Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১৬ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

শিল্পের জন্য জমিতে টাউনশিপ, মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণায় ক্ষুব্ধ শিবপুর

মহেন্দ্র জেনা
বোলপুর ১২ জুলাই ২০১৪ ০৩:৫৯

শিল্পের জন্য নেওয়া কৃষিজমির প্রায় অর্ধেকটাতেই গড়া হবে টাউনশিপ। বৃহস্পতিবার বোলপুরের জনসভায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ঘোষণার পর থেকেই ক্ষোভে ফুঁসছে শিবপুর মৌজা। প্রায় ১৪ বছর অনাবাদী পড়ে রয়েছে ১১৮৭ চাষির প্রায় ৩০০ একর জমি। শিল্প গড়ে উঠলে এলাকার সমৃদ্ধি হবে, কর্মসংস্থান হবে, জমিদাতা চাষিদের সেই আশা পূরণ হয়নি। আবার দু’ফসলি জমির ন্যায্য ক্ষতিপূরণও পাননি, দাবি তাঁদের। শুক্রবার কাশীপুরের উত্তরপাড়ার দুই জমিদাতা হাসিবুদ্দিন খাঁ এবং আব্দুল রহমান আক্ষেপ করলেন, “এই সরকারও আমাদের বোকা বানাল।”

টাউনশিপ তৈরির সিদ্ধান্তকে তাঁদের সঙ্গে প্রতারণা বলেই মনে করছেন জমিদাতাদের একাংশ। ‘শ্রীনিকেতন শান্তিনিকেতন কৃষিজমি বাঁচাও কমিটি’ বর্তমানে শাসক দলের নিয়ন্ত্রণে। প্রকাশ্যে মুখে কুলুপ আঁটলেও, কমিটির প্রথম সারির এক নেতা একান্তে বলছেন, “আইটি পার্কের কাজ শুরু হওয়ায় শিল্প গড়ার ব্যাপারে আশা দেখা যাচ্ছিল। মুখ্যমন্ত্রী এসে তাতে জল ঢেলে দিলেন। টাউনশিপে কলকাতার বাবুদের বাড়িতে কাজ করে ক’জনের কমর্সংস্থান হবে?”

শিল্প দফতরের এক কর্তা অবশ্য দাবি করেন, শিবপুর মৌজায় যা হবে তা ‘ইন্টিগ্রেটেড টাউনশিপ।’ অর্থাৎ আইটি হাব-এ কর্মরত লোকেদের থাকার ব্যবস্থা। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও প্রশ্ন উঠছে, জমির প্রায় অর্ধেক নিয়ে টাউনশিপ কেন? এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য না করলেও বীরভূমের জেলাশাসক পি মোহন গাঁধী বলেন, “শিবপুরে আইটি হাবের কাজ শুরু হয়েছে। বিশ্ববাজারের জন্য সেখানে ৫০ একর জমিতে ৪৯টি স্টল তৈরি হবে। আরও ১৫০ একর জমিতে টাউনশিপের কথা মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন। আমরা পর্যায়ক্রমে আলোচনা করে কাজ শুরু করব।”

Advertisement

জমিদাতাদের ক্ষোভকে কাজে লাগাতে ইতিমধ্যেই তৎপর বিরোধীরা। শুক্রবারই টাউনশিপের বিরোধিতা করে আন্দোলনে নামার কথা জানিয়েছেন বিজেপির জেলা সহ-সভাপতি দিলীপ ঘোষ। সিপিএমের বোলপুর জোনাল সম্পাদক উৎপল রুদ্রও বলেন, “শিল্প আর আবাসন কি এক? ওই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে পথে নামব।”

শিল্পস্থাপনের জন্য ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে শিবপুর মৌজার প্রায় ৩০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। মোট জমিদাতা ১১৮৭ জন, বর্গাদার ১৬২ জন। মোট জমির প্রায় ২০৬ একরে শিল্প করা হবে বলে তৎকালীন বাম-সরকার জানিয়েছিল। অনেক জমিদাতারই বক্তব্য, এলাকায় শিল্প হবে, এবং তার ফলে কর্মসংস্থান হবে, এই আশায় অনেক কম দামেই জমি দিয়েছিলেন তাঁরা। জমির দাম নিয়ে আপত্তি জানিয়ে ক্ষতিপূরণের চেক নেননি শ’খানেক চাষি।

রাজ্য শিল্প পরিকাঠামো উন্নয়ন নিগমের ওই জমিতে অবশ্য কেউ শিল্প গড়তে আসেনি। শিল্প না-হওয়ায় বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী জমির ন্যায্য ক্ষতিপূরণের দাবিতে ২০০৮ সালে তৃণমূলের নেতৃত্বে ‘শ্রীনিকেতন শান্তিনিকেতন কৃষিজমি বাঁচাও কমিটি’ গড়ে আন্দোলনে নামেন জমিদাতারা। ক্ষতিপূরণ-সহ ১৪ দফা দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা আন্দোলন করে আসছেন। সেই সময় বিরোধী দলনেতা পার্থ চট্টোপাধ্যায় এলাকায় এসে আন্দোলনকারীদের সমর্থন জানিয়ে গিয়েছিলেন। পরে অধিগৃহীত জমির সিমেন্টের সীমানা খুঁটি উপড়ে জমিদাতাদের একাংশ ধান চাষও শুরু করেন।

রাজ্যে পালা বদলের পরে গোড়ায় শিল্পমন্ত্রী হন পার্থবাবুই। ২০১২ সালের মার্চ মাসে শিল্পসংস্থা আইটিসি-র কর্মকর্তাদের নিয়ে শিবপুর মৌজা পরিদর্শন করে যান তিনি। পড়ে থাকা ওই জমিতে আইটি হাব, ফুড পার্ক গড়ার আশ্বাসও দিয়েছিলেন। কিন্তু বাম আমলের মতোই এ বারও কোনও বেসরকারি শিল্পসংস্থা সেখানেশিল্প গড়তে উৎসাহ দেখায়নি। শেষমেশ গত অগস্টে ওই শিল্পতালুকের অনেকটা জমি ডব্লুবিআইআইডিসি (পশ্চিমবঙ্গ শিল্প ও পরিকাঠামো উন্নয়ন নিগম)-সহ কয়েকটি সরকারি সংস্থার হাতেই তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এলাকায় শিল্পতালুক হবে বলে সরকারকে দু’বিঘা জমি দিয়েছিলেন বৃদ্ধ সোম মাড্ডি। জীবদ্দশায় ওই জমিতে শিল্প দেখতে পাবেন কি না, সন্দেহ তাঁর। সোম মাড্ডির ছেলে, রাইপুর-সুপুর পঞ্চায়েতের নুরপুর গ্রামের লক্ষ্মীরাম মাড্ডি বলেন, “শিল্প হবে বলে বাবা অনেক কম টাকাতেই ওই জমি দিয়েছিলেন। শিল্প তো হলই না, বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী আবার ওখানে টাউনশিপ করার কথা বলছেন। এটা প্রতারণা ছাড়া আর কী?” অধিগৃহীত জমির ১৫ বিঘায় বর্গা চাষ করতেন নুরপুরেরই বাসিন্দা মঙ্গলা হেমব্রম। তাঁর ক্ষোভ, “শিল্প হলে এলাকার উন্নতি হবে, অনেক মানুষ কাজ পাবেন, সরকারের এই আশ্বাসেই তো আমরা জমি দিয়েছিলাম। এখন শুনছি কলকাতার বাবুদের জন্য বড় বড় বাড়ি তৈরি হবে। এটা কেমন উন্নয়ন?” কার্যত একই বক্তব্য একই পঞ্চায়েতের কাশীপুর গ্রামের পূর্বপাড়ার জমিদাতা মহম্মদ হানিফ, শের মহম্মদ খাঁ-এরও।

এ দিকে, কাশীপুরের উত্তরপাড়ার দুই জমিদাতা হাসিবুদ্দিন খাঁ, আব্দুল রহমান জানান, এলাকার সিপিএম নেতাদের মুখে শিল্প আর কর্মসংস্থানের ভরসা পেয়ে জমি দিয়েছিলেন। পরে পার্থবাবুর নেতৃত্বে সভা করে ‘শিল্প হোক, না হলে জমি ফেরত’ দেওয়া হোক’ বলে আন্দোলনও করেছেন। রীতিমতো রাগত স্বরে দু’জনেই বললেন, “জমির বেড়া ভেঙে চাষ করতে গিয়ে পুলিশের মারের দাগ এখনও গা থেকে যায়নি। তার জন্য কেসও খেয়েছি। কিন্তু কোথায় শিল্প! আগে শুনতাম শিল্পতালুক হবে। নতুন সরকার বলল, শিল্প বিকাশ কেন্দ্র হবে। এখন দেখছি সবই ভাঁওতা।”

এ দিনই দুবরাজপুরে আক্রান্ত দলীয় কর্মী-সমর্থকদের দেখতে এসে শিবপুর প্রসঙ্গ তোলেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক বিমান বসু। তাঁর দাবি, “ওখানে শিল্প হলে কর্মসংস্থান তৈরি হবে। কিন্তু টাউনশিপ হলে ফ্ল্যাট বিক্রি করে কিছু বিশেষ লোকেরই পকেটে টাকা ঢুকবে। এলাকার সার্বিক উন্নতি হবে না।” মন্তব্য করতে রাজি হননি কমিটির বর্তমান সভাপতি মোজাম্মেল হক। তৃণমূলের জেলা সভাপতি অনুব্রত মণ্ডল অবশ্য টাউনশিপ গড়া নিয়ে জমিদাতাদের মধ্যে কোনও ক্ষোভের কথা মানতেই চাননি। বিমানবাবুর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, “ওঁরা কোন মুখে এ সব বলছেন? এক ইঞ্চি জমিতেও তো শিল্প গড়তে পারেননি। আমরাই বরং আইটি হাব, বিশ্ববাজার গড়ছি।”

আরও পড়ুন

Advertisement