ভোট মিটল শান্তিপূর্ণ ভাবে। তবে মৃত্যু এড়ানো গেল না। ভোটের লাইনে অসুস্থ হয়ে মৃত্যু হল এক বৃদ্ধের। এ দিকে, ভোট-পর্বে বৃহস্পতিবার দিনভর কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘অতিসক্রিয়তার’ অভিযোগ তুলল তৃণমূল। দলীয় এক এজেন্টকে মারধরও করা হয় বলে দাবি। পাল্টা, বাহিনীর ভূমিকা ইতিবাচক ছিল জানায় বিজেপি-সহ অন্য বিরোধীরা।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বাঁকুড়ার জয়পুরের কাশিচটা গ্রামের কাশেম চৌধুরী (৬৫) এ দিন বিকেলে কোতুলপুর কেন্দ্রের জয়পুর ব্লকের উপর জগন্নাথপুর বুথে ভোট দিতে গিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিলেন এক আত্মীয়। তা নিয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনী আপত্তি জানানোয় বচসা শুরু হয়। অসুস্থ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন কাশেম। স্থানীয়েরা গাড়িতে তাঁকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার দাবি তুললেও তাতে ‘জিপিএস’ লাগানো আছে বলে গাড়ি দিতে অস্বীকার করে বাহিনী। শুরু হয় বিক্ষোভ। পরে রাজ্য পুলিশ ও বাহিনী দ্রুত ওই বৃদ্ধকে বিষ্ণুপুর হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসক তিনি মৃত বলে জানান। মৃতের নাতি সওকত আলি চৌধুরীর দাবি, “দাদু অসুস্থ ছিলেন। তাই সঙ্গে এক জন গিয়েছিলেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় বাহিনী তা মানেনি। সময়ে গাড়ি পাওয়া গেলে দাদু হয়তো বেঁচে যেতেন।”
কোতুলপুরের তৃণমূল প্রার্থী হরকালী প্রতিহার বলেন, “এক বৃদ্ধ ভোটার সাইকেল চালিয়ে চার কিলোমিটার দূর থেকে আসছেন। অথচ তাঁকে কেন্দ্রীয় বাহিনী ধমকাবেন, এটা মানা যায় না। বৃদ্ধ নিজের সঙ্গে এক আত্মীয়কে এনেছিলেন। তাতে অপরাধ কোথায়?” ঘটনার দায় নির্বাচন কমিশনকেই নিতে হবে। পরিবারকেও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।” ঘটনাটি একান্তই প্রশাসনিক বিষয়, জানিয়েছেন ওই কেন্দ্রের প্রার্থী লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার। জেলাশাসক অনীশ দাশগুপ্ত বলেন, “ঘটনাটি খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। সে সময়ে কার, কী ভূমিকা ছিল, খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
এ দিকে, বুধবার রাতভর বিভিন্ন এলাকায় তৃণমূল নেতাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুলিশ ও আধা সেনা ভয় দেখিয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন বাঁকুড়ার সাংসদ অরূপ চক্রবর্তী। তাঁর দাবি, “বাঁকুড়া ১ ব্লক, মেজিয়া, তালড্যাংরা, শালতোড়ার মতো এলাকায় আমাদের স্থানীয় নেতাদের বাড়ি গিয়ে পুলিশ ও আধা সেনা ভয় দেখিয়েছে। নির্বাচন কমিশন ও জেলা প্রশাসনে অভিযোগ জানিয়েছি।” রাতে পার্টি অফিস থেকে ডেকে পাঠিয়ে ভোটের দিনের কর্মসূচি জানতে চাওয়া হয়েছে বলে দাবি বাঁকুড়া ১ ব্লকের তৃণমূল সভাপতি অংশুমান বন্দ্যোপাধ্যায়েরও।
ভোটের দিন সকালে কোতুলপুরের যমুনা গ্রামে কিছু লোকজন মোটরবাইক নিয়ে জমায়েত করছে বলে অভিযোগ তোলে বিজেপি। কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানেরা জমায়েত লক্ষ করে তেড়ে যায়। জমায়েতকারীরা গ্রামের দিকে দৌড়ন। তাঁদের পিছু নিয়ে গ্রামে ঢুকে পড়েন জওয়ানেরা। একটি বাড়ির উঠোনে থাকা চারটি বাইক লাঠি দিয়ে ভাঙচুর করা হয় বলে অভিযোগ। গ্রামের বাসিন্দা রবিয়াল মল্লিক, সেখ মনিরুদ্দিন, আসপিয়া বিবিরা বলেন, “আমাদের আত্মীয়দের বাইক বাড়ির সামনে রাখা ছিল। সেগুলি জওয়ানেরা ভাঙচুর করেন। আমাদের হুমকিও দিয়েছে।” ঘটনার কথা জেনে গ্রামে যান তৃণমূল প্রার্থী হরকালী। তিনি বলেন, “বিজেপির নির্দেশে নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনী আমাদের ভোটারদের উপরে অত্যাচার করেছে।” বিজেপি প্রার্থী লক্ষ্মীকান্তের দাবি, “সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে তৃণমূল কর্মীরা অবৈধ জমায়েত করে ভোটারদের শাসানি দিচ্ছে বলেই অভিযোগ জানাই আমরা। কেন্দ্রীয় বাহিনী আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সচেষ্ট।”
অন্য ঘটনায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর লাঠির আঘাতে তালড্যাংরা কেন্দ্রের দলীয় প্রার্থীর নির্বাচনী এজেন্ট রক্তাক্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ তুলেছে তৃণমূল। বিবড়দা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৭১ নম্বর বুথের ঘটনা। ওই এজেন্ট অনির্বাণ পাত্রের দাবি, এ দিন দুপুরে তিনি স্কুলে ঢুকতে গেলে তাঁর পথ আটকায় বাহিনী। তিনি সচিত্র পরিচয়পত্র দেখালেও লাভ হয়নি। ঘটনাটি প্রিসাইডিং অফিসারকে জানালে তিনি অনুমতি দেন। তাঁর অভিযোগ, “ঘটনাটি মেনে নিতে পারেননি বাহিনীর জওয়ানেরা। শৌচালয়ের পাশে টেনে নিয়ে গিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়।” খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী ফাল্গুনী সিংহবাবু। আহত এজেন্টকে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি বলেন, “বিষয়টি পুলিশ ও দলীয় নেতৃত্বকে মৌখিক ভাবে জানানো হয়েছে। দলের নির্দেশ পেলে থানায় লিখিত অভিযোগ করা হবে।”
যদিও পুরুলিয়ার রঘুনাথপুরের মতো কয়েকটি জায়গায় তৃণমূল ‘বুথ জ্যাম’ করে ছাপ্পা ভোট দেওয়ার চেষ্টা করেছিল বলে অভিযোগ তুলেছেন পুরুলিয়ার বিজেপি সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো। তিনি বলেন, “দলের নেতা-কর্মী ও আধা সেনার তৎপরতায় সেই চেষ্টা সফল হয়নি। গোটা বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের নজরে আনা হয়েছে।” রঘুনাথপুরের তৃণমূল প্রার্থী হাজারি বাউরির আবার দাবি, বুথের বাইরের দলের শিবিরে থাকা কর্মীকে কার্যত বিনা কারণেই তুলে নিয়ে যায় আধা সেনা। বহু বুথে চড়া রোদে ভোটারদের অহেতুক দাঁড় করিয়ে রেখেছিল কেন্দ্রীয় বাহিনী। তিনি বলেন, “বেশ কিছু ক্ষেত্রে আধাসেনা বাড়াবাড়ি করেছে। তবে ভোটারেরা শান্তিপূর্ণ ভাবেই ভোট দিয়েছেন।”
পুরুলিয়ার বিজেপি প্রার্থী সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “কেন্দ্রীয় বাহিনীর কারণেই তৃণমূল চেষ্টা করেও ভোটে অশান্তি পাকাতে পারেনি।” কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা ইতিবাচক ছিল জানিয়ে বাঘমুণ্ডিরকংগ্রেস প্রার্থী নেপাল মাহাতো বলেন, “রাজনৈতিক হানাহানি জেলাবাসী পছন্দ করেন না। তা এবারেও অটুট ছিল।”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)