Advertisement
১৪ জুলাই ২০২৪

বালিশের পাশে নতুন জুতো আগলে ঘুমোতাম

পুজোর আগে শাড়ি আর ছিটকাপড়ের বোঁচকা কাঁধে বাড়ি আসত ফেরিওয়ালা। থানকাপড় দিয়ে ছেলেদের জামা, মেয়েদের ফ্রক তৈরি করে দিত বাঁধা দর্জি। ছিমছাম সাদামাটা দুর্গাপুজোয় কার প্রতিমা কত বড়, সেটাই ছিল দেখার। বাঙালদের অবসেশন হল খাওয়া। এবং খাওয়া বলতে মাছ। মাংস বা ডিম হত বলে মনে পড়ে না। আমাদের বামুনবাড়িতে তখন পেঁয়াজ-রসুনেরও চল ছিল না। তবে হ্যাঁ, বিক্রমপুরের রান্নার যে সুখ্যাতি আছে তা এমনি নয়।

ছবি: সুব্রত চৌধুরী

ছবি: সুব্রত চৌধুরী

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ০১:৩৪
Share: Save:

সে কি সুখের সময় ছিল? টক করে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলা যায় না। সুখ একটু ছিল বটে, তবে মুশকিলও ছিল। আমার ছেলেবেলার কথাই বলছি। গত শতকের চল্লিশের দশক। একেবারে গোড়ার দিকটায় যখন আমার বয়স মেরেকেটে চার বা পাঁচ, তখন এই এখনকার দুনিয়ার ছায়াপাতও ছিল না। আমাদের কাছে প্রযুক্তির সেরা জিনিস বলতে ছিল চোঙাওয়ালা গ্রামোফোন আর হ্যারিকেন সাইকেল এই সব। বিপণনে তখন ‘মল’ ছিল স্বপ্নেরও অগোচর। আর বাড়ির মেয়েরা কদাচ দোকানপাটে যেত না। রাস্তাঘাটেও মহিলাদের সঞ্চরণ ছিল বিরল। শুধু স্কুল-কলেজে যাতায়াতের পথে তাদের দেখা যেত।

সেই তখন সঙ্গে মুটে নিয়ে বা নিজেই বোঁচকা ঘাড়ে করে শাড়ির ফেরিওয়ালা আসত বাড়িতে, বোঁচকা খুলে তাঁতযন্ত্রের সম্ভার বিছিয়ে দিত আর বাড়ির তো বটেই, পাড়াপড়শি মহিলারা মৌচাকের মৌমাছির মতো ছেঁকে ধরত তাকে। ঘণ্টা কয়েক গলদঘর্ম হয়ে চলত শাড়ি বাছাই পর্ব। তবে তখন তেমন ভ্যারাইটিও ছিল না। কলকাতার মেট্রো সিনেমার আদলে ছাপ-ছক্করওয়ালা পাড়ের শাড়ির কথা খুব শুনেছি, মেট্রো প্যাটার্ন। তখন সেটাই ছিল চূড়ান্ত আধুনিকতা। সিঁথির সিঁদুর আর টিকেয় আগুন গোছের শাড়ির কথাও কানে এসেছে। সেটা ছিল লাল আর কালোর কম্বিনেশন। শুনতাম আড়াই টাকা, তিন টাকার শাড়ি মানে বেশ ভাল জাতের শাড়ি। আমার মায়ের বিয়ের বেনারসি কেনা হয়েছিল আঠেরো টাকায়। তা বলে সেটা সস্তার যুগ ছিল বলে মনে করার কোনও কারণ নেই। টাকার মূল্যমান তখন বেশ উঁচুতে ছিল বলেই আজকের নিরিখে সস্তা মনে হয়। এই মনে হওয়াটাই ভুল। বুড়ো মানুষেরা অনেকেই সেই সস্তার যুগের কথা বলতে গিয়ে হাহাকার করেন। সেই হাহাকারটাও এক বিভ্রান্তি ও নস্টালজিয়াবশত। বরং অর্থনীতির নিরিখে সে যুগের চেয়ে এ যুগে অনেক কিছুই সস্তা।

তখন শাড়ির মতো ছিটকাপড়ের বোঁচকা নিয়েও ফেরিওয়ালা আসত। ফ্রক বা জামাপ্যান্টের জন্য থান নিয়ে। বালক-বালিকাদের তখনও ফ্যাশন সম্পর্কে সচেতনতা জাগ্রত নয়। বাড়ির ছেলেরা একই ছিটের জামা পেত, মেয়েরাও পেত একই ছাপ-ছক্করওয়ালা ফ্রক। বাড়ির বাঁধা দর্জি তৈরি করে দিত। কখনও কখনও পুরুষেরা দোকান থেকেও পরিধেয় আনতেন বটে তবে তখন কেনাকাটার এ রকম মহোৎসব ছিল না। কম জিনিসে জীবনযাপনে আমরা রপ্ত ছিলাম। পুজোর সময় কোনও পুজোসংখ্যাও কেনা হত না। আর পুজোসংখ্যা বেরোতও খুবই কম এবং তা আমাদের পূর্ববঙ্গের মফস্সলে পাওয়াও যেত না।

বাঙালদের অবসেশন হল খাওয়া। এবং খাওয়া বলতে মাছ। মাংস বা ডিম হত বলে মনে পড়ে না। আমাদের বামুনবাড়িতে তখন পেঁয়াজ-রসুনেরও চল ছিল না। তবে হ্যাঁ, বিক্রমপুরের রান্নার যে সুখ্যাতি আছে তা এমনি নয়। আমরা মা-জেঠিমা-ঠাকুমার হাতে যে-রান্না খেয়েছি, তা ধ্রুপদী।

পূর্ববঙ্গ ছেড়ে বাল্যবয়সেই আমি মা-বাবার সঙ্গে কলকাতায় চলে আসি। কলকাতা অন্য রকম। এখনকার মতো না হলেও তখন মেয়েদের পথেঘাটে বিচরণ করতে দেখা যেত। তবে খুবই কম সংখ্যায়। দোকানপাটে কেনাকাটার ব্যাপারে তখনও মেয়েরা বড় একটা যেত না। কলকাতাতেও ফেরিওয়ালাদের দেখা যেত দেদার।

তখন আমি বা আমার মতো ছেলেমেয়েরা বড় হচ্ছি। বছর বছর আমাদের জামা-জুতোর সাইজ বাড়ছে। কাজেই অবধারিত ছিল পুজোর সময় নতুন জুতো কেনা। আর জুতো কেনার মতো আনন্দ আর কিছুতেই ছিল না। তাও তেমন বাহারি কিছু নয়, সেই তৎকালীন বাটা কোম্পানির ‘নটি বয় শু’। দারুণ মজবুত হত, দু’জেনারেশন অনায়াসে পরতে পারত। নতুন জুতো এতই প্রিয় ছিল যে, বহু বার গন্ধ শুঁকতাম, বালিশের পাশে রেখে ঘুমোতামও। কিন্তু কর্মস্থলে পায়ের সঙ্গে জুতোর সম্পর্কই ছিল না। খালি পায়েই ঘুরতাম সর্বত্র। অসংখ্য বার পায়ে কাঁটা, পেরেক, কাচ ফুটে ক্ষতবিক্ষত হয়েছি। তবু জুতো পায়ে দেওয়ার কথা মনেই হত না। আর তখন বাচ্চাদের চটি পরারও কোনও রেওয়াজ চালু হয়নি। হাওয়াই চটির আবিষ্কারও হয়নি তখন।

সেটা সাহেব আমল এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। আর সেটা খুব একটা সুখের সময় নয়। সারা শহরে স্থায়ী ব্ল্যাক আউট, মাঝে মাঝেই সাইরেন বাজে, যুদ্ধবিমান উড়ে যায়। হিটলার আর চার্চিলের নাম তখনই জানা হয়ে গিয়েছিল। কেনাকাটার পক্ষে সেটা খুব ভাল সময় ছিল না। তবু পুজোর সময় জামা জুতো পেতাম ঠিকই। যৌথ পরিবার না থাকায় তখন অবশ্য আর পাইকারি হারে তৈরি করা এক রকমের জামা পরতে হত না। তবে দামি বা বাহারি জামা আমাদের কখনওই জোটেনি, আর তা নিয়ে আপশোসও কিছুই ছিল না। যত দূর মনে পড়ে, আমার মায়েরও তেমন জমকালো শাড়ি ছিল না। খুব কমই ছিল আমাদের। লোভও ছিল কম। আমার আর আমার দিদির বোধহয় সর্বমোট তিন-চারটে জামা আর ফ্রক ছিল, যেগুলো মাপে ছোট হয়ে গেলে মা গরিব-দুঃখীকে দিয়ে দিত।

এর পর আমরা চলে যাই কাটিহারে। বেশ সুন্দর জায়গা ছিল সেটা তখন। তবে দোকানপাট তেমন নেই। যদিও সেই আমলে লোকের তেমন মুক্তকচ্ছ হয়ে কেনাকাটার বাইও ছিল না। সেই কারণেই দোকানপাট সর্বত্রই কম ছিল। আমাদের বেশিটাই খরচ হত খাওয়াদাওয়ায়। কারণ বাঙালরা বড্ড খেতে ভালবাসে। ময়মনসিংহে থাকতে আমাদের বাড়িতে মাছ হত বটে, কিন্তু মাংস বা ডিম হতই না। পেঁয়াজ রসুন ছিল বারণ। পরে অবশ্য ও-সব খেয়েছি।

একটা কথা বলে নেওয়া ভাল। ময়মনসিংহে দুর্গাপুজোর সময় বলি-দেওয়া পাঁঠার মাংস বাড়িতে আসত এবং তা রান্না করা হত পেঁয়াজ রসুন ছাড়া ধনে-জিরে-হলুদবাটা দিয়ে। টম্যাটোর চল ছিল না, ভিনিগার কী বস্তু, তা আমরা জানতামই না। ছেলেবেলায় আমরা আটার রুটি বা পোস্ত-চচ্চড়ি খাইনি কখনও। বাঙালদের দেশে ও-সবের তেমন চলও ছিল না। আর রেস্তরাঁয় বসে খাওয়া? সেটা আবার কী জিনিস? অবশ্য কলকাতার ‘সাঙ্গুভ্যালি’ বা ‘বসন্ত কেবিন’-এর কথা আবছা শুনতাম বটে, কিন্তু ও কালচারটা আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল। বিহার ছেড়ে উত্তরবঙ্গ আর অসমের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে যখন বাবার বদলির চাকরির সূত্রে ঘুরে বেড়িয়েছি, তখনও রেস্তরাঁ জিনিসটার সঙ্গে আমাদের পরিচয়ই ঘটেনি। তবে হ্যাঁ, সাহেবদের আমল বলে কথা! রেলের সরাবজি-র যে রেস্তোরাঁ ছিল, তার ভুবনবিখ্যাত চপ-কাটলেট বিস্তর খেয়েছি—যার স্বাদ আজও ভোলা যায়নি। আর হ্যাঁ, পাঁউরুটি-টোস্ট আর মাখন ছেলেবেলায় প্রায় নিয়মিত বাড়ির জলখাবার ছিল।

দুর্গাপুজো নিয়ে যে উন্মাদনা, থিম পুজোর যে ঘটাপটা, তা ছিল স্বপ্নের অগোচরে। ছেলেবেলায় শুধু নজর থাকত, কার প্রতিমা কত বড় হয় তার দিকে। সেই জন্যই দমকলের পুজোয় ভিড় হত সাংঘাতিক। কারণ, তাদের প্রতিমা হত বিশাল।

এখনও আবার দেখি, শাড়ির ফেরিওয়ালা বাড়িতে আসে না বটে, কিন্তু অনেকটা সে রকমই বাড়ি বসে কেনাকাটার জন্য অনলাইন বাজার চালু হয়েছে। সবজি, মাছ, মশলাপাতি, শাড়ি এবং গয়না ইত্যাদি ঘরে বসেই দিব্যি কেনা যায়। তা আবার পছন্দ না হলে ফেরতও দেওয়া যায়। এ রকম সুবন্দোবস্ত আমরা অতীতে দেখিনি।

অতীতের সব কিছুই প্রশংসার যোগ্য, এমন বিশ্বাস আমার নেই। বরং এই আধুনিক ঝকমকে যুগটাকে আমি অনেক বেশি পছন্দ করি। বেঁচে থাকাটাকে অনেকটাই নিষ্কণ্টক করার চেষ্টা করছে নানা সুব্যবস্থা। কেনাকাটা যোগাযোগ, টাকার লেনদেন, দুনিয়ার চটজলদি খবর, বাংলা তারিখ বা তিথি, সব এক ঝটকায় হয়ে যায়। হারানো বন্ধু, বিস্মৃত প্রেমিকা, ভুলে যাওয়া নাম, সব ফেরত পাওয়া যায়। চ্যাপলিন বা হিচককের সিনেমা, পল রবসনের গান, পিকাসোর ছবি, জটিল ঠিকানা, ভূগোল, ইতিহাস— হাতের মুঠোয় কী চাই!

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:
Advertisement

Share this article

CLOSE