মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) দিতে সুপ্রিম কোর্ট যে নির্দেশ দিয়েছে, তার পাল্টা সময়সীমা বাড়ানোর আবেদন জানিয়ে আদালতে আবেদন করেছে রাজ্য সরকার। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর আদালতের রায় ডিএ পাওয়ার আশায় বুক বাঁধছিলেন সরকারি কর্মচারীরা। কিন্তু শুক্রবার রাতে রাজ্য সরকারের আবেদনের খবর জানাজানি হতেই, ফের রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে কোমর বেঁধে লড়াইয়ে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকারি কর্মচারী সংগঠনগুলি। এ ক্ষেত্রে দু’টি পথে এই লড়াই হবে বলে জানিয়েছে তারা। প্রথমটি আদালতে, এবং দ্বিতীয় লড়াইটি হবে কর্মবিরতি, ধর্মঘট তথা বন্ধের মধ্যে দিয়ে।
প্রসঙ্গত, ৫ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট দিয়ে মামলার রায় ঘোষণা করে। নির্দেশ দেয়, রাজ্যের সরকারি কর্মচারীদের পুরনো বকেয়া মহার্ঘ ভাতা (ডিএ)-র ২৫ শতাংশ অবিলম্বে মিটিয়ে দিতেই হবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে। বিচারপতি সঞ্জয় করোল এবং বিচারপতি মনোজ মিশ্রের বেঞ্চ জানিয়ে দেয়, ডিএ সরকারি কর্মচারীদের আইনি অধিকার। ২৫ শতাংশ দ্রুত মেটানোর পর বাকি ৭৫ শতাংশ কী ভাবে দেওয়া হবে, তার একটা রূপরেখাও তৈরি করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। ২০০৯ সালের অগস্ট থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত যে ডিএ বকেয়া রয়েছে, এই রায় তার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এই মুহূর্তে কেন্দ্র এবং রাজ্যের ডিএ-র মধ্যে যে ফারাক রয়েছে (৪০ শতাংশ, যা এপ্রিল থেকে কমে ৩৬ শতাংশ হবে) তার ক্ষেত্রে এই রায় প্রযোজ্য নয়।
সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ইন্দু মলহোত্রের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে দেন বিচারপতিরা। যারা ডিএ সংক্রান্ত মামলার রায় যথাযথ ভাবে কার্যকর করার ক্ষেত্রে অন্যতম ভূমিকা নেবেন। এই কমিটিতে রাখা হয় ঝাড়খণ্ড হাই কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি তরলোক সিংহ চৌহান এবং ছত্তীসগঢ় হাই কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি গৌতম ভাদুড়ি। এ ছাড়াও ওই কমিটিতে রাখা হবে কেন্দ্রের ‘কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল’-এর এক জন উচ্চপদস্থ আধিকারিককে। কমিটির কী দায়িত্ব হবে, তা-ও জানিয়ে দেয় সুপ্রিম কোর্ট। আদালত বলেছে, কমিটির মূলত দায়িত্ব হবে তিনটি— ১) মোট কত টাকা কত খেপে দেওয়া হবে, তা স্থির করা ২) কত দিনের মধ্যে, কত কিস্তিতে দেওয়া হবে, তা স্থির করা, ৩) নির্দিষ্ট সময় অন্তর নির্ধারিত টাকা ছাড়া হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা। রাজ্য সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করেই সব কিছু নির্ধারণ করবে ওই কমিটি। আর এই পুরোটাই বকেয়া ডিএ-র ৭৫ শতাংশের জন্য প্রযোজ্য।
কিন্তু সুপ্রিম কোর্টে মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) মামলার রায় কার্যকর করার সময়সীমা বাড়ানোর আবেদন জানিয়ে নতুন করে আবেদন জমা দিয়েছে নবান্ন। শুক্রবার এই সংক্রান্ত আবেদন শীর্ষ আদালতে দাখিল করা হয়েছে। রাজ্য সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, ডিএ বকেয়া পরিশোধ সংক্রান্ত নির্দেশ বাস্তবায়নে একাধিক প্রশাসনিক, প্রযুক্তিগত এবং আর্থিক জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে। সেই কারণেই নির্ধারিত সময়সীমা বাড়ানোর আবেদন জানানো হয়েছে। যদিও বকেয়া ডিএ নিয়ে মূল মামলাকারী কনফেডারেশন অফ স্টেট গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজ়-এর সাধারণ সম্পাদক মলয় মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘আমরা জেনেছি ইমেল মারফত রাজ্য সরকার তাদের আবেদন সুপ্রিম কোর্টের কাছে জানিয়েছে। যদিও আমরা রাজ্য সরকারের ডিএ না-দেওয়ার অভিসন্ধি বুঝতে পেরেই আগে থেকে আদালত অবমাননার মামলা করে রেখেছি। তাই তাদের আবেদন শোনার আগে আদালত আমাদের অবমাননার মামলা শুনবে। পাশাপাশি আমরা রাজ্য সরকারি কর্মচারীরা নিজের নিজের অফিসে আন্দোলন চালিয়ে যাব।’’
আরও পড়ুন:
কো-অর্ডিনেশন কমিটির নেতা বিশ্বজিৎ গুপ্ত চৌধুরী বলেন, ‘‘আমরা অনেক লড়াই করে দেশের সুপ্রিম কোর্ট থেকে অধিকার ছিনিয়ে এনেছিলাম। আবার আমাদের ন্যায্য অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। এমন প্রচেষ্টা হলে আমরা সেই অধিকার কেড়ে আনতে জানি। ১৩ মার্চ রাজ্য জুড়ে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি কর্মচারীরা প্রতিবাদ করে রাজ্য সরকারকে তাঁদের শক্তি বুঝিয়ে দেবে।’’
সংগ্রামী যৌথ মঞ্চের আহ্বায়ক ভাস্কর ঘোষ বলেন, ‘‘১৩ মার্চ আমরা বন্ধ মোবারক কর্মসূচির ডাক দিয়েছি। সেই কর্মসূচি দিয়ে এই সরকারকে আমরা বোঝাতে চাই আমাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া সহজ বিষয় নয়। সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টেও রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা দায়ের করেছি। এই জোড়া আক্রমণের মুখে পড়ে রাজ্য সরকারের কর্মচারীদের শক্তি টের পেয়ে যাবেন মুখ্যমন্ত্রী।’’