অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগেই বৃহস্পতিবার থেকে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর বিধানসভা কেন্দ্র নন্দীগ্রামে শুরু হচ্ছে স্বাস্থ্য পরিষেবা শিবির ‘সেবাশ্রয়’। সূচনার দিনই অভিষেক নন্দীগ্রামের দু’টি ব্লকেই ‘সেবাশ্রয়’-এর মডেল ক্যাম্পে যাবেন। কিন্তু আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন তিনি করবেন না। উদ্বোধনের ব্যাপারে ভিন্ন পরিকল্পনা নিয়েছে শাসকদল। যা আসলে রাজনৈতিক কৌশল।
তৃণমূল সূত্রের খবর, নন্দীগ্রাম আন্দোলনে ‘শহিদ’দের পরিবারের সদস্যদের দিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে ‘সেবাশ্রয়’ শিবিরের উদ্বোধন করানো হবে। তৃণমূল তথা ‘টিম অভিষেক’ যে সূচি তৈরি করেছে, তাতে দু’টি ব্লকেই সকাল ৯টার সময়ে উদ্বোধন হবে ‘সেবাশ্রয়’ শিবিরের। অভিষেকের পৌঁছবেন দুপুরে।
গত ৫ জানুয়ারি থেকে নন্দীগ্রামের দু’টি ব্লকে দুই দূতকে পাঠিয়ে দিয়েছেন অভিষেক। ১ নম্বর ব্লকের দায়িত্বে রয়েছেন দলের মুখপাত্র ঋজু দত্ত এবং ২ নম্বর ব্লকের সেবাশ্রয়ের তদারকির দায়িত্বে কলকাতার ১০৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সুশান্ত ঘোষ। কেন শহিদ পরিবারের সদস্যদের দিয়ে উদ্বোধন? সুশান্তের বক্তব্য, ‘‘অন্য দল মৃতদেহের উপর রাজনীতি করে আর তৃণমূলই একমাত্র শহিদদের মর্যাদা দিতে জানে। সেই কারণেই তাঁরা উদ্বোধন করবেন।’’
এ তো সুশান্তের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য? মূল কারণ কী? নন্দীগ্রামের রাজনীতির বিষয়ে ওয়াকিবহালেরা জানেন, এখনও বেশ কিছু শহিদ পরিবারের উপর শুভেন্দুর প্রভাব অটুট। উদ্বোধনে তাঁদের ‘মর্যাদা’ দিয়ে নন্দীগ্রামের রাজনীতিতে ভিন্ন ধারণা এবং ভাষ্য তৈরি করতে চাইছে তৃণমূল। শুভেন্দু যত দিন তৃণমূলে ছিলেন, তত দিন তিনিই এই পরিবারগুলির সঙ্গে নিত্য যোগাযোগ রাখতেন। তিনি বিজেপি-তে যাওয়ার পরে নন্দীগ্রামে বলিষ্ঠ নেতা খুঁজে পেতে কালঘাম ছোটাতে হয়েছে শাসকদলকে। এখনও যে তেমন নেতা তৃণমূল পেয়ে গিয়েছে তা নয়। সেই সঙ্গে জুড়ে রয়েছে স্থানীয় সংগঠনে গোষ্ঠীকোন্দলও। যে কারণে ব্লক কমিটিতে কাউকে সভাপতি না-করে কোর কমিটি গড়ে দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক। সেই আবহে শহিদ পরিবারের লোককে দিয়ে সেবাশ্রয় শিবিরের উদ্বোধন করিয়ে একটি ‘বার্তা’ও দিতে চাইছে তৃণমূল।
মমতার রাজনৈতিক উত্থানের অন্যতম ‘ভিত’ নন্দীগ্রাম। আবার সেই নন্দীগ্রামেই ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে শুভেন্দুর কাছে হারতে হয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে। যে কারণে নন্দীগ্রাম এখন তৃণমূলের কাছে ‘ক্ষত’। ভোটের তিন মাস আগে সেই ক্ষতেই তৃণমূল প্রলেপ দিতে চাইছে বলে অভিমত অনেকের। বিভিন্ন পর্বে নন্দীগ্রামের দু’টি ব্লক মিলিয়ে জমি আন্দোলনে ‘শহিদ’ হয়েছিলেন ১৯ জন। তৃণমূল সূত্রে জানা গিয়েছে, এই ১৯টি পরিবারের সদস্যদের ভাগ করে দু’টি ব্লকের ‘সেবাশ্রয়’ শিবিরে হাজির করানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। তাঁদের হাত দিয়েই শিবিরের উদ্বোধন করানো হবে।
কয়েক মাস আগেই ‘এক ডাকে অভিষেক’-এর ফোন নম্বরে নন্দীগ্রামে ‘সেবাশ্রয়’ চালুর বিষয়ে অনুরোধের ফোন পেয়েছিল ক্যামাক স্ট্রিটে অভিষেকের দফতর। আগামী ১৫ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার থেকে নন্দীগ্রামে যে সেই কর্মসূচি শুরু হতে চলেছে, ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে তা প্রথম লেখা হয়েছিল আনন্দবাজার ডট কম-এ। সে দিনই বিকালে তৃণমূল ভবনের সাংবাদিক বৈঠকে অভিষেক আনুষ্ঠানিক ভাবে জানান, নন্দীগ্রামের কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। তিনিই ১৫ জানুয়ারি নন্দীগ্রামে পৌঁছে সেই শিবিরের উদ্বোধন করবেন। কিন্তু শেষবেলায় কৌশল পাল্টে গিয়েছে। শিবিরের উদ্বোধন করছেন না অভিষেক। বরং সামনে এগিয়ে দিচ্ছেন শহিদ পরিবারের লোকজনকে। উদ্বোধনে কৌশল পাল্টে সেবাশ্রয় শিবির শুরুর আগেই চমক দিতে চাইছে শাসকদল।