Advertisement
E-Paper

সোমনাথ ঘরেরই, ঘরে এসে বার্তা ইয়েচুরির

যিনি দলের বাইরে, তিনি মনেরও বাইরে! বহিষ্কৃত লোকজনের সঙ্গে মেলামেশা না করাই ছিল এক কালে সিপিএমের দস্তুর। কিন্তু এখন সিপিএমে সীতা-যুগ। এ যুগে বহিষ্কৃত নেতার সঙ্গে মনের মিল থাকলে তাঁর বাড়িতে দুনিয়ার গল্প করতে করতে ভাত, ডাল, পোস্ত, পটল ও আলু ভাজা, ধোকার ডালনা এবং মাছ দিয়ে দুপুরের ভোজ সেরে আসতে পারেন সাধারণ সম্পাদক।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২০ জুলাই ২০১৫ ০৩:১৯
সস্ত্রীক সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে সীতারাম ইয়েচুরি। শান্তিনিকেতনে সোমনাথের বাড়িতে। বিশ্বজিৎ রায়চৌধুরীর তোলা ছবি।

সস্ত্রীক সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে সীতারাম ইয়েচুরি। শান্তিনিকেতনে সোমনাথের বাড়িতে। বিশ্বজিৎ রায়চৌধুরীর তোলা ছবি।

যিনি দলের বাইরে, তিনি মনেরও বাইরে! বহিষ্কৃত লোকজনের সঙ্গে মেলামেশা না করাই ছিল এক কালে সিপিএমের দস্তুর। কিন্তু এখন সিপিএমে সীতা-যুগ। এ যুগে বহিষ্কৃত নেতার সঙ্গে মনের মিল থাকলে তাঁর বাড়িতে দুনিয়ার গল্প করতে করতে ভাত, ডাল, পোস্ত, পটল ও আলু ভাজা, ধোকার ডালনা এবং মাছ দিয়ে দুপুরের ভোজ সেরে আসতে পারেন সাধারণ সম্পাদক। শেষ পাতে দই-মিষ্টি ভাগ করে নিতে পারেন কেন্দ্রীয় কমিটির আরও দুই সদস্যের সঙ্গে!

ঘোর বর্ষার শান্তিনিকেতন এমন ঘটনারই সাক্ষী থাকল রবিবার দুপুরে। যখন লোকসভার প্রাক্তন স্পিকার সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের আতিথেয়তা স্বীকার করে তাঁর বাড়িতে মধ্যাহ্নভোজ সারলেন সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি। সঙ্গে ছিলেন দলের বর্ষীয়ান নেতা শ্যামল চক্রবর্তী এবং কেন্দ্রীয় কমিটিতে তাঁর নতুন সতীর্থ রামচন্দ্র ডোম। প্রকাশ কারাট সাধারণ সম্পাদক থাকাকালীন সোমনাথবাবুর তাঁকে আমন্ত্রণ করার প্রশ্ন ছিল না, কারাটেরও তা রক্ষা করতে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। পলিটব্যুরোর সদস্য হিসেবেই ইয়েচুরি অবশ্য কয়েক বছর আগে সোমনাথবাবুর কলকাতার বাড়িতে গিয়েছিলেন একেবারে গোপনে, আলিমুদ্দিনের দূত হিসাবে। এখন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সেই পর্দাটা তুলেই নিলেন। আনুষ্ঠানিক সদস্যপদ ফিরিয়ে দিতে না পারলেও ইদানীং নানা অনুষ্ঠানে ‘অতিথি’ সোমনাথবাবুকে আবার ‘ঘরের লোক’ করে তুললেন ইয়েচুরি।

দিনদশেক আগেই জ্যোতি বসুর জন্মদিনে সোমনাথবাবুর সঙ্গে একমঞ্চে ছিলেন ইয়েচুরি। সে দিনই তাঁর মন্তব্য ছিল, কাউকে দলে ফেরাতে গেলে সিপিএমে যে প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, সোমনাথবাবুর ক্ষেত্রেও সেই প্রক্রিয়া মিটে গেলেই উত্তর মিলবে! তার পরে ইয়েচুরির সবুজ সঙ্কেত নিয়েই কেরল সিপিএম দীর্ঘ ২১ বছর পরে দলে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রবীণ নেত্রী কে আর গৌরী আম্মাকে। সিপিএম থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরে গৌরী আম্মা শুধু নতুন দলই গড়েননি, কংগ্রেসের জোটে যোগ দিয়ে তাদের সরকারের মন্ত্রীও হয়েছেন। সেই তুলনায় সোমনাথবাবু বরাবরই বামপন্থী থেকেছেন। বামেদের ডাকে সভা-সমাবেশে হাজির হয়েছেন। এ বার তাঁর বাড়িতে যখন সাধারণ সম্পাদক চলে গেলেন, তা হলে বোলপুরের প্রাক্তন সাংসদের সিপিএমে প্রত্যাবর্তন নিশ্চয়ই সময়ের অপেক্ষা! সোমনাথবাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে ইয়েচুরি যে এ দিন বলেছেন লোকসভার প্রাক্তন স্পিকার তাঁদের দলের সঙ্গেই আছেন, তাতেই জল্পনার আগুনে আরও ঘৃতাহুতি!

কিন্তু সিপিএমের অন্দরের খবর, জল্পনা আর বাস্তবের ফারাক পোস্ত-ভাতে মিটে যায়নি! অন্য ভাবে বললে, পর্বত সামনে এসে হাজির হলেও মহম্মদ এখনও রাজি নয়! সোমনাথবাবুকে ফিরিয়ে নিতে স্বয়ং ইয়েচুরি বা আলিমুদ্দিনের কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু প্রক্রিয়া মেনে তার জন্য দু’লাইনে হলেও ইচ্ছাপ্রকাশ করতে হবে সোমনাথবাবুকে। যে কাজে লোকসভার প্রাক্তন স্পিকার উৎসাহী নন। ইয়েচুরিদের তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, সক্রিয় রাজনীতি থেকে তিনি এত দিনে সরেই গিয়েছেন। ভোটে দাঁড়ানোরও আর প্রশ্ন নেই। এখন শরীর ভাল থাকলে সিপিএম নেতৃত্বের ডাকে বিভিন্ন কর্মসূচিতে যেতে পারেন মাত্র। ইয়েচুরিরাও বুঝছেন, সোমনাথবাবু খুব অযৌক্তিক কিছু বলছেন না। তাঁদের ডাকে সোমনাথবাবু যদি সাড়া দিতে থাকেন, তা হলে ক্ষতি কী?

তা হলে এ দিনের মধ্যাহ্নভোজের বাড়তি তাৎপর্য কী? ইয়েচুরি জানাচ্ছেন, স্থানীয় পূর্ণিদেবী চৌধুরী কলেজের বিজ্ঞান ভবনের উদ্বোধন উপলক্ষে বোলপুরে গিয়েছিলেন তিনি। ওই কলেজের উন্নয়নে রাজ্যসভার সাংসদ তহবিল থেকে সাহায্য দিয়েছেন ইয়েচুরি। আর সোমনাথবাবুই ওই কলেজের পরিচালন সমিতির সভাপতি। এমন একটি অবসর পেয়ে সোমনাথবাবু তাঁর প্রিয় শিষ্যদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ইয়েচুরিরা ‘না’ করেননি। সোমনাথবাবুকে দলে ফেরানো নিয়ে কোনও কথা কি তাঁদের হয়নি? পরে কলকাতা ফেরার পথে ইয়েচুরির সহাস্য মন্তব্য, ‘‘কয়েক জন কমিউনিস্ট এক ছাদের নীচে এলে যা যা আলোচনা হতে পারে, সব হয়েছে!’’ একই সুর শ্যামলবাবুর গলাতেও।

আর সোমনাথবাবু? তিনি বলছেন, ‘‘দলে যোগ দেওয়ার বিষয়ে কথা হয়নি। সেটা সম্ভব নয়। আমার শরীর খারাপ। আমি অবসর নিয়ে নিয়েছি। এখন নতুন করে আমার পক্ষে কোনও রাজনৈতিক কার্যকলাপ সম্ভব নয়।’’ একই সঙ্গে তাঁর সংযোজন, ‘‘আমি তো ওঁদের সমর্থন করেছি। ওদের সমর্থনে নির্বাচনে কাজ করেছি। সে রকম যদি মনে করি আবার যাব।’’

তবে সুযোগ পেয়ে ইয়েচুরি মনে করিয়ে দিয়েছেন (পড়ুন, কারাটদের), সাতের দশকে আধা-ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাস থেকে জরুরি অবস্থা, জোট সরকারের পর্ব, দিল্লিতে বিজেপি-র জমানা— নানা সময়ে সোমনাথবাবুর অভিজ্ঞতার দাম এখন সিপিএমের কাছে বিপুল। ইয়েচুরির কথায়, ‘‘সাধারণ সম্পাদক হয়ে আমি বলছি, দলের সব অনুষ্ঠানে সোমনাথদা সহযোগিতা করছেন। করবেনও। ওঁর সঙ্গে সম্পর্ক এ রকমই।’’

sitaram yechuri shantiniketan somenath cahttopadhyay somenath cahttopadhyay family member sitaram yechuri meets family member cpm somenath somenath returns cpm somenath sitaram
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy