×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২০ এপ্রিল ২০২১ ই-পেপার

মোটা মাইনের টোপ, বিদেশে পাসপোর্ট খুইয়ে বন্দি বাঙালি

সুনন্দ ঘোষ
কলকাতা ২৪ মে ২০১৫ ০৩:১৪

আরব মুলুকের প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় বসে বাংলার অজ গাঁ-কেই যেন স্বর্গ মনে হচ্ছে!

দূর বিদেশে মোটা মাইনের চাকরির স্বপ্নটা নিষ্ঠুর ঠাট্টা রঞ্জিত দাসের কাছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার নামখানায় টাকা পাঠিয়ে বোনের বিয়ে দেওয়া দূরে থাক, অসহ্য গরমে এক বেলা খেয়ে তাঁর দিন কাটছে কার্যত বন্দিদশায়। দালালকে লক্ষ টাকা দিয়ে বিদেশে চাকরি করতে গিয়ে এ ভাবেই বিপাকে পড়েছেন তিনি। মিলছে না ছিটেফোঁটা মাইনে। যে সংস্থার চাকরি নিয়ে গিয়েছেন, পাসপোর্টও তাদেরই জিম্মায়। ফলে ফেরার রাস্তা বন্ধ। এই দুর্দশা থেকে মুক্তি মিলবে কী ভাবে, সেই প্রশ্নটাই হাতড়ে বেড়াচ্ছেন দিশেহারা যুবক।

‘‘ওরা (সংস্থা) বলেছিল, পাসপোর্ট জমা দিলেই ‘আকামা’ বা পরিচয়পত্র দেবে। সেটা দেখিয়ে অন্য কোথাও চাকরির চেষ্টা করা যেত। নিদেনপক্ষে ঘরে তো ফিরতে পারতাম। কিন্তু এখন মাইনে, পাসপোর্ট কিছুই পাচ্ছি না!’’ — ফোনে বলতে বলতে গলা কাঁপছিল রঞ্জিতের। তিনি অবশ্য একা নন। তাঁর সঙ্গেই রয়েছেন নামখানার আরও জনা ৫০ যুবক। দিনে এক বার পালা করে এক জন লুকিয়ে-চুরিয়ে একটি সংস্থার গাড়িতে সওয়ার হয়ে বাইরে যান। দু’মুঠো বাজার করে আনেন। ওই ক্যাম্পেরই আর এক যুবক শক্তিপদ জানা মায়ের
মৃত্যুতেও দেশে ফেরার ছাড়পত্র পাননি। মজুর বা টেকনিশিয়ানের ছোটখাটো চাকরি করে ভাগ্য ফেরাতে সৌদি আরব পাড়ি দিয়ে এখন বন্দিজীবন কাটছে তাঁদের।

Advertisement

একই দশা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিপ্লোমাধারী সঞ্জিত রায়েরও। তাঁর ঠিকানা মালয়েশিয়ার কুয়ালা লামপুরের ‘ত্রাণ শিবির’। ভারতীয় দূতাবাসের এই ত্রাণ শিবিরই আপাতত আশ্রয় আরও হাজারখানেক ভারতীয়ের। স্বপ্নভঙ্গের পরে এখন দেশে ফেরার অপেক্ষায় তাঁরা সকলে। সঞ্জিত জানালেন, দেশে ফেরাতে ২০০০ রিঙ্গিট (মালয়েশিয়ার মুদ্রা) দাবি করেছে দূতাবাস। ভারতীয় মুদ্রায় যার দাম ৩৫ হাজার টাকারও বেশি। দু’মাস মাইনে হয়নি, কোথা থেকে সেই টাকা জোগাড় হবে, ভাবতে মাথা খুঁড়ছেন বনগাঁর যুবক। দেশে ফিরতে ব্যাকুল নদিয়ার শান্তিপুরের মহাবুল কারিগরও। পাঁচ মাস ধরে ত্রাণ শিবিরে কোনও মতে ভাত জোটানোর ব্যবস্থা হচ্ছে।

এই যুবকদের জন্য কি কোনও রাস্তা খোলা রয়েছে? সদু্ত্তর মেলেনি বিদেশ মন্ত্রকের কাছে। তবে মন্ত্রক সূত্রে খবর, মূলত সৌদি আরব আর মালয়েশিয়াতেই এই সমস্যা হচ্ছে।

দালালকে টাকা দিয়ে চাকরি নিয়ে বিদেশে পা রাখলে প্রথমেই পাসপোর্ট নিজের হাতে নিয়ে নেয় সংস্থা। তার পর পরিচয়পত্র পেতে নানা জটিলতা, চাকরিতে সমস্যা— লেগেই থাকে। ওই পাসপোর্ট আবার ফেরত পেতে কালঘাম ছোটে। কলকাতায় বিদেশ মন্ত্রকের প্রতিনিধি গীতিকা শ্রীবাস্তব বলেন, ‘‘সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ায় এই ধরনের সমস্যা মেটাতে দূতাবাসের আলাদা বিভাগ রয়েছে। সেখানে আবেদন জানানো ছাড়া সমাধান নেই।’’ কিন্তু দূতাবাস কত দূর কী করতে পারে, তা নিয়েও রয়েছে সংশয়। এক অফিসার জানান, দূতাবাস বড়জোর দেশে ফেরার ছাড়পত্র দিতে পারে। কিন্তু ফেরার খরচ জোগাড় করতে হবে আবেদনকারীকেই।

আগেও বহু বার এ ভাবে বিদেশ-বিভুঁইয়ে ভুগতে হয়েছে এ দেশের যুবকদের। কিন্তু দালালের হাতে টাকা দিয়ে বিদেশে পাড়ি দেওয়ার রেওয়াজ বন্ধ হয়নি। নামখানার রঞ্জিত ও অন্যদের সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন নজরুল আলি খান নামে এক দালাল। তিনি বিদেশে বন্দি থাকার অভিযোগ উড়িয়েছেন। জোর গলায় তাঁর দাবি, ‘‘রঞ্জিতরাই ওখানে গোলমাল পাকিয়েছিল। এখন বিপদে পড়ে মিথ্যা বলছে।’’ এলাকায় প্রভাবশালী নজরুলের বিরুদ্ধে পুলিশ-প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানানোর সাহস নেই ঘরছাড়াদের পরিজনদের। নামখানার দক্ষিণ দুর্গাপুর গ্রামে তাই উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন রঞ্জিতের স্ত্রী ও দুই ছেলে-মেয়ে। রঞ্জিতের কাকা মদন দাসের কথায়, ‘‘কী করে ছেলেটাকে ফিরিয়ে আনব জানা নেই।’’

একই সুর সঞ্জিতের দাদার গলাতেও। কুয়ালা লামপুরে বন্দি সঞ্জিতের দাদা রাজু থাকেন উত্তর ২৪ পরগনার বাগদায়। বললেন, ‘‘আমাদের চাষ করে চলে। ভাই বিদেশে চাকরি করতে যাওয়ায় ভরসা পেয়েছিলাম। এখন কী ভাবে ওকে ফেরত আনব, ভেবেই পাচ্ছি না।’’ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার সঞ্জিত দু’মাস ধরে মাইনে পাচ্ছেন না, সেই সঙ্গে বিদেশে মারধরও খেয়েছেন বলে অভিযোগ। তাঁর দাদা জানিয়েছেন, বাগদা থানায় অভিযোগ জানাতে গেলেও আমল দেয়নি পুলিশ।

Advertisement