বগটুই হত্যাকাণ্ডের পরে স্বজনহারা পরিবার পিছু এক জনকে চাকরি দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁদের মধ্যে নিহত মীনা বিবির মেয়ে মফিজা বিবি রামপুরহাট ১ ব্লকে চাকরি পান। এখন ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের ভূমি ও ভূমি রাজস্ব দফতরের বিজ্ঞপ্তিতে তাঁর চাকরি আচমকাই বাতিল হয়েছে। আপাতত এমন দশ জনের চাকরি গিয়েছে। তাঁরা অনেকেই রাজ্যে কোনও না কোনও রাজনৈতিক সংঘর্ষ বা হিংসার ঘটনার শিকার। কেউ ভিন্ রাজ্যে ঘৃণা-বিদ্বেষজনিত হামলায় নিহত হতদরিদ্র সংখ্যালঘু সমাজের মানুষ। ক্ষতিপূরণ বাবদ চাকরি পেলেও তাঁদের জীবনে ফের অন্ধকার নেমে এল। যদিও এই ধরনের পদ সাময়িক ও মন্ত্রিসভার মেয়াদ ফুরোতেই তাতে শেষ হওয়ার নিয়ম। এই চাকরিগুলি দেওয়ারক্ষেত্রে বিধি মানা হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।
রবিবার মফিজা বলেন, ‘‘আশায় ছিলাম, চাকরি স্থায়ী হবে। বেতন না পেয়ে ১১ জুন নবান্নে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখান থেকে কাজে যেতেও মানা করা হল। আমার স্বামী দিনমজুর। কে জানে, দুই ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগাব কী করে?’’
ওড়িশার সম্বলপুরের দানিপালিতে ২০২৫-এর ২৪ ডিসেম্বর সুতির পরিযায়ী শ্রমিক জুয়েল রানাকে পিটিয়ে খুন করা হয়। তাঁর মা নাজেমা বিবিকে চাকরি দিয়েছিল আগের রাজ্য সরকার। সেই চাকরিও বাতিল হয়েছে। নাজেমা জানান, ১০ হাজার টাকা বেতনের অস্থায়ী চাকরি পেয়েছিলেন। গত শুক্রবারও অফিসে গিয়েছেন তিনি। তবে মে মাসের বেতন হাতে পাননি। সুতি ১ ব্লক ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরের আধিকারিক ইফতিকারুদ্দিন সর্দার রবিবার বলেন, “ওঁর চাকরি চলে যাওয়ার কোনও নির্দেশ আমার কাছে এখনও আসেনি। গত মাসে তিনি যে বেতন পাননি, তা দফতরে জানিয়েছি।’’ নাজেমা বলেন, “বাড়িতে বিড়ি বেঁধে সামান্য আয় করি। সরকার বদল হলে চাকরি চলে যাবে, জানা ছিল না।’’ জঙ্গিপুরের ‘বিদ্রোহী’ তৃণমূল সাংসদ খলিলুর রহমান বলেন, “এই সিদ্ধান্ত দুঃখজনক ও অমানবিক। জেলাশাসককে জানিয়েছি।”
তৃণমূল জমানায় সাময়িক ভিত্তিতে সহায়ক হয়ে নিযুক্ত হয়েছিলেন তাঁরা। চাকরি যাওয়া সহায়কদের সাত জন জেলাস্তরে ভূমি দফতরে যুক্ত ছিলেন। তিন জন যুক্ত ছিলেন সচিবালয়ের সঙ্গে। তৃণমূল জমানায় স্বরাষ্ট্র দফতর ২০২৪-এ যে বিধি প্রকাশ করেছিল তাতে, এই ধরনের সহায়কদের পদ একেবারেই সাময়িক ভিত্তিতে মন্ত্রীদের কার্যকালের মেয়াদ থাকা (কোটার্মিনাস ভিত্তিক) পর্যন্ত তৈরি হয়। সেই সূত্র ধরে রাজ্যে ভোটের ফলপ্রকাশের পরে গত মন্ত্রিসভার মেয়াদ ফুরোতেই পদগুলিতে ইতি টেনেছে নতুন ক্ষমতাসীন রাজ্য সরকার।
২০২৩-এ উত্তর দিনাজপুরের একটি ব্লকে এক নাবালিকাকে ধর্ষণ করে খুনের অভিযোগ ওঠে। ২০২৪-এর ডিসেম্বরে তার মাকেও চাকরি দেয় রাজ্য সরকার। চাকরি যাওয়ার খবর শুনে তিনিও আকাশ থেকে পড়েছেন।
বছর দু’য়েক আগে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসন্তী ব্লক ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরে চুক্তিভিত্তিক কর্মীর চাকরি পেয়েছিলেন সাকিলা সর্দার মল্লিক। সাকিলার স্বামী পরিযায়ী শ্রমিক সাবির মল্লিককে হরিয়ানায় পিটিয়ে মারা হয় বলে জানা যায়। সাকিলা বলেন, “গত মাস থেকেই বেতন বন্ধ। আমার সন্তান ছোট। চাকরিটা চলে গেলে কী করে বাঁচব! এক বছরের মধ্যে স্থায়ী কর্মী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সরকার। এখন তো চাকরিই কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।” দক্ষিণ ২৪ পরগনার মগরাহাটের অর্জুনপুরের বাসিন্দা সালেহা বিবির স্বামী, মগরাহাট পূর্ব পঞ্চায়েতের তৃণমূল সদস্য ময়মুর ঘরামি ২০২৩ সালে খুন হন। পরে ব্লক ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরে চুক্তিভিত্তিক কাজ পান সালেহা। তাঁরও চাকরি গিয়েছে। অভিজ্ঞ আমলাদের একাংশের মতে, সরকারি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধি আদতে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য। সেখানে রাজনৈতিক সংঘর্ষে এমন পদক্ষেপ বিধিসম্মত নয়। দুর্গতকে সরকারি নিয়োগ দিলে, পৃথক বিধি মেনে মন্ত্রিসভার অনুমোদন এবং সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি মানতে হয়। অতীতের সেই ঘটনাগুলিতে তা হয়নি। আবার হতদরিদ্র স্বজনহারাদের চাকরি হারানো নিয়ে মানবিক দিকথেকেও প্রশ্ন উঠেছে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)