিনতে গিয়েও থমকে যাচ্ছেন অনেকে। বাবা রূপসনাতন দে-র সঙ্গে মেলায় এসেছিল অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী পরমা দে। পছন্দের বই খুব বেশি কিনতে পারেনি সে। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মী নয়নতারা দে বলেন, ‘‘বই কেনাটা অনেকটা নেশার মতো। ছোটদেরও উপহার হিসেবে বই দিতে ভালবাসি। অন্যবার এই মেলা থেকে অনেক বই কিনি। এ বারে টানাটানির মধ্যে বেশি খরচ করতে সাহস
পেলাম না।’’
এই পরিস্থিতিতে শহরের এক গ্রন্থরসিকের মন্তব্য, ‘‘গৃহস্থের পকেটে টান পড়লে বই আর সেই আঁচ এড়াবে কী করে!’’