মঞ্চের এক প্রান্তে বক্তৃতা দিচ্ছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক মুকুল রায়। মঞ্চে থাকা নেতাদের মন কিন্তু অন্য দিকে। তাঁরা অনেকেই মোবাইলে কিংবা ক্যামেরায় ছবি তুলতে ব্যস্ত। মুকুলের নয়, নায়কের।
কেউ কেউ নায়কের পাশেই দাঁড়িয়ে পোজ দিচ্ছিলেন। নায়ক পাশে দাঁড়িয়ে হাত নাড়লেন। তিনিও তো প্রার্থী, তাঁরও তো সভা!
দেব পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটাল থেকে দাঁড়িয়েছেন। এখন পুরুলিয়ায় রয়েছেন শু্যটিংয়ের কাজে। তারই ফাঁকে দলের কর্মীদের দাবিতে রবিবার বিকেলে পুরুলিয়া শহরের জে কে কলেজের মাঠে সভা করলেন তিনি। তাঁর কথার মধ্যে দর্শকদের হর্ষধ্বনি বুঝিয়ে দিল সভাটা ভোট-প্রচারের হলেও আকর্ষণ এক জনই দেব।
পুরুলিয়া ২ ব্লকের গোলকুণ্ডা গ্রাম থেকে দুই তরুণী মাম্পি মাহাতো ও বিপাশা মাহাতো বেলা ১২টাতেই দেবকে দেখতে মাঠে চলে এসেছিলেন। তাঁরা বলেন, “খেতে গেলে দেরি হবে। তাই উপোস করেই চলে এলাম।” আড়শার কাঁটাডি গ্রাম থেকে মা অঞ্জনা গোস্বামীকে নিয়ে এসেছিলেন পূজা গোস্বামী। দেব মঞ্চে উঠতেই সবার সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ে আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন। অনেকে দুড়দাড় করে ব্যারিকেডের কাছে এগোতে গিয়ে পুলিশের তাড়া খেয়ে পিছিয়ে এলেন।
মঞ্চে উঠে দেব তখন হাত নাড়তে নাড়তে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত হেঁটে বেড়াচ্ছেন। চেয়ারে বসে পরিচালক রাজ চক্রবর্তী। মাইক্রোফোন হাতে মুকুল রায় বলতে শুরু করলেন, আড়াই বছরে রাজ্য সরকারের সাফল্যের কথা। সেখান থেকে কংগ্রেসের দুর্নীতি, কেন্দ্রে সরকার গঠনে তৃণমূলই নির্ণায়ক শক্তি হতে যাচ্ছে ইত্যাদি। কিন্তু দর্শকদের নজরে শুধুই দেব। তিনি যে দিকে তাকাচ্ছেন, সেই অংশের দর্শকরা হাত নেড়ে চিৎকার করে উঠছেন।
মঞ্চে ছিলেন মন্ত্রী শান্তিরাম মাহাতো, দলের সভাধিপতি সৃষ্টিধর মাহাতো, বর্ষীয়ান বিধায়ক কে পি সিংহদেও। তাঁদের অনেকেও তখন দেবকে নিয়ে ব্যস্ত। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ বা দেবের গা ঘেঁষে ছবির পোজ দিচ্ছেন। জেলার প্রথম সারির নেতাদের ঠেলে একটু জায়গা করে সামনে আসার চেষ্টা করতে গিয়ে এক নেতা মুকুল রায়ের মৃদু ধমকও খেলেন। অবস্থা দেখে মুকুলবাবু বললেন, “বুঝতেই পারছি বক্তৃতা শোনার মুড নেই আপনাদের। দেবকে দু’টো কথা বলতে দিতে হবে তাই তো?” সমস্বরে চিৎকার করে উঠল জনতা।
“কেমন আছে পুরুলিয়া?” দেব কথা বলতেই আবার চিৎকার। ব্যারিকেডের বাঁশ মড়মড় করে উঠল। জনতাকে পিছন দিকে ঠেলে দিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দ্যুতিমান ভট্টাচার্য, ডিএসপি (শৃঙ্খলা ও প্রশিক্ষণ) কুন্তল বন্দ্যোপাধ্যায়, রঘুনাথপুরের এসডিপিও পিনাকী দত্তরা। দেব বললেন, “এ ভাবে আপনাদের সঙ্গে কখনও আলাপ হয়নি। আমি আগে এখানে শু্যটিং করতে এসেছিলাম। আজ এসেছি মুকুলদার সঙ্গে।” তার পরেই অন্য দিকে ঘুরে বললেন, “এই প্রচণ্ড গরমে আপনারা দু’তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে রয়েছেন, তার জন্য ধন্যবাদ। কত কষ্ট হচ্ছে বুঝতে পারছি।”
ভোটে দাঁড়ানোর পরে নিজের কেন্দ্রে এ পর্যন্ত তিন বার জনতার সামনে এসেছেন দেব। এ দিন কিন্তু দলের অন্য প্রার্থীর প্রচারে এসে অনেক বেশি কথা বললেন। কী ভাবে কেন তিনি রাজনীতিতে এসেছেন, সেই কাহিনিও জানালেন দর্শকদের। স্বীকার করলেন, “আমিও আগে ভাবতাম, এ সব ভোট-টোট দিয়ে কিস্যু কি হয় বস্? তার পর এক দিন দিদির সঙ্গে দেখা হল। দিদি বললেন, দেশকে চালাবে যুবশক্তি। সে দিন থেকে আমার ধারণা বদলাল।” পুরুলিয়া কেন্দ্রের প্রার্থী মৃগাঙ্ক মাহাতোকে পাশে নিয়ে বলেন, “পলিটিক্স বুঝি না। দেশটার ভাল করা, রাজ্যটার ভাল করা বুঝি। প্রার্থী পছন্দ তো? তৃণমূলকে দিল্লি অবধি নিয়ে যেতে হবে।” দর্শকদের জন্য রইল তাঁর আহ্বান, “দায়িত্ব নিন। আমাদের রাজ্য, আমাদের দেশ আমরাই গড়ব। ভোটের দিন কিন্তু ছুটির দিন নয়। ঠিক লোককে ভোটটা দিন। একটাই অপশন, চোখ বন্ধ করে মমতাদিকে ভোটটা দিন। প্রত্যেকে দিদিকে সমর্থন করুন।”
এত কথা সচরাচর বলেন না দেব। এ দিন বললেন। তার পর নিজেই বলে উঠলেন, “এর বেশি তো কোনও দিন কথা বলিনি। স্টক শেষ।” দর্শকরা দাবি তুললেন, তা হলে গান করুন। রাজ চক্রবর্তীকে দেখিয়ে দেব বললেন, “রাজ গাইবে।” মাইক্রোফোন টেনে নিলেন রাজ। গান অবশ্য হল না। পুরুলিয়া কত সুন্দর জায়গা, তৃণমূলকে ভোট দিন এ সবই হল। দেব পাশে দাঁড়িয়ে থাকলেন। ঘড়ির কাঁটা তত ক্ষণে পাঁচটার দিকে এগিয়েছে।