Advertisement
E-Paper

নতুন রূপের ইস্কো আশা জাগাচ্ছে শিল্পাঞ্চলে

খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে কারখানা। শুধু ঘুরে দাঁড়ানো নয়, আত্মপ্রকাশ করছে দেশের সর্বোচ্চ ইস্পাত উৎপাদক সংস্থা হিসেবেও। বার্নপুরে ইস্কো কারখানার এই পুনরুজ্জীবনকে সম্বল করে উজ্জ্বল দিনের স্বপ্ন দেখছে গোটা শিল্পাঞ্চল। ঠিক দু’দশক আগেও পরিস্থিতিটা ছিল পুরো উল্টো। ১৯৯৪ সালে ইস্কো যখন বিআইএফআরে চলে যায়, শিল্পাঞ্চলে তৈরি হয়েছিল আশঙ্কার কালো মেঘ।

সুশান্ত বণিক

শেষ আপডেট: ০৭ মে ২০১৫ ০৪:৩৫
আধুনিকীকরণের পরে তৈরি ইস্কোর ব্লাস্ট ফার্নেস।

আধুনিকীকরণের পরে তৈরি ইস্কোর ব্লাস্ট ফার্নেস।

খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে কারখানা। শুধু ঘুরে দাঁড়ানো নয়, আত্মপ্রকাশ করছে দেশের সর্বোচ্চ ইস্পাত উৎপাদক সংস্থা হিসেবেও। বার্নপুরে ইস্কো কারখানার এই পুনরুজ্জীবনকে সম্বল করে উজ্জ্বল দিনের স্বপ্ন দেখছে গোটা শিল্পাঞ্চল।

ঠিক দু’দশক আগেও পরিস্থিতিটা ছিল পুরো উল্টো। ১৯৯৪ সালে ইস্কো যখন বিআইএফআরে চলে যায়, শিল্পাঞ্চলে তৈরি হয়েছিল আশঙ্কার কালো মেঘ। কিন্তু বছর আটেক পরেই পুনরুজ্জীবনের সম্মতি মেলে। তার বছর চারেক পরে আধুনিকীকরণ প্রকল্পের উদ্বোধন করে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ। জমি অধিগ্রহণ থেকে যন্ত্রাংশ স্থাপন— গত আট বছর ধরে চলেছে বড়সড় কর্মযজ্ঞ। বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। ইস্কো কর্তৃপক্ষের দাবি, এটি একটি গ্রিনফিল্ড প্রকল্প। কারণ, এখানে আধুনিক যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে, এলাকা দূষণমুক্ত থাকবে। ১০ মে, রবিবার এই প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেই অনুষ্ঠানের জন্য এখন সাজো-সাজো রব আসানসোল শিল্পাঞ্চলে।

অতীতে বহু বার তো বটেই, আধুনিকীকরণ প্রকল্প ঘোষণার পরেও বারবার ধাক্কা খেয়েছে ইস্কো (ইন্ডিয়ান আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানি লিমিটেড)। কারখানার রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ও অ্যাকুইন মার্টিন ১৯১৮ সালে সংস্থার জন্ম দেন। পরবর্তী কালে চেয়ারম্যান হন রাজেন্দ্রনাথবাবুর ছেলে বীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। ইস্কোর জন্মের আরও অন্তত ৪৮ বছর আগে ১৮৭০ সালে তাঁরা কুলটিতে ‘বেঙ্গল আয়রন ওয়ার্কস’ নামে একটি ইস্পাত কারখানা তৈরি হয়েছিল। ১৮৮০ সালে এই কারখানাকে কিছুটা আধুনিক বানিয়ে নাম পাল্টে রাখা হয় ‘বরাকর আয়রন ওয়ার্কস’। ১৮৯০ সালে এই কারখানায় একটি লোহা গলানোর চুল্লি বসানো হয়। তখন নামকরণ করা হয় ‘বেঙ্গল আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানি’। ১৯৩৬ সালে এই কারখানা ইস্কোর সঙ্গে যুক্ত করা হয়। ইতিমধ্যে ১৯৩৯ সালে বার্নপুরে আরও একটি সংস্থা ‘স্টিল কর্পোরেশন অব বেঙ্গল’ ইস্পাত উৎপাদন শুরু করে। এই কারখানাটিও ১৯৫৩ সালে ইস্কোর সঙ্গে যুক্ত হয়।


পোলো মাঠে প্রধানমন্ত্রীর সভাস্থল পরিদর্শনে কেন্দ্রীয় ইস্পাত সচিব রাকেশকুমার সিংহ।

বেশ কয়েক বছর চলার পরে ইস্কোর আর্থিক অবস্থা ক্রমে খারাপ হতে শুরু করে। ১৯৭২ সালের ১৪ জুলাই তা রাষ্ট্রায়ত্তকরণ হয়। ১৯৭৮ সালে ইস্কোকে নিজেদের সাবসিডিয়ারি সংস্থার মর্যাদা দেয় সেল। তবে তার পরেও হাল ফেরেনি ইস্কোর। ১৯৯৪ সালে ইস্কোকে রুগ্ণ ঘোষণা করে বিআইএফআরে পাঠানো হয়। কারখানার পুনরুজ্জীবন চেয়ে শুরু হয় শ্রমিক আন্দোলন। কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগঠনগুলি এবং অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন মিলে ‘ইস্কো বাঁচাও কমিটি’ তৈরি করে। শেষমেশ ২০০২ সালে বিআইএফআর ইস্কো পুনরুজ্জীবনের সম্মতি দেয়। তবে শর্ত দেওয়া হয়, সংস্থার চার হাজার কর্মীকে স্বেচ্ছাবসর দিতে হবে। সেই শর্ত মেনে প্রথমেই কুলটি কারখানার প্রায় তিন হাজার চল্লিশোর্ধ্ব শ্রমিক-কর্মীকে স্বেচ্ছাবসর দেওয়া হয়। আরও ১৬১ জন শ্রমিক-কর্মীকে অন্যত্র বদলি করে ২০০৩ সালের ৩১ মার্চ সেই কারখানার ঝাঁপ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২০০৮ সালে অবশ্য কুলটি কারখানাকে সেল বিকাশ সংস্থার অধীনে এনে খোলা হয়। এখন সেখানে ঠিকাদার ব্যবস্থায় সামান্য উৎপাদন হচ্ছে।

রাষ্ট্রায়ত্তকরণের পরে ইস্কোয় ২০০৪ সালে প্রথম বার প্রায় ২৭ কোটি টাকা লাভ হয়। সংস্থা লাভজনক হওয়ার পরেই সেল কর্তৃপক্ষ ইস্পাত মন্ত্রকের কাছে ইস্কোকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব দেন। মন্ত্রক তা অনুমোদন করে ২০০৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি। সে দিনই ঠিক হয়, কেন্দ্রীয় সরকার ইস্কোর আধুনিকীকরণ প্রকল্প শুরু করবে। ২০০৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর প্রকল্পের শিলান্যাস করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ। প্রকল্প রূপায়ণের জন্য খরচ ধরা হয়েছিল ১৪ হাজার কোটি টাকা। হিরাপুর থানার নাকরাসোতা, কুইলাপুর ও শ্যামডিহি মৌজা থেকে ৯৬৫ একর জমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ হয়। ইস্কো কর্তৃপক্ষ জমির দাম বাবদ গ্রামবাসীদের প্রায় ৫০ কোটি মেটান। এই অধিগ্রহণ পর্ব ঘিরেও অশান্তি হয়েছে। নানা দাবিদাওয়ায় বাধা দেওয়া হয়েছে কাজে। তবে বছরখানেকের চেষ্টায় সে সব মিটিয়ে ফেলা হয়।

আধুনিকীকরণের জন্য নানা দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে বরাত দেওয়া হয়। ইস্কো সূত্রে জানা গিয়েছে, নতুন প্রকল্পটির অন্যতম বৈশিষ্ট হল, বার্ষিক আড়াই লক্ষ টন তপ্ত লোহা উৎপাদনকারী ‘ট্যুইন হার্থ ব্লাস্ট ফার্ণেস’ (লোহা গলানোর চুল্লি)। তাতে তৈরি হবে ৪৬০০ ঘন মিটারের লোহার পাত। এ ছাড়া রয়েছে সাত মিটার লম্বা কোকওভেন ব্যাটারি প্ল্যান্ট। ২০৪ বর্গ মিটারের দু’টি সিন্টার যন্ত্র। ১৫০ টন ওজনের তিনটি কনভার্টার। দু’টি বিলেট কাস্টার্স। কারখানা সূত্রে জানা গিয়েছে, এই বিভাগগুলি ইতিমধ্যে উৎপাদন শুরু করেছে। গত ৩০ নভেম্বর লোহা গলানোর চুল্লিটি চালু করা হয়। তার পর থেকে সফল ভাবে উৎপাদন শুরু করেছে সেটি। এর পরেই দেশের পঞ্চম সুসংহত ও আধুনিক ইস্পাত উৎপাদক সংস্থা রূপে আত্মপ্রকাশ করছে ইস্কো কারখানা। আর তার হাত ধরে পাল্টাচ্ছে এলাকার শিল্প-বাণিজ্যের চিত্রও।

ছবি: শৈলেন সরকার।

sushanta banik iisco renovated iisco regenerated iisco industrial zone iisco
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy