E-Paper

অনুমতি আর নিরাপত্তা ছাড়া কেন সমুদ্রে শুটিং

বালেশ্বরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গায়ত্রী প্রধান জানিয়েছেন, দুর্ঘটনাটি ঘটেছে রবিবার বিকেল সাড়ে ৫টা নাগাদ। শুটিং করতে গিয়ে সমুদ্রের মধ্যে গর্তে পড়ে যান রাহুল ও শ্বেতা।

কেশব মান্না, দীপান্বিতা মুখোপাধ্যায় ঘোষ

শেষ আপডেট: ৩১ মার্চ ২০২৬ ০৯:০০
বিজয়গড়ের বাড়িতে আনা হয় রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেহ। সোমবার (আরও খবর: কলকাতা)।

বিজয়গড়ের বাড়িতে আনা হয় রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেহ। সোমবার (আরও খবর: কলকাতা)। ছবি: সুদীপ্ত ভৌমিক।

২৪ ঘণ্টা পেরিয়েছে। চলছে পুলিশি তদন্ত। তবে অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় (৪৩) ঠিক কী ভাবে সমুদ্রে পড়ে গেলেন, কেন নিরাপত্তার ব্যবস্থা ছাড়া, সমুদ্রে শুটিং হচ্ছিল, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি সোমবারেও।

দিঘা থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে, তালসারিতে বাংলা ধারাবাহিকের শুটিংয়ে গিয়ে রবিবার বিকেলে মৃত্যু হয় রাহুলের। সমুদ্রে পড়েও প্রাণে বেঁচেছেন অভিনেত্রী শ্বেতা মিশ্র। শুটিং চলাকালীনই দুর্ঘটনা কি না, প্রশ্ন ছিল। তবে ধারাবাহিকের প্রযোজক লীনা গঙ্গোপাধ্যায় এ দিন বলেন, “শুটিং চলাকালীনই ঘটনা ঘটে। ক্যামেরা চালু ছিল। তবে বাকি সব শিল্পী চলে আসছিলেন। রাহুল আরও কয়েকটা শট নিতে চায়, তাই ও আর নায়িকা ওখানে ছিল।”

বালেশ্বরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গায়ত্রী প্রধান জানিয়েছেন, দুর্ঘটনাটি ঘটেছে রবিবার বিকেল সাড়ে ৫টা নাগাদ। শুটিং করতে গিয়ে সমুদ্রের মধ্যে গর্তে পড়ে যান রাহুল ও শ্বেতা। স্থানীয় যুবক ভগীরথ জানার দাবি, রাহুল ও শ্বেতাকে তিনিই জল থেকে তোলেন। ভগীরথ বলেন, “ড্রোন উড়ছিল। রাহুল ও শ্বেতা গভীর সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। বার বার নিষেধ করি। কিন্তু বাতাসের শব্দে কেউই শুনতে পাননি। কয়েক মিনিটের মধ্যে দেখি, দু’জনে তলিয়ে যাচ্ছেন। তখন নৌকা নিয়ে যাই।”

ভগীরথের দাবি, “দড়ি ছুড়ে প্রথমে শ্বেতাকে তুলি। তার পরে রাহুলদাকে টেনে তুলি। তখন তিনি বমি করছেন। পরে, তাঁকে বাকিরা হাসপাতালে নিয়ে যান।” তালসারি মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির কর্মকর্তা গৌতম গঙ্গাইয়ের অবশ্য দাবি, “ড্রোন ক্যামেরায় দেখতে পেয়ে শুটিংয়ের লোকজনই প্রথমে এগিয়ে যায়। কিন্তু জল প্রায় সাত ফুটের বেশি উঁচু ছিল। তখন মৎস্যজীবীরা গিয়ে দু’জনকে টেনে তোলে। তখনও অভিনেতা জীবিত।”

তবে শুটিংয়ে নিরাপত্তার কোনও বন্দোবস্ত ছিল না বলে জানিয়েছে ওড়িশা পুলিশ। বালেশ্বরের পুলিশ সুপার প্রত্যুষ দিবাকর বলেন, “তদন্তে জেনেছি, কেউই সেখানকার সমুদ্রের গভীরতা সম্পর্কে জানতেন না। তাই দুর্ঘটনা ঘটেছে। ওই এলাকায় বাণিজ্যিক শুটিংয়ের অনুমতি দেওয়া হয় না। এ ক্ষেত্রেও অনুমতি নেওয়া হয়নি।” পূর্ব মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার অংশুমান সাহা বলেন, “যখন শেষ রাহুলকে জলে দেখা গিয়েছে, সেই অবধি ফুটেজ পেয়েছি। নিরাপত্তার কী ব্যবস্থা ছিল, তদন্তে জানা যাবে।”

কার্যনির্বাহী প্রযোজক শান্তনু নন্দী বলেন, “ড্রোন-শটের জন্য রাহুল ও শ্বেতা ওখানে ছিল। ঢেউয়ের ধাক্কায় ওরা কিছুটা এগিয়ে যায়। প্রথমে শ্বেতা জলে পড়ে যায়, পরে রাহুল।” রাহুলের গাড়ির চালক বাবলু দাসের দাবি, “জোয়ারের স্রোত ছিল। শুটিং ইউনিটের ছ’-সাত জন জলে লাফায়। শ্বেতা উঠে এসেছিল। কিন্তু দাদাকে (রাহুল) উদ্ধার করতে অনেকটা দেরি হয়ে যায়।” যদিও শান্তনুর দাবি,

“ওদের জলে যাওয়া, পড়ে যাওয়া এবং উদ্ধার করা— পুরোটাই ৭-৮ মিনিটের মধ্যে হয়েছে।”

স্থানীয়েরা জানান, যেখানে ঘটনাটি ঘটেছে, ওই এলাকায় সমুদ্রতলে কোথাও গর্ত, কাদা বা চোরাবালি রয়েছে। হঠাৎ জল বাড়লে আগেথেকে বোঝাও যায় না। মৎস্যজীবী সমবায়ের কর্মকর্তা গৌতম বলেন, “ওখানে সমুদ্রে কোথায় বিপদ আমরাই বুঝি। কিন্তু আমাদের সহযোগিতা শুটিংয়ের লোকেরা নেননি। স্থানীয় গাইড থাকলে, হয়তো দুর্ঘটনা ঘটত না।”

এমন জায়গায় বিনা অনুমতিতে, নিরাপত্তা ছাড়া শুটিং হচ্ছিল কেন? কার্যনির্বাহী প্রযোজকের দাবি, “আউটডোর শুটিংয়ের সময় স্থানীয় কো-অর্ডিনেটরকে সব দায়িত্ব দেওয়া হয় শুটিং সংক্রান্ত অনুমতি করানোর। এ ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছিল। সেই কাগজপত্র পাওয়ার চেষ্টা করছি। কো-অর্ডিনেটর জানিয়েছে, সব অনুমতি নেওয়া ছিল। পুলিশ ওকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।” তবে লীনার বক্তব্য, “সবটা ঠিক জানি না, যেহেতু ওখানে ছিলাম না।”

দিঘা স্টেট জেনারেল হাসপাতাল থেকে রবিবার রাতেই রাহুলের দেহ তমলুক মেডিক্যালে পৌঁছয়। সোমবার সকালে ময়না তদন্ত শুরুর আগে পৌঁছন রাহুলের মামা ও মামিমা। তমলুক মেডিক্যাল সূত্রে খবর, ময়না তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ইন্দ্রনীল বর্মণ প্রাথমিক রিপোর্টে জানিয়েছেন, রাহুলের ফুসফুসে প্রচুর বালি ও জল মিলেছে। ফুসফুসের ওজন প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল। ফুসফুস ও শ্বাসনালিতে বালি-মিশ্রিত জল জমার জেরে ‘হার্ট অ্যাটাক’ হয়েছে। ডাক্তার জানান, যে পরিমাণ বালি ঢুকেছে শরীরে, তাতে প্রাথমিক ভাবে অনুমান, দীর্ঘ সময় জলের তলায় ছিলেন রাহুল। পরবর্তী পরীক্ষার জন্য মৃতদেহের ভিসেরা, হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। অভিনেতার গাড়ির চালকের আক্ষেপ, “দাদা সাঁতার জানতেন। হয়তো ঘাবড়ে গিয়ে সব গুলিয়ে গিয়েছিল।”

পূর্ব মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার বলেন, “ময়না তদন্তের রিপোর্টের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে। ওড়িশা পুলিশের সঙ্গে কথা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে।”

মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে রাজ্য মহিলা কমিশনের চেয়ারম্যান পদ থেকে লীনার ইস্তফা দাবি করেছে। প্রযোজনা সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট চ্যানেলের বিরুদ্ধে 'খুনে'র অভিযোগে এফআইআর দায়েরের দাবি তুলেছে অল ইন্ডিয়ান সিনে ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশন। রাহুলের পরিবারকে ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের দাবিও তুলেছে তারা।

এ দিন কলকাতার কেওড়াতলা শ্মশানে রাহুলের শেষকৃত্য হয়েছে।

(সহ-প্রতিবেদন: আনন্দ মণ্ডল)

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Rahul Arunoday Banerjee Talsari

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy