Advertisement
E-Paper

সুচেতা খুনের কথা কবুল, কিন্তু কে মারল মেয়েকে

ধরা পড়ার পর থেকে পুলিশকে নানা ভাবে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন তিনি। কখনও তাঁর দাবি: দেহ টুকরো করলেও খুন তিনি করেননি। কিন্তু শনিবার থেকে তদন্তকারীদের লাগাতার জেরায় শেষ পর্যন্ত সমরেশ সরকার কবুল করেন, তাঁর হাতেই খুন হয়েছেন সুচেতা চক্রবর্তী।

প্রকাশ পাল

শেষ আপডেট: ৩১ অগস্ট ২০১৫ ০৩:১০
কফিনে ভরা হচ্ছে সুচেতার দেহাংশ বন্দি ব্যাগ। শ্রীরামপুরের ওয়ালশ হাসপাতালে দীপঙ্কর দে-র তোলা ছবি।

কফিনে ভরা হচ্ছে সুচেতার দেহাংশ বন্দি ব্যাগ। শ্রীরামপুরের ওয়ালশ হাসপাতালে দীপঙ্কর দে-র তোলা ছবি।

ধরা পড়ার পর থেকে পুলিশকে নানা ভাবে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন তিনি। কখনও তাঁর দাবি: দেহ টুকরো করলেও খুন তিনি করেননি। কিন্তু শনিবার থেকে তদন্তকারীদের লাগাতার জেরায় শেষ পর্যন্ত সমরেশ সরকার কবুল করেন, তাঁর হাতেই খুন হয়েছেন সুচেতা চক্রবর্তী। একই ভাবে দুর্গাপুর থেকে ব্যারাকপুর ফেরার পথ নিয়েও গত দিনের দাবি থেকে রবিবার সরে আসেন পুরোপুরি। জানান, ট্রেনে লিলুয়া হয়ে নয়, শনিবার সকালে তিনি ফিরেছিলেন গাড়ি ভাড়া করে, সোজা ব্যারাকপুরে।

তবে একটা দাবিতে এখনও অটল রয়েছেন সমরেশ। বারবারই বলছেন, সুচেতার মেয়ে দীপাঞ্জনাকে তিনি খুন করেননি।

সমরেশ যতই বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করুন, তদন্তকারীদের দাবি, ধৃতকে বারবার জেরা করে এবং দুর্গাপুরে গিয়ে তদন্তের পরে তাঁরা এক রকম নিশ্চিত, রীতিমতো পরিকল্পনা করে সুচেতাকে তাঁর বাড়িতে খুন করেছিলেন সমরেশ। শুধু তা-ই নয়, ঘটনার পরে ওই বাড়িতেই তিনি রাত কাটিয়েছেন বলে জানতে পেরেছে পুলিশ। তবে দীপাঞ্জনাকে কে মারল, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। পাশাপাশি এই গোটা ‘অপারেশন’ তিনি একাই করেছিলেন, নাকি আর কেউ তাঁকে সাহায্য করেছিল, তা-ও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।

শনিবারই সমরেশকে নিয়ে দুর্গাপুরের বিধাননগরে সুচেতার বাড়িতে যান শ্রীরামপুর থানার অফিসারেরা। সুচেতার ফ্ল্যাটের চাবি ছিল সমরেশের কাছেই। প্রচুর লোক জড়ো হওয়ায় বিক্ষোভের ভয়ে সমরেশকে গাড়ি থেকে নামানো হয়নি। কিন্তু, সুচেতার আবাসনে ঢুকে কোথাও কোনও রক্তের দাগ পায়নি পুলিশ। গোটা ঘর অত্যন্ত পরিপাটি করে ধোয়ামোছা। ভিতরে ঢুকে ফিনাইলের গন্ধ পান তদন্তকারীরা। ঘরে পাখা চলছিল। একটি তোয়ালেও শুকোতে দেওয়া ছিল।

পুলিশের দাবি, সমরেশ জেরায় জানিয়েছেন, শুক্রবার ওই তোয়ালে দিয়েই রক্তের দাগ মুছে ফিনাইল দিয়ে ঘর পরিষ্কার করেন তিনি। তার পরে তোয়ালে কেচে তিনিই শুকোতে দেন। তদন্তকারীরা ঘর থেকে দু’টি বঁটিও পেয়েছেন। তাতে রক্তের দাগ ছিল না। পুলিশ অবশ্য বলছে, ওই বঁটি দিয়ে কারও দেহ খণ্ড খণ্ড করা খুবই কঠিন। এই কাজে অন্য কোনও অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে কি না, সে ব্যাপারেও জানার চেষ্টা করছে পুলিশ। তবে ফরেন্সিক পরীক্ষায় যাতে কোনও অসুবিধে না হয়, সে জন্য ঘরের ভিতরের জিনিসপত্র এখনও ঘেঁটে দেখেননি তদন্তকারীরা।

কিন্তু, তদন্তকারীদের ভাবাচ্ছে আরও একটি প্রশ্ন। যিনি এমন পরিকল্পনা করে প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা করেছেন, তিনিই আবার সুচেতা ও দীপাঞ্জনার দেহাংশ ব্যাগে ভরে এত লোকের সামনে নৌকা থেকে গঙ্গায় ফেলার মতো ‘নির্বুদ্ধিতা’ করলেন কেন? প্রাক্তন পুলিশকর্তারা বলছেন, সমরেশ দাগি অপরাধী নন। এ সব ক্ষেত্রে অনেক সময়ে দাগি অপরাধীদেরও বুদ্ধিভ্রংশ হয়। এ ক্ষেত্রে সমরেশও সম্ভবত শেষ পর্যন্ত স্নায়ুর চাপ নিতে পারেননি।

ধৃত সমরেশের বিরুদ্ধে খুন এবং তথ্যপ্রমাণ লোপাটের চেষ্টার অভিযোগে মামলা রুজু করেছে পুলিশ। রবিবার তাঁকে শ্রীরামপুর আদালতে হাজির করানো হয়। অতিরিক্ত মুখ্য বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট নচিকেতা বেরা তাঁকে ১২ দিন পুলিশ হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেন।

যে চারটি ব্যাগ-স্যুটকেস নিয়ে ব্যারাকপুরের মণিরামপুর ঘাট থেকে সমরেশ শেওড়াফুলির তিন পয়সা ঘাটে আসছিলেন, তার দু’টি শনিবারই উদ্ধার করা হয়। মাঝগঙ্গায় ফেলা স্যুটকেস দু’টির খোঁজে রাতে নদীতে ডুবুরিও নামানো হয়েছিল। জেরায় সমরেশ জানান, ওই ব্যাগ দু’টিতে ছিল সুচেতার ধড়-মুণ্ড এবং দীপাঞ্জনার দেহ। শেষ পর্যন্ত রবিবার রাতে ব্যারাকপুরের মঙ্গল পাণ্ডে ঘাট থেকে একটি মৃতদেহ-সহ ব্যাগ উদ্ধার করেছে পুলিশ। প্রাথমিক ভাবে মনে করা হচ্ছে, এটি দীপাঞ্জনার দেহ। চতুর্থ ব্যাগটির খোঁজ চালানো হচ্ছে বলে পুলিশ জানিয়েছেন।

দুর্গাপুর থেকে ফেরার ব্যাপারেও পুলিশকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন সমরেশ। ধরা পড়ার সময়ে তাঁর দাবি ছিল, অগ্নিবীণা এক্সপ্রেসে দুর্গাপুর থেকে লিলুয়া হয়ে ব্যারাকপুর ফিরছিলেন তিনি। কিন্তু রবিবার কবুল করেছেন, একটি মারুতি গাড়িতে করে প্রথমে বর্ধমানে যান। সেখানে গাড়িটি ছেড়ে দেন। তার পরে অন্য একটি গাড়ি ভাড়া করে ব্যারাকপুরে আসেন। সেখান থেকে নৌকায় শেওড়াফুলি যাচ্ছিলেন তিনি।

পুলিশ সূত্রের খবর, দুর্গাপুর স্টেশনে যাতায়াতে সাধারণত মহম্মদ নিয়াজউদ্দিন ওরফে সান্টু নামে স্থানীয় এক যুবকের অটোতে চড়তেন সমরেশবাবু। গত বৃহস্পতিবার তাঁকে ফোন করে শনিবার সকালে অটো নিয়ে আসতে বলেছিলেন সমরেশ। পরে, শুক্রবার সন্ধেয় মত বদলে নিয়াজউদ্দিনকেই একটি গাড়ির ব্যবস্থা করে দিতে বলেন। সেই মতো শনিবার ভোর ৪টে নাগাদ নিয়াজউদ্দিন ও তাঁর ভাই ইয়াজউদ্দিন একটি মারুতি ওমনি ভ্যান নিয়ে সমরেশকে তুলতে যান সুচেতার বাড়িতে। রবিবার দুই ভাই-ই শ্রীরামপুর আদালতে এ ব্যাপারে গোপন জবানবন্দিও দিয়েছেন।

নিয়াজউদ্দিন এ দিন বলেন, ‘‘দাদা (সমরেশ) শুক্রবার ফোন করে বললেন, লাগেজ বেশি থাকায় গাড়ি লাগবে। তাই আমরা গাড়ি নিয়ে যাই। দাদা চারটে ব্যাগ-সুটকেস নিয়ে আবাসনের পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গাড়িতে ওঠেন। তবে, দুর্গাপুরে নয়। দাদাকে বর্ধমানে ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমরা জানতামই না, ওই ব্যাগে মৃতদেহ রয়েছে।’’

পুলিশ জানিয়েছে, শুক্রবার দুপুর ১২টা নাগাদ ব্যাঙ্কের কর্মীদের সমরেশ বলেছিলেন, তাঁর জ্বর হয়েছে। এর পর তিনি ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে যান। শনিবার ভোরে তিনি সুচেতার ফ্ল্যাট থেকে বেরোন। এই সময়টা তিনি সুচেতার বাড়িতেই ছিলেন বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।

সুচেতা খুন নিয়ে জেরার মুখে কী বলেছেন সমরেশ? তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, পুলিশকে সমরেশ প্রথমে জানিয়েছিলেন, সুচেতা তাঁকে বিয়ে করার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। কিন্তু ব্যারাকপুরে দুই সন্তান ও স্ত্রী নিয়ে তাঁর ভরা সংসার থাকায় সেই দাবি মেনে নেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। সেই আপত্তি শুনে সুচেতা নিজের মেয়েকে বালতির জলে ডুবিয়ে মারেন বলে সমরেশ তদন্তকারীদের বলেছেন। তাঁর দাবি, চেষ্টা করেও তিনি শিশুটিকে বাঁচাতে পারেননি। সেই সময় উত্তেজিত হয়ে সুচেতাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেন সমরেশ।

কিন্তু সমরেশের আপত্তি শুনে কেন সুচেতা তাঁর শিশুকন্যাকে জলে ডুবিয়ে মারবেন, তা স্পষ্ট হয়নি তদন্তকারীদের কাছে। বরং তাঁদের বক্তব্য, সমরেশের কথায় অনেক ফাঁক রয়েছে।

এ দিন সুচেতার উদ্ধার হওয়া দেহাংশের ময়না-তদন্তের জন্য শ্রীরামপুর ওয়ালশ হাসপাতাল থেকে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সুচেতার আত্মীয়দের দাবি, সমরেশের ব্যাপারে তাঁরা কিছুই জানতেন না। এ দিন শ্রীরামপুর থানায় বসে সুচেতার এক আত্মীয় বলেন, ‘‘সুচেতার সঙ্গে ওর স্বামীর দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সমরেশ বলে কারও নাম আমরা কখনও শুনিনি।’’ সুচেতার স্বামী শ্রুতিধর মুখোপাধ্যায় অবশ্য এ দিন কোনও কথা বলেননি। হাসপাতালে মুখে রুমাল দিয়ে মুখ ঢেকে বসে থাকতে দেখা যায় তাঁকে।

স্বামী এই অপরাধ করেছেন, তা এখনও মানতে নারাজ সমরেশের স্ত্রী উৎসা সরকার। ব্যারাকপুরের চন্দ্র মাস্টার রোডের ছাই রঙা দোতলা বাড়িটার নীচের তলায় শনিবার থেকেই ভিতর থেকে জোড়া তালা। বাইরে সংবাদমাধ্যম ও কৌতূহলী পড়শিদের ভিড়। উৎসাদেবী এ দিন বলেন, ‘‘মাস তিনেক আগে মেয়ে ওঁর (সমরেশ) কাছে থাকা মোবাইল দেখতে গিয়ে একটা এসএমএস দেখেছিল। স্বামী-স্ত্রী’র মধ্যে মনোমালিন্য হলে যে ধরনের কথোপকথন হয়, তেমন এসএমএস ছিল। উনি তখন বলেছিলেন, ব্যাঙ্কে এক গ্রাহকের পারিবারিক সমস্যা মেটাতে হচ্ছে। এটা তাঁর ফোন। উনি এ রকম অনেকের ব্যক্তিগত সমস্যায় পাশে দাঁড়াতেন। তাই সন্দেহ হয়নি।’’

তবে, পুলিশি হেফাজতেই স্বামীর সঙ্গে এক দিন দেখা করতে চান উৎসাদেবী। এত দিন যিনি সংসার, সন্তান আর স্ত্রী ছাড়া কোনও জগৎই নেই বলে দাবি করেছেন, তাঁকে সরাসরি প্রশ্ন করতে চান, সত্যিটা কী?

সহ প্রতিবেদন: বিতান ভট্টাচার্য ও সুব্রত সীট

prakash pal samaresh sarkar sucheta chakraborty sucheta daughter bitan bhattacharya subrata sit durgapur murder bank manager murderer illicit relation
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy