মেয়েদের কলেজ। তাই কলেজে বাগদেবীর পুজোপাঠ মেয়েরাই করবেন। এই ভাবনা নিয়েই পুরুলিয়ার নিস্তারিণী মহিলা মহাবিদ্যালয়ে ছ’বছর আগে কলেজের ছাত্রীরাদের দিয়েই সরস্বতী পুজো হয়ে আসছে। আজ শনিবারও কলেজে পুজো হবে। পৌরহিত্য করার জন্য তাই গত ক’দিন ধরে রীতিমতো প্রশিক্ষণ নিলেন চার পড়ুয়া।
এত দিন কলেজে যিনি সরস্বতী পুজো করতেন, সেই পুরোহিত ধনঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানেই ছাত্রীদের পুজোপাঠের কর্মশালা চলল। মাঙ্গলিক আচার ও রীতি মেনে কী ভাবে পুজো করতে হবে, ষোড়শ উপচারে কী ভাবে মৃন্ময়ী মূর্তির প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হবে, কী ভাবেই বা হোম ইত্যাদি হবে তিনি পুজোর জন্য বাছাই করা চার ছাত্রীকে তা হাতে-কলমে শিখুয়ে দিলেন। কর্মশালা চলল কলেজের প্রার্থনা গৃহে।
কলেজের অধ্যক্ষ ইন্দ্রাণী দেব জানিয়েছেন, সংস্কৃতের সাম্মানিক ছাত্রী কাঞ্চন মণ্ডল, বিজ্ঞান পাশ কোর্সের পূজা সিং দেও, সাম্মানিক ভূগোলের ছাত্রী রিয়া পাল ও সাম্মানিক দর্শনের ছাত্রী রীতা চৌধুরীকে পুজোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে গত দু’বছর ধরে সংস্কৃতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যতগুলি কলেজ রয়েছে, তার মধ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছেন কাঞ্চন মণ্ডল। তাই পুরোহিত মশাই তাঁকেই পুজোতে তন্ত্রধারকের দায়িত্ব দিয়েছেন।
কলেজের ছাত্রীনিবাসের প্রার্থনা গৃহে টানা কয়েকদিন ধরে ধনঞ্জয়বাবুর তত্ত্বাবধানে ছাত্রীদের কর্মশালা চলেছে বলে জানিয়েছেন ছাত্রীনিবাসের সুপারিন্টেডেন্ট মালবিকা রায় প্রামাণিক। তাঁর কথায়, ‘‘প্রথমে ওঁদের আড়ষ্ট ভাব ছিল। বেশ কয়েকদিনের অভ্যাসে সেই ভাবটা কেটে গিয়ে এখন ওঁরা রীতিমতো স্বাচ্ছন্দ্য।’’ আর ধনঞ্জয়বাবু জানান, তন্ত্রধারক পুজোটা করাবেন, পুজো করবে পূজা নামের মেয়েটি। বাকি দু’জন ওঁদের সহায়কের ভূমিকা পালন করবে। তাঁর কথায়, ‘‘মূর্তি পুজো তো ষোড়শ উপচারে হয়। প্রাণ প্রতিষ্ঠা, ধ্যান মন্ত্র, পঞ্চদেবতা স্মরণ-সহ সবকিছুই ওঁরা সবাই খুব নিষ্ঠা ভরে করছে। বিশুদ্ধ উচ্চারণই পুজোর মূল বিষয়।’’
এই কলেজের ঐতিহ্য অন্যখানে। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের মায়ের নামাঙ্কিত এই মহিলা কলেজটিই জেলার একমাত্র মহিলা কলেজ। ছাত্রীদের কথায়, এই কলেজটি নিছক একটি কলেজ নয়। অনেক গৌরবজ্জ্বল স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে গোটা কলেজ চত্বর জুড়ে। যেখানে কলেজটি দাঁড়িয়ে, সেখানেই ছিল ক্লার্কস বাংলো। বাবা ভুবনমোহন ও মা নিস্তারিণীদেবীর বসবাসের জন্য এই বাড়িটি কিনেছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। নিস্তারিণীদেবী পরবর্তীকালে এই বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। স্ত্রী’র মৃত্যুর সাত মাস পরে কলকাতায় ভুবনমোহনের মৃত্যু হয়। তাঁর চিতাভস্ম এনে সহধর্মিনীর সমাধির পাশে রাখা হয়। এখনও কলেজ চত্বরে দু’টি সমাধি পাশাপাশি রয়েছে। পরবর্তীকালে ১৯৫৬ সালের নভেম্বর মাসে পুরুলিয়া পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হলে রাজ্য সরকার এক লক্ষ টাকায় বাড়িটি কিনে দেশবন্ধুর মায়ের নামে মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ, মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়-সহ অনেক বিশিষ্ট মানুষজন এই কলেজে পদার্পণ করেছেন। সেই কলেজেই এখন মেয়েরা সরস্বতীপুজো করে নতুন ঐতিহ্য তৈরি করেছেন বলে মনে করেন অনেকে।
অধ্যক্ষ ইন্দ্রাণীদেবী বলেন, ‘‘আমাদের কাছে পুজো সবর্ধর্ম সমন্বয়। সরস্বতী পুজোও তার ব্যতিক্রম নয়। ছাত্রীদের পুজো ছাত্রীরা করছে। পুজোর দিনে লালপাড় গরদের শাড়ি পরে পুজোয় বসবে। আমরা সবাই ওঁদের পাশে রয়েছি।’’ আর পূজা, কাঞ্চনদের কথায়, ‘‘কলেজ আমাদের দায়িত্ব দেওয়ায় গর্বিত। কিন্তু পুজো ঠিক ঠাক ভাবে করা নিয়ে টেনশনও রয়েছে। তবে পারব এই বিশ্বাস আছে।’’