মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) মামলার রায় কার্যকর করার সময়সীমা বাড়ানোর আবেদন জানিয়ে নতুন করে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জমা দিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। শুক্রবার এই সংক্রান্ত আবেদন শীর্ষ আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। রাজ্য সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, ডিএ বকেয়া পরিশোধ সংক্রান্ত নির্দেশ বাস্তবায়নে একাধিক প্রশাসনিক, প্রযুক্তিগত এবং আর্থিক জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে। সেই কারণেই নির্ধারিত সময়সীমা বাড়ানোর আবেদন জানানো হচ্ছে। এ কথা জানার পরেই ১৩ মার্চ রাজ্য জুড়ে সরকারি অফিস অচল করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সরকারি কর্মচারী সংগঠনের নেতারা। যে কোনও ধর্মঘটের ক্ষেত্রে বরাবর কড়া অবস্থান নিয়ে এসেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু বিধানসভা নির্বাচনের আগে ডিএ ইস্যুতে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে তাঁর সরকার আদৌ সংঘাতে যাবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান রাজনৈতিক মহলের একাংশ।
রাজ্য সরকারের জমা দেওয়া আবেদনে বলা হয়েছে, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে সুপ্রিম কোর্ট ডিএ সংক্রান্ত মামলায় গুরুত্বপূর্ণ রায় দেয়। ওই রায়ে আদালত জানায়, রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের ডিএ পাওয়া আইনগত ভাবে প্রাপ্য অধিকার। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দেয়, ২০০৮ থেকে ২০১৯ সালের সময়কালের বকেয়া ডিএ কর্মচারীদের দিতে হবে। এই প্রক্রিয়া তদারকির জন্য অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ইন্দু মলহোত্রার নেতৃত্বে একটি মনিটরিং কমিটিও গঠন করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, মোট কত টাকা দিতে হবে এবং কী ভাবে কিস্তিতে তা পরিশোধ করা হবে, তার একটি সময়সূচি নির্ধারণ করার কথা ছিল ওই কমিটির। আদালত জানিয়েছিল, এই নির্ধারণের কাজ ৬ মার্চ ২০২৬-এর মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে এবং প্রথম কিস্তি ৩১ মার্চ ২০২৬-এর মধ্যে দিতে হবে।
তবে রাজ্য সরকারের দাবি, এত অল্প সময়ে এই বিশাল আর্থিক দায়বদ্ধতা পূরণ করা কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠেছে। কারণ, বকেয়া ডিএ নির্ধারণ করতে প্রায় ৩ লক্ষ ১৭ হাজারের বেশি কর্মরত কর্মচারীর তথ্য যাচাই করতে হচ্ছে। পাশাপাশি, বিপুল সংখ্যক অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীর তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করতে হচ্ছে। এই তথ্যের বড় অংশ ২০১৬ সালের আগে পর্যন্ত ডিজিটাল নয়, বরং সার্ভিস বুক আকারে হাতে লেখা নথিতে রয়েছে। ফলে সেগুলি ডিজিটাইজ় করে যাচাই করতে সময় লাগছে।
রাজ্য সরকার আরও জানিয়েছে, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের তথ্য কিছুটা হলেও ‘ইন্টিগ্রেটেড ফিনান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ (আইএফএমএস)-এ রয়েছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে হিসাব করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু ২০০৮ থেকে ২০১৫ সালের তথ্য সংগ্রহের জন্য আলাদা একটি অনলাইন পোর্টাল তৈরি করতে হচ্ছে, যেখানে কর্মচারীরা নিজেদের তথ্য আপলোড করবেন এবং তা যাচাই করা হবে। এই পোর্টাল চালু করতে প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি এবং নিরাপত্তা যাচাই প্রয়োজন।
রাজ্য সরকারের আবেদনে আর্থিক চাপের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারের দাবি, বকেয়া ডিএ পরিশোধের মোট পরিমাণ হাজার হাজার কোটি টাকায় পৌঁছোতে পারে। একই সঙ্গে রাজ্যের আর্থিক সীমাবদ্ধতা, ঋণ গ্রহণের নিয়ম, ‘ফিসকাল রেসপনসিবিলিটি অ্যান্ড বাজেট ম্যানেজমেন্ট’ (এফআরবিএম) আইনের সীমা এবং আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের ব্যয়ের মতো বিষয়গুলিও বিবেচনা করতে হচ্ছে। এছাড়াও প্রশাসনিক দিক থেকেও বড়সড় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে বলে জানানো হয়েছে। রাজ্যের প্রায় ৬,৫০০ ‘ড্রয়িং অ্যান্ড ডিসবার্সিং’ অফিসারের মাধ্যমে বিল প্রস্তুত করতে হবে। অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ট্রেজারি, অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেলের দফতর এবং ব্যাঙ্কের মাধ্যমে তথ্য সমন্বয় করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই সমস্ত কারণ দেখিয়ে রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টের কাছে অনুরোধ করেছে, বকেয়া ডিএ প্রদানের সময়সীমা বাড়ানো হোক। আবেদনে বলা হয়েছে, অন্তত ২৫ শতাংশ বকেয়া ডিএ এবং প্রথম কিস্তির অর্থ ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হোক। তবে রাজ্য সরকার জানিয়েছে, পরিস্থিতি অনুকূল হলে এর আগেই পরিশোধের চেষ্টা করা হবে।
অন্য দিকে, রাজ্য সরকার একই সঙ্গে এই রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ পিটিশন দাখিলের প্রস্তুতিও নিচ্ছে বলে আদালতে জানিয়েছে। তবে রিভিউ পিটিশনের ফলাফলের অপেক্ষা না-করেই রায় বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হচ্ছে বলেও রাজ্যের তরফে জানানো হয়েছে। এই আবেদনের প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট কী নির্দেশ দেয়, তার দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছেন রাজ্যের লক্ষাধিক সরকারি কর্মচারী ও অবসরপ্রাপ্তেরা। তবে কো-অর্ডিনেশন কমিটির নেতা বিশ্বজিৎ গুপ্ত চৌধুরী বলেন, “আমরা অনেক লড়াই করে দেশের সুপ্রিম কোর্ট থেকে অধিকার ছিনিয়ে এনেছিলাম। আবার আমাদের ন্যায্য অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। এমন প্রচেষ্টা হলে আমরা সেই অধিকার কেড়ে আনতে জানি। ১৩ মার্চ রাজ্য জুড়ে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি কর্মচারীরা প্রতিবাদ করে রাজ্য সরকারকে তাঁদের শক্তি বুঝিয়ে দেবেন।”
রাজ্যের বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের তরফে অভিযোগ করা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টে যে আবেদন রাজ্য সরকার করেছে তাতে রাজ্যের শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষা কর্মীদের কোনও উল্লেখ নেই। বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির তরফে স্বপন মণ্ডল বলেন, “রাজ্য সরকার রিভিউ পিটিশন করতে গিয়ে যে কথাগুলো উল্লেখ করেছে তাতে পরিষ্কার সাড়ে চার লক্ষ শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের বাদ দেওয়া হয়েছে। এটা নিকৃষ্টতম নোংরামি শুধু নয়, সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের আমলকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে চাইছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শাসকপন্থী মেরুদণ্ডহীন শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের আহ্বান জানাচ্ছি আগামী ১৩ মার্চ ধর্মঘট সফল করে উপযুক্ত জবাব দিন।”
একই সুরে সংগ্রামী যৌথ মঞ্চের আহ্বায়ক ভাস্কর ঘোষ বলেন, “১৩ মার্চ আমরা বন্ধ মোবারক কর্মসূচির ডাক দিয়েছি। সেই কর্মসূচি দিয়ে এই সরকারকে আমরা বোঝাতে চাই, আমাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া সহজ বিষয় নয়। ওই দিন রাজ্য সরকারের কর্মচারীদের শক্তি টের পেয়ে যাবেন মুখ্যমন্ত্রী।”