Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৪ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

নির্দেশিকা দিল কেন্দ্র

বিস্ফোরণ তদন্তে শিক্ষা সহবতের

সুরবেক বিশ্বাস
কলকাতা ০৮ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৩:৩৮

চলো নিয়ম মতে, নিয়ম মেনে। বিশেষত ক্ষেত্রটা যদি হয় সন্ত্রাস-চক্রান্তের তদন্ত। সরাসরি না-হলেও কেন্দ্র বুঝি ঠারেঠোরে এমন বার্তাই দিতে চাইল পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে।

প্রেক্ষাপট সেই ২ অক্টোবরের খাগড়াগড়-বিস্ফোরণ। যার অব্যবহিত পরে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ) অভিযোগ তুলেছিল, রাজ্য পুলিশ যথাযথ পদক্ষেপ করেনি। আর তার দু’মাসের মধ্যে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সব রাজ্যকে রীতিমতো নির্দেশিকা দিয়ে সতর্ক করে দিয়েছে, কোনও বিস্ফোরণের পরে কী কী করতে হবে, এবং কী কী করা যাবে না। নির্দেশিকায় খাগড়াগড়ের উল্লেখ না-থাকলেও ওই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই যে মন্ত্রকের এ হেন ফরমান, রাজ্য স্বরাষ্ট্র দফতর ও কেন্দ্রীয় আইবি’র বেশ কিছু কর্তাব্যক্তি তা স্বীকার করে নিচ্ছেন।

কোথাও বিস্ফোরণ হলে তদন্ত কী ভাবে এগোনো উচিত, সে সম্পর্কে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সম্প্রতি একগুচ্ছ নির্দেশাবলি পাঠিয়েছে প্রতিটি রাজ্যকে। তার মধ্যে তিনটি নির্দেশ বিশেষ ভাবে নজর কেড়েছে। প্রথমটি হল, কোনও বিস্ফোরণের পরে এনআইএ-গোয়েন্দাদের বিনা বাধায় ঘটনাস্থলে ঢুকতে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজ্য ও কেন্দ্রের তদন্ত সংস্থাগুলো ঘনিষ্ঠ সমন্বয় বজায় রেখে কাজ করবে। তৃতীয়ত, কোনও তদন্তকারী দল ঘটনাস্থল থেকে কোনও প্রমাণ তুলে নিয়ে যেতে পারবে না। যাবতীয় প্রমাণ কেন্দ্রীয় ভাবে এক জায়গায় রেখে দিতে হবে, যাতে তদন্তকারী বিভিন্ন এজেন্সি প্রয়োজনে তার ছবি তুলে রাখতে পারে।

Advertisement

ঘটনা হল, খাগড়াগড় বিস্ফোরণের পরে পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ ও গোয়েন্দারা ঠিক এর উল্টো পথেই হেঁটেছিলেন বলে অভিযোগ তুলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে রিপোর্ট দিয়েছে এনআইএ। রিপোর্টের বক্তব্য: বিস্ফোরণের পর দিন, অর্থাৎ ৩ অক্টোবর এনআইএ-র দুই অফিসার খাগড়াগড়ে গেলে তাঁদের ঘটনাস্থলে ঢুকতে দেওয়া তো দূর, তাঁদের উদ্দেশে অপমানসূচক মন্তব্য করা হয়। রিপোর্টের দাবি: এনআইএ-দলের সামনেই এক প্রবীণ সিআইডি-অফিসার অধস্তনদের বলেন, ‘তালা লাগিয়ে দে। বাইরের আজেবাজে লোক যেন ঢুকতে না পারে।’



অপমানিত হয়ে এনআইএ-র দুই অফিসার ফিরে যান। আরও অভিযোগ, গোড়ায় তদন্তের ক্ষেত্রে ন্যূনতম সহযোগিতাও রাজ্যের তরফে মেলেনি। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের বক্তব্য: খাগড়াগড়ের বিস্ফোরণস্থলে উদ্ধার হওয়া নথিপত্র দেখে প্রথমেই আঁচ মিলেছিল যে, এর পিছনে কোনও জেহাদি জঙ্গি গোষ্ঠী বা মডিউলের হাত রয়েছে। বস্তুত এনআইএ-র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যই হল জঙ্গি কার্যকলাপ বা সন্ত্রাসবাদ সংক্রান্ত ঘটনার সঠিক তদন্ত নিশ্চিত করা। অথচ এনআইএ-র কাছে কোনও সহযোগিতা রাজ্য পুলিশ প্রথমে তো চায়ইনি, উল্টে ব্যাপারটা তেমন বড় কিছু নয় বলে ধামাচাপা দিতে তৎপর হয়ে ওঠে। উপরন্তু রিপোর্টের আক্ষেপ, উপযাজক হয়ে যাওয়া এনআইএ-অফিসারেরা রাজ্য পুলিশের একাধিক কর্তার কাছে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের অনুমতি বারবার চেয়েও পাননি।

এখানেই শেষ নয়। বিস্ফোরণের প্রমাণ রক্ষার ক্ষেত্রেও রাজ্য পুলিশের ‘চরম গাফিলতির’ দিকে আঙুল তুলেছে এনআইএ। জানিয়েছে, খাগড়াগড়ের বিস্ফোরণস্থলে উদ্ধার ৫৫টি দেশি গ্রেনেড সিআইডি দু’দিন পরেই (৪ অক্টোবর) দামোদরের চরে নিয়ে গিয়ে ফাটিয়ে দেয়। এনআইএ মনে করছে, অত তাড়াহুড়োর দরকার ছিল না। কারণ, ওই গ্রেনেড থেকে বিপদের আশঙ্কা ছিল না। বরং সেগুলো চাক্ষুষ করতে পারলে এনএসজি-এনআইএ’র বিশেষজ্ঞেরা হয়তো বুঝতে পারতেন, কী কী উপকরণ কতটা মিশিয়ে কোন প্রযুক্তিতে তা তৈরি করা হয়েছে, এবং ওই জাতীয় আইইডি (ইম্প্রোভাইজ্ড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) বানাতে কোন কোন জঙ্গি সংগঠন সিদ্ধহস্ত। এতে তদন্তের অভিমুখ তীক্ষ্ন হতো।

জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এমন গুরুত্বপূর্ণ তদন্ত-পর্বের শুরুতেই রাজ্য পুলিশের এ হেন ‘অপেশাদার’ আচরণে এনআইএ যারপরনাই অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সাম্প্রতিক নির্দেশিকায় যার প্রতিফলন দেখছেন কেন্দ্রীয় ও রাজ্য গোয়েন্দামহলের একাংশ। যদিও রাজ্যের স্বরাষ্ট্র-সচিব বাসুদেব বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, খাগড়াগড়-কাণ্ডে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ-প্রশাসনের কাছ থেকে সহযোগিতা পাওয়ার কথা এনআইএ প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে। “ওই প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে পরিষ্কার, রাজ্যের তরফে সহযোগিতা বা সমন্বয়ের কোনও অভাব নেই।” মন্তব্য তাঁর। প্রসঙ্গত, বাসুদেববাবু আগে বলেছিলেন, স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর (এসওপি) মেনেই উদ্ধার গ্রেনেডগুলো ফাটিয়ে নষ্ট করে ফেলা হয় দামোদরের চরে।

তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সাম্প্রতিক নির্দেশিকার পরিপ্রেক্ষিতে একটা কথা স্বরাষ্ট্র-সচিবও স্বীকার করেছেন। তা হল, বিস্ফোরণের পর দিন এনআইএ-র দলকে রাজ্য পুলিশ সত্যিই খাগড়াগড়ের বিস্ফোরণস্থলে ঢুকতে বাধা দিয়েছিল। বাসুদেববাবুর কথায়, “সে দিন এনআইএ-র কয়েক জন জুনিয়র অফিসার খাগড়াগড়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের বিস্ফোরণস্থলে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কারণ, সে রকম সরকারি নির্দেশ ছিল না।”

কেন ছিল না?

সচিবের যুক্তি, এক সঙ্গে অনেকগুলো তদন্তকারী সংস্থা ঘটনাস্থলে গেলে সব কিছু ঘেঁটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। “তদন্তের দায়িত্ব মূলত একটি সংস্থার হাতেই থাকা উচিত। ভুল কিছু হলে যাতে তাদের উপরেই দায় বর্তায়।” বলছেন তিনি। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশিকায় তো বলা হয়েছে, বিস্ফোরণের পরে এনআইএ, এনএসজি, কেন্দ্রীয় আইবি’র বিশেষজ্ঞদের বিস্ফোরণস্থলে ঢুকতে দিতে হবে, যাতে তাঁরা সূত্র খুঁজতে পারেন?

সচিবের জবাব, “কেন্দ্র যখন নির্দেশ দিয়েছে, তখন আমরা অবশ্যই মেনে চলব।” পাশাপাশি তাঁর বক্তব্য, “সমালোচনার যদি কিছু থাকে, সেটা হল মামলায় গোড়াতেই ইউএপিএ (বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন) প্রয়োগ না-করা। দুর্গাপুজো চলছিল বলেই হয়তো খেয়াল করা হয়নি, কিংবা দ্বিধা ছিল। ওটা ভুল হয়েছে।” এ ছাড়া অন্য কোনও সমস্যা রাজ্যের তরফে হয়নি বলে স্বরাষ্ট্র-সচিবের দাবি। রাজ্য সরকারি কর্তাদের কেউ কেউ এ প্রশ্নও তুলেছেন, খাগড়াগড়-তদন্ত ঘিরে বিতর্কের জেরেই যে মন্ত্রকের নির্দেশিকা, সেটা নিশ্চিত হয়ে বলা যাচ্ছে কী ভাবে?

শুনে কেন্দ্রীয় আইবি-র এক অফিসারের ব্যাখ্যা: গত মে মাসে চেন্নাই সেন্ট্রাল রেল স্টেশনে বেঙ্গালুরু-গুয়াহাটি এক্সপ্রেসে জোড়া বিস্ফোরণের পরে এনআইএ ঘটনাস্থলে যায়। অভিযোগ ওঠে, তামিলনাড়ু পুলিশ তাদের সাহায্য নিতে চায়নি। তখন কিন্তু এমন কোনও নির্দেশিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক পাঠায়নি। পাঠানো হল খাগড়াগড়-কাণ্ডের রেশ থাকতেই। “দুই আর দুইয়ে চার করে নেওয়া কঠিন কী?” পাল্টা প্রশ্ন ছুড়েছেন তিনি। এনআইএ-র এক অফিসার অবশ্য পরিষ্কারই বলছেন, “খাগড়াগড় নিয়ে আমরা পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বিরুদ্ধে এক-এক করে কয়েকটা অভিযোগ তুলেছিলাম। ভবিষ্যতে কোথাও যাতে ওই রকম পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সেই লক্ষ্যেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এ বার সব রাজ্যকে সতর্ক করল।”

অর্থাৎ, মূলে খাগড়াগড়েরই সেই ‘তিক্ত’ অভিজ্ঞতা। রাজ্যের এক স্বরাষ্ট্র-আধিকারিকের মন্তব্য, “দিল্লি তো এ ধরনের নথিতে খাগড়াগড় প্রসঙ্গ তুলে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের সমালোচনা করবে না। তাই এ ভাবে ঘুরিয়ে নাক দেখাল!’’

আরও পড়ুন

Advertisement