Advertisement
E-Paper

ফেসবুক কাণ্ডের পর সকাল বদলে গেল রোহিত পাশির

তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তৃণমূল নেতা কাউন্সিলরকে নাম না করে সমাজের লজ্জা বলা, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উদ্দেশ্য প্রণোদিত ফেসবুকে মন্তব্য করা। বিরোধীদলের সঙ্গে সামিল হয়ে কুৎসা ছড়াবার অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০৩:৫৬

তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তৃণমূল নেতা কাউন্সিলরকে নাম না করে সমাজের লজ্জা বলা, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উদ্দেশ্য প্রণোদিত ফেসবুকে মন্তব্য করা। বিরোধীদলের সঙ্গে সামিল হয়ে কুৎসা ছড়াবার অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে। তিনি মালবাজার শহরের যুবক রোহিত পাশি। পেশায় বেসরকারি রিসর্টের সহকারি ম্যানেজার রোহিতের বাড়ি মালবাজার শহরের ১১ নম্বর ওয়ার্ডের বাজার রোডে। স্ত্রী রাখি রায় পাশি, বছর সাতেকের ছেলে ঋষভ পাশিকে নিয়ে ছোট্ট সংসার রোহিতের। ফেসবুক কাণ্ডে তৃণমূল কাউন্সিলারের অভিযোগে শুক্রবার মালবাজার থানায় আটক করা হয় রোহিতকে। এক রাত থানায় কাটিয়ে বদলে যায় রোহিতের জীবন। শনিবার থানা থেকে বাড়িতে ফিরে শান্তিতে ঘুমও হয়নি।

জীবন যে বদলে গিয়েছে, তা আন্দাজ করতে পারলেও রবিবার ঘুম ভেঙে রোহিত তা স্পষ্ট অনুভব করল। আর দশটা রবিবার ছুটির আলসেমিতে ঘুম থেকে উঠতেই দেরি হয়ে যেত, আর এদিন ঘুম ভেঙেছে খুব ভোরে। রোহিতের কথায় বন্ধু মুন বড়ুয়া ভোরেই সব খবরের কাগজ কিনে নিয়ে বাড়িতে চলে আসে। পাড়ার অপু দাস পড়শি গৃহবধূ ঋতা দাস, রিংকু দাসেরা খবরের কাগজ দেখতে রোহিতের বাড়িতে ভিড় জমান। রবিবার মালবাজারে সাপ্তাহিক হাট বসে, রোহিতের বাড়ির খুব কাছেই সেই হাট। ঘুম থেকে উঠে চা খেয়ে বাজারের ব্যাগ নিয়ে হাটে যাওয়াটাই প্রতি রবিবারের অভ্যাস রোহিতের। কিন্তু স্থানীয় সিপিএম, কংগ্রেস নেতারা আটটা থেকেই রোহিতের বাড়িতে হাজির হতে থাকেন। এরপর রোহিতের আত্মীয় ভাই বন্ধু সকলেই সাড়ে আটটার মধ্যে বাড়িতে উপস্থিত।

রোহিতের স্ত্রী রাখি রায় পাশি সকালে দ্বিতীয় শ্রেণির পড়ুয়া ছেলে ঋষভকে নিয়ে পড়তে বসান, এ দিন হট্টমেলার চাপে মুলতুবি হয়ে যায় সেটিও। শুক্রবার থেকেই রোহিত ঘর ছাড়া, তাই ঘরের সব্জি, বাজার সবই বাড়ন্ত। এই অবস্থায় সকালের জলখাবারটা ভুলেই যান পাশি দম্পতি। অম্বিকেশ মহাপাত্রের মোবাইল নম্বর নিয়ে ফোনে কথা বলা, সিপিএমের জেলা প্রতিনিধি দলের বাড়িতে আসার খবর। ঘনঘন দূর দুরান্তের আত্মীয় স্বজনের ফোন সব কিছুর মাঝে প্রতি রবিবারের সকালের সাধের লুচি, ছোলার ডালটাই উধাও হয়ে যায়।

রোহিতের শ্বশুর চালসার বাসিন্দা নিশিকান্ত রায় এবং শাশুড়ি মণিকা রায় এরপর বেলা দশটায় ব্যাগ ভর্তি বাজার করে নিয়ে আসেন মেয়ে জামাই এর জন্যে। কিন্তু ততক্ষণে বসার ঘরে এঁটে না উঠতে পেরে জনতার দখলে চলে গিয়েছে বাড়ির রান্নাঘরও। দুপুর বারোটায় বাড়িতে চলে আসেন প্রায় ২০ সদস্যের জেলা সিপিএমের প্রতিনিধি দল। তাঁদের চা দেওয়ার দায়িত্বে পাড়ার মহিলারাই জুটে যান। এরই ফাঁকে রোহিতের শাশুড়ি মণিকাদেবী ভাত আর মাছের ঝোল ওভেনে চাপিয়ে দেন। খবর মেলে বামেরা গেলেই কংগ্রেসের দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি জেলার নেতারা আসছেন। কোনক্রমে এরই মধ্যে মেয়ে জামাই আর নাতিকে দু’মুঠো ভাত খাইয়ে দেন মণিকাদেবী। এরপর তিনটায় ফের ১৫ জনের কংগ্রেস প্রতিনিধি দল বাড়িতে চলে আসে। সাংবাদিকদের ভিড় তো রয়েইছে। বিকালে আবার রোহিতকে শিলিগুড়ির এক খবরের চ্যানেলের স্টুডিওতে যাবার জন্যে ফোন আসতে শুরু করে। রোহিতের স্ত্রী রাখিদেবী এ সব দেখেশুনে কার্যত হতভম্ব। রাখির কথায় রবিবার সকালে লুচি, ছোলার ডাল, দুপুরে ফল, তার পর মাংস ভাত সপ্তাহে এই একটা দিন এ সবই হত বাড়িতে। আর আজ এ যেন অন্য রবিবার। খিদেটাও তো পাচ্ছে না তবুও মা একফাঁকে ভাত, কাতল মাছের ঝোল না করলে সেটাও জুটত না। রোহিতের কথায় ঘুম ভেঙেছে খবরের কাগজে নিজের ছবি আর ফেসবুক পোস্ট দেখে। বেলা যত বেড়েছে ততই মানুষের ভিড়ও বেড়েছে বাড়িতে। আমাকে নিয়ে মাতামাতিও চলছে কিন্তু কীই বা করেছি আমি। একটা সামান্য ফেসবুক পোস্ট আর তাতেই বদলে গেল জীবন।

রবিবার দুপুর বারোটায় রোহিতের বাড়িতে প্রথমে জলপাইগুড়ি জেলা সিপিএমের দলটি আসে। নেতৃত্বে জেলা পরিষদ সভাধিপতি নূরজাহান বেগম, জলপাইগুড়ি চা মজদুর ইউনিয়নের জেলা সম্পাদক চানু দে, মালবাজারের পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি কৌশল্যা রায়, মালবাজারের জোনাল সিপিএম সম্পাদক মিন্টু রায়, মালবাজার পুরসভার বিরোধী দলনেতা সুপ্রতিম সরকার প্রমুখ। রোহিতের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে প্রতিনিধি দলটি মালবাজার থানায় গিয়ে মালবাজারের এসডিপিও নিমা নরবু ভুটিয়ার সঙ্গে কথা বলেন।

নূরজাহান বেগম, চানু দে বলেন, ‘‘পুলিশ যেখানে গুরদীপ সিংহ খুনের মামলার দুই অভিযুক্তকে ধরতে পারেনি সেখানে অতিসক্রিয় হয়ে রোহিতকে আটক করল কেন সেটাই তো সব থেকে বড় প্রশ্ন।’’ তাঁদের কথায়, শাসকদলের বিরুদ্ধে কিছু বলা মানেই তার বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা দেখানোটাই এখন রাজ্যের সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বামদলটি গভীর রাতে রোহিতের বাড়িতে হামলা হতে পারে বলে আশঙ্কা করে রাতে রোহিতের বাড়ির সামনে পুলিশি নজরদারি দাবি করেন। এদিন বিকালে দার্জিলিঙ জেলা কংগ্রেস সভাপতি শংকর মালাকার , জলপাইগুড়ি জেলা কংগ্রেস সভাপতি নির্মল ঘোষদস্তিদার, নাগরাকাটার কংগ্রেস বিধায়ক জোশেফ মুন্ডারা রোহিতের বাড়ি গিয়ে আইনগত সাহায্য দেবার আশ্বাস দেন। মৃত গুরদীপের স্ত্রী ফ্লোরা রোজি সিংহের সঙ্গেও রোহিতের বাড়িতে বসেই খুনের মামলায় পাশের থাকার আশ্বাস দেন তারা। এরপর মালবাজার থানায় গিয়ে এসডিপিও নিমা নরবু ভুটিয়ার কাছে ক্ষোভ উগড়ে দেন শংকর বাবুরা। পুলিন গোলদারের দ্রুত গ্রেফতারও দাবি করেন তারা।

শংকরবাবু এসডিপিওকে বলেন, ‘‘এতটা নীচে নেমে গেলেন আপনারা যে কাউন্সলিরের নির্দেশে রোহিতকে আটক করলেন। সাফাই দিতে গিয়ে এসডিপিও ‘রোহিতকে আটক নয় উদ্ধার করা হয়েছে’ বলতে চাইলে শংকরবাবু বলেন, ‘‘আমাদের মনে হচ্ছে রোহিতের ওপর হামলা হতে পারে তাই ওর কিছু হলে পুলিশ তার জন্যে দায়ী থাকবে’’— বলে থানা থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি।

তবে তৃণমূলের তরফ থেকে পুরো ঘটনা নিয়ে বিরোধীদের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে বিধানসভা নির্বাচনের আগে জলপাইগুড়ি জেলায় বিশৃঙ্খলার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তৃণমূল জেলা সভাপতি সৌরভ চক্রবর্তীর কথায় যা হয়েছে তা পুরোটাই প্রশাসনিক বিষয় , পুলিন বাবু একজন জনপ্রতিনিধি হিসাবে অভিযোগ করেছেন নিজেকে তৃণমূল নেতা বলেও কোথাও তিনি দাবি করেন নি। এখন সিপিএম , কংগ্রেস , অশোক গঙ্গোপাধ্যায় , অম্বিকেশ মহাপাত্ররা যা করছেন তা পুরোটাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিই ওদের লক্ষ্য। পুলিন বাবু ওনার মানহানি হয়েছে বলে উনি মনে করেছেন উনি মামলা করবেন এটার সঙ্গে তো দলের কোন বিষয়ই নেই তা সত্ত্বেও বিরোধীরা কুতসা অপপ্রচার করছে। ওনাদের লক্ষ্য পূরণ কখনই হবে না। তবে সৌরভের অভিযোগের বিরুদ্ধে পাল্টা তোপ দেগেছেন কংগ্রেস নেতা শংকর মালাকার।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy