Advertisement
E-Paper

আকাশের ঠিকানায় ঘরহীন চিঠিরা

চিঠি লিখেই ভালবাসা, চিঠি লিখেই বিয়ে হয়েছিল স্নেহময় আর মিয়াগি‌’র। কুণাল বসুর ‘দ্য জাপানিজ ওয়াইফ’ গল্পে সুন্দরবন আর জাপানের মধ্যে সতেরো বছরের দাম্পত্য বেঁচে ছিল শুধু চিঠির আদানপ্রদানে। চিঠিরা ভাগ্যিস পথ হারায়নি!

পারিজাত বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০৪:০৪

চিঠি লিখেই ভালবাসা, চিঠি লিখেই বিয়ে হয়েছিল স্নেহময় আর মিয়াগি‌’র। কুণাল বসুর ‘দ্য জাপানিজ ওয়াইফ’ গল্পে সুন্দরবন আর জাপানের মধ্যে সতেরো বছরের দাম্পত্য বেঁচে ছিল শুধু চিঠির আদানপ্রদানে। চিঠিরা ভাগ্যিস পথ হারায়নি!

কিন্তু সব চিঠির ভাগ্য তো সমান নয়! ‘সমাপ্তি’র কাহিনি যেমন!

‘‘অপূর্ব বলিয়া গিয়াছিল, তুমি চিঠি না লিখিলে আমি বাড়ি ফিরিব না। মৃন্ময়ী তাহাই স্মরণ করিয়া একদিন ঘরে দ্বার রুদ্ধ করিয়া চিঠি লিখিতে বসিল।...লেফাফায় নামটুকু ব্যতীত আরও যে কিছু লেখা আবশ্যক, মৃন্ময়ীর তাহা জানা ছিল না।... বলা বাহুল্য এ পত্রের কোনো ফল হইল না, অপূর্ব বাড়ি আসিল না।’’

কিন্তু পরিচারিকার হাত দিয়ে মৃন্ময়ী তো ডাকবাক্সে ফেলেছিল সে চিঠি! কী হল তার অপটু অক্ষরের?


রয়েছে শুধু বেহালা ও কৃষ্ণের ছবি।

ডাক বিভাগের কর্মীরা বলবেন, সে চিঠি নিশ্চয়ই জমা হয়েছিল ‘রিটার্নড লেটার অফিসে’। ‘রিটার্নড লেটার অফিস’ বা মৃত চিঠির দফতর। প্রতিটি রাজ্যেই ডাক বিভাগের এমন একটি দফতরে পথভ্রষ্ট বা ঠিকানাহীন চিঠিরা এসে জমা হয়। কিছু দিন অন্তর অন্তর পুড়িয়েও ফেলা হয় তাদের। এ রাজ্যের দফতরটি রয়েছে বিবাদী বাগ এলাকায়। সেখানেই দিশাহীন চিঠির স্তূপ হাতড়ে একবার পাওয়া গিয়েছিল তাজমহল আঁকা একটি চিঠি। ভারতের জনৈক প্রবীণ চিঠিটি পাঠাচ্ছেন চিনের ঝিহাং-এর কাছে। কিন্তু খুঁজে পাওয়া যায়নি ঝিহাংয়ের আসল ঠিকানা। চিনা ডাকবিভাগের ছাপ নিয়ে ফেরত আসে চিঠি। চিঠিতে প্রবীণের নিজেরও ঠিকানা ছিল না। ফলে তাঁর কাছেও সেই চিঠি ফেরত পাঠানো যায়নি। কিছুদিন বেওয়ারিশ গাদায় পড়ে থেকে তার পর একদিন দেড়শো বছরের পুরনো বাড়িটার ছাদে আগুনে পুড়ে গেল সে।

ডাক বিভাগের কর্তারাই জানালেন, বারো-তেরো বছর আগেও এই রাজ্যে ফেরত আসা চিঠির সংখ্যা লাখ ছাড়াত। ২০০৩-০৪ সালে যেমন ফেরত এসেছিল ১ লাখ ২৭ হাজার চিঠি। চিঠি লেখার অভ্যেস কমার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সেই সংখ্যাটা

ক্রমশ কমেছে। এখন মাসে ২-৩ হাজার চিঠি ডাকবিভাগের কাছে ফেরত আসে। বছরে সংখ্যাটা দাঁড়ায় আনুমানিক ২৪-৩৬ হাজার। গত ৪ সেপ্টেম্বরই এই রকম ২৮ হাজার চিঠি পুড়িয়ে দিয়েছে ডাক বিভাগ। তার কয়েক দিনের মধ্যেই ফের হাজার দেড়েক ‘রিটার্নড’ চিঠি জমে গিয়েছে।

আর ভুল ঠিকানার জেরে চিনের ঝিহাং থেকে ফেরত চলে এসেছে এই চিঠি।

অগস্ট-সেপ্টেম্বরে লেখা কয়েকটি চিঠির কথাই ধরা যাক। বালাসোরের এক লোগান সিংহ পশ্চিম মেদিনীপুরের বেলদার এক স্টুডিও থেকে তির-ধনুক হাতে নেওয়া ছবি তুলে একটি চিঠির সঙ্গে পাঠিয়েছেন। সেই চিঠির উপর ‘ডক্টর্স কোর্ট’ ছাড়া আর কোনও শব্দই বোধগম্য হচ্ছে না। হরফগুলি ইংরেজি, কিন্তু ভাষা দুর্বোধ্য। ঠিকানার জায়গাতেও একই দশা। ফলে চিঠি প্রাপকের কাছেও যায়নি বা প্রেরককেও ফেরত পাঠানো যায়নি। কিংবা জনৈক একতা’র চিঠি। তাতে অতি যত্নে ভরা রয়েছে একটি রাখি, মেওয়ালাল জগহরি নামে তার এক ভাইয়ের জন্য। একতার ঠিকানা দেওয়া নেই। আর মেওয়ালালের ঠিকানার জায়গায় শুধু লেখা, ‘পাওয়ার হাউস, পশ্চিম বঙ্গাল!’ ফলে সেই রাখি মেওয়ালাল হাতে পাননি।

চিঠি না হয় টুকরো কাগজ মাত্র। যদি আস্ত পার্সেল ফেরত আসে? তা হলে কিছু বছর পরপর সেগুলি নিলামের ব্যবস্থা করা হয়। যে টাকা ওঠে, তা চলে যায় সরকারি কোষাগারে। ডাক বিভাগ জানাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের ‘রিটার্নড লেটার অফিসে’ বিলি না-হওয়া পার্সেল নিলাম করে ২০০৯ সালে আয় হয়েছিল প্রায় ১৬ হাজার টাকা। ২০১৩ সালে প্রায় ৭৮ হাজার টাকা।

কিন্তু যাঁদের চিঠি বা পার্সেল ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় পৌঁছল না, তাঁদের মনের অবস্থা কেমন হয়? উদাহরণ হতে পারে প্রমথ চৌধুরীকে লেখা ইন্দিরা দেবীর চিঠি— ‘কাল বিকেলে তোমার চিঠি না পেয়ে বড় বিশ্রী লাগছিল। আজ যদি সকালে না আসত ত এখন যে চিঠি লিখচি তাতে আরম্ভেতেই আর এক সুরে দু’চার কথা শুনতে পেতে।...তুমিও আমার চিঠি যথাসময়ে না পেয়ে কষ্ট পেয়েচ? বেশ হয়েচে, খুব হয়েচে...।’

চিঠি হাতে না-আসা বা মাঝপথে হারিয়ে যাওয়ার এই যন্ত্রণা সম্পর্কে ডাকবিভাগও সচেতন। কখনও বিভাগীয় গোলমালে চিঠি মাঝপথে বেপাত্তা হওয়ার ঘটনা ঘটে বটে! তবে পোস্টমাস্টার জেনারেল (কলকাতা রিজিয়ন) সুব্রত দাসের কথায়, ‘‘আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করি চিঠি বা পার্সেল গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার বা প্রাপককে না পেলে অন্তত প্রেরকের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার। কিন্তু অনেক সময় ঠিকানাই থাকে না। বা ঠিকানার জায়গাটা জলে মুছে যায় বা ছিঁড়ে যায়। একেবারে উপায়ান্তর না থাকলে তবেই সেই চিঠিকে ‘রিটার্নড’ গণ্য করে পোড়ানো হয়।’’

কী কী অসাধ্য সাধন করে ডাকবিভাগ চিঠি পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করে, তারও বিচিত্র উদাহরণ মজুত কর্তাদের কাছে। এমন সব চিঠি তাঁদের হাতে আসে, যার ঠিকানা খুঁজতে তাঁদের রীতিমতো ফেলুদা-ব্যোমকেশ হয়ে উঠতে হয়। যেমন, ঠিকানায় ‘বেহালা’ লেখার বদলে বেহালা এঁকে দেওয়া, কৃষ্ণনগরের জায়গায় কৃষ্ণঠাকুর আঁকা, সাতগাছিয়ার বদলে আঁকা পরপর সাতটা গাছ! জলপাইগুড়ির জায়গায় অনেকে লিখে দেন ‘ওয়াটারপাইগুড়ি’। অনেকে এর থেকেও বেশি ধাঁধা ভালবাসেন। তাঁরা নাম ও ঠিকানা লেখেন সাঙ্কেতিক ভাষায়। ইংরেজিতে ১, ২ লিখে! দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় ডাককর্মীরা এখন জানেন ১ হল A, ১০ হল J। এই সঙ্কেত ভেদ করে ক’দিন আগে ওড়িশার সুন্দরগড় জেলায় জনৈক দাউদ টপনো-কে চিঠি দিয়েছেন তাঁরা। মাইকেল গডওয়েল নামে এক জন সম্প্রতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে চিঠি পাঠিয়েছিলেন! সেই চিঠি পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের হাতে।

ডাকঘরটি চিনতে ভুল করেননি পোস্টমাস্টার!

letters return
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy