কেউ ১৪ মাসের বেতন পাননি, কেউ বকেয়া বেতনের দাবিতে চার বছর সরকারি দফতরের দরজায় দরজায় ঘোরাঘুরি করে হয়রান!
অভিযোগ, শিশু শ্রমিকদের স্কুলে কাজ করিয়ে বেতন দেয়নি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। এমন অভিযোগ তুলে ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার অনুমোদন বাতিলের দাবিতে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে চিঠি পাঠালেন তিন যুবক যুবতী। তাঁদের দাবি, টানা চার বছর ধরে প্রশাসনের নানা দফতরে ঘুরেও মেলেনি প্রাপ্য বেতনের অর্থ। আমোদপুরের ঘটনা।
প্রশাসন সূত্রে খবর, জাতীয় শিশু শ্রমিক উন্নয়ন প্রকল্পে ২০১০ সালে আমোদপুরের স্পোর্টস কমপ্লেক্স নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে শিশুশ্রমিক বিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয় প্রশাসন। নিয়মানুযায়ী, ৫০ জন শিশু শ্রমিকের জন্য প্রতি তিন বছরের (শিক্ষাবর্ষ) চুক্তিতে ওই অনুমোদন দেওয়া হয়। স্কুলের ভাড়া, বইপত্র, পড়ুয়াদের ভাতা-সহ স্কুলের জন্য মাসিক ৪ হাজার বেতনে ৩ জন শিক্ষক এবং ৩ হাজার টাকা বেতনে একজন হিসাব রক্ষক ও ২ হাজার টাকা বেতনের একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মী বরাদ্দ করে সংশ্লিষ্ট দফতর। নিয়োগের তালিকা পাঠানোর পর প্রকল্প আধিকারিকের দফতর থেকে বরাদ্দ টাকা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেই টাকা শিক্ষকদের দেওয়ার কথা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার। কিন্ত অভিযোগ, আমোদপুরের ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা তিন শিক্ষককে দীর্ঘ দিন বেতন দেয়নি।
শিক্ষকতা করেও বেতন পাননি উৎপল ভট্টাচার্য। ২০১০ সালের অক্টোবর মাসে ওই স্কুলে শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন স্থানীয় বাসিন্দা উৎপলবাবু। স্কুলের হাজিরা খাতা অনুযায়ী, তিনি ওই স্কুলে ২০১২ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত শিক্ষকতা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, ‘‘ওই সময়কালের মধ্যে ১৪ মাসের বেতন বাবদ ৫৬ হাজার টাকা পাইনি।’’ একই অভিযোগ জানালেন আরও দুই শিক্ষিকা দেবলীনা বিশ্বাস এবং শুক্লা মণ্ডল। তাঁরাও ওই একইসময় স্কুলটিতে শিক্ষিকা হিসাবে যোগ দেন। তাঁদের দাবি, ৬ মাসের বেতন বাবদ ২৪ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়নি।
ঘটনা হল, তিন জনেই বকেয়া বেতনের দাবিতে ৪ বছর ধরে রাজ্য শ্রম দফতর থেকে জেলা শ্রম দফতর তথা প্রকল্প আধিকারিক, জেলাশাসক, বিডিও-সহ বিভিন্ন দফতরে ঘোরাঘুরি করে হয়রান হয়ে পড়েছেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা বলছে, বকেয়া তো মেলেইনি, উল্টে কর্তৃপক্ষের চাপে কাজ থেকে ইস্তফাও দিতে হয়েছে। এর ফলে আর্থিক সংকটে পড়েছেন তাঁরা। শেষে ঘটনার কথা জানিয়ে বকেয়া আদায়ের পাশাপাশি তাঁরা ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার অনুমোদন বাতিল করার দাবি জানিয়ে চিঠি লিখেছেন খোদ মুখ্যমন্ত্রীর কাছে।
অভিযোগ এখানেই শেষ নয়। তাঁদের দাবি, যে কয়েক মাস কাজ করেছিলেন ওই শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীরা, সরকারি বরাদ্দ পেয়েছে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। দাবি, ‘‘প্রথমদিকে যে কয়েক মাসের বেতন দিয়েছিল সংস্থা, প্রতিমাসে ৪০০ টাকা করে কম দেওয়া হয়েছে। কাজ হারানোর আশঙ্কায় আমরা পুরো বেতন প্রাপ্তির কাগজে সই করে দীর্ঘ দিন ধরে ওই বঞ্চনা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি। প্রশাসনের সকল স্তরে জানিয়েও কোনও কাজ হয়নি। তাই আর কেউ যাতে আমাদেরই মতো প্রতরণার শিকার না হয় তার জন্যই মুখ্যমন্ত্রীর কাছে চিঠি পাঠিয়েছি।’’
ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্ণধার সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য প্রতরণার অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘‘অভিযোগ ঠিক নয়। ওইসব শিক্ষক-শিক্ষিকার যে সময় কালের বেতন পাননি বলে দাবি করেছে সেই সময়কালে বরাদ্দ সরকারই আমাকে দেয়নি। তাই আমিও দিতে পারিনি।’’
তাহলে কি বরাদ্দই মেলেনি?
প্রকল্পের জেলা অধিকর্তা তথা জেলা সহকারি শ্রম আধিকারিক প্রসেঞ্জিত কুণ্ডু বলেন, ‘‘ঘটনাটি আমি আসার আগে ঘটেছে। তাই খোঁজ না নিয়ে বিস্তারিতভাবে কিছু বলতে পারছি না। তবে এটুকু বলতে পারি ওই অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। তদন্তে যদি দেখা যায় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ওই সময়কালের টাকা সত্যিই পায়নি, তাহলে তা দিয়ে দেওয়া হবে। আর যদি দেখা যায়, টাকা পেয়েও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বেতন দেয়নি তাহলে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’