Advertisement
E-Paper

চেনা কামার আছে আমাদের

কী ভাবে, কী হয়। —নিজস্ব চিত্রপ্রতি পিসের দাম ২০ টাকা। ১০টির বরাত দিলে আগাম দিতে হয় ১০০ টাকা। সে বরাত আবার যে কোনও সময়ে দেওয়া চলে না। হয় ভোর-ভোর, নয় সন্ধ্যায়। ‘মাল’ তৈরি হয়ে গেলেও দেওয়া-নেওয়া হাতেহাতে নয়। ছাইয়ের গাদায় রাখা থাকে। গাদা ঘেঁটে তা বার করে নেওয়ার সময় সেখানেই রেখে আসতে হয় ‘রোকড়া’।

সমীর দত্ত

শেষ আপডেট: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০২:২০
কী ভাবে, কী হয়। —নিজস্ব চিত্র

কী ভাবে, কী হয়। —নিজস্ব চিত্র

প্রতি পিসের দাম ২০ টাকা। ১০টির বরাত দিলে আগাম দিতে হয় ১০০ টাকা। সে বরাত আবার যে কোনও সময়ে দেওয়া চলে না। হয় ভোর-ভোর, নয় সন্ধ্যায়। ‘মাল’ তৈরি হয়ে গেলেও দেওয়া-নেওয়া হাতেহাতে নয়। ছাইয়ের গাদায় রাখা থাকে। গাদা ঘেঁটে তা বার করে নেওয়ার সময় সেখানেই রেখে আসতে হয় ‘রোকড়া’।

‘ফালি’ তৈরির এই পদ্ধতি জানাচ্ছেন যিনি, তিনি নিজেই পুরনো ‘ফালিবাজ’। বাড়ি হুড়া থানা এলাকায়। কোথায় বানান ‘ফালি’ জানতে চাইতেই চুপ। অনেক অনুরোধে জবাব এল, ‘‘চেনা কামার আছে আমাদের।’’

কামারদের হাতযশই ভরসা ‘ফালি’ (ছ’ইঞ্চির লোহার ফলা) বানাতে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে গাড়িতে টিউববিহীন চাকার ব্যবহার যত বাড়ছে, তত কমছে ‘শিকার’ ধরার সম্ভাবনা— জানাচ্ছেন পুঞ্চা এলাকার আর এক ‘ফালিবাজ’। তাঁর হতাশা, ‘‘ফালি লাগলেও টিউবলেস টায়ারের গাড়ি না থেমে অনেক দূর চলে যায়। মাঝখান থেকে ফালিটাই বরবাদ।’’

Advertisement

জেলার নানা প্রান্তে ‘ফালিবাজ’দের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, ‘ফালি’ বসানোর নির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে। সে অনেক কাণ্ড। প্রথমে জায়গা বাছাই। এমন জায়গা যেখানে শিকার ফাঁসলে, চট করে পুলিশ চলে আসার সম্ভাবনা নেই। তার পরে বাছাই করা জায়গায় পিচের রাস্তার উপরে ঠুকে ঠুকে ফালি বসানো হয়। এমন ভাবে বসানো হয়, যাতে গাড়ির চারটে চাকার একটা না একটায় ‘ফালি’ লাগবেই।

পুঞ্চার ‘বিশেষজ্ঞ’ বললেন, ‘‘শুধু ফালি বসালেই কাজ শেষ হয় না। গাড়ির চালক যাতে দূর থেকে বুঝতে না পারে, সে জন্য অনেক সময় ফালির উপরে গোবরের ডেলা (কখনও গাছের ডাল) ফেলে রাখা হয়, যার পরে কালো পিচের উপরে বসানো ফালি দূর থেকে শিবের বাবাও বুঝতে পারবে না।’’

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ‘ফালিবাজ’দের দলে পাঁচ-সাত জন থাকে। ফালি, শাবল, কুঠার, লাঠি, টর্চ থাকে সদস্যদের হাতে। ‘শিকারের’ গাড়ির জন্য অপেক্ষার জায়গা বলতে জমির আল বা কালভার্টের তলা। চাকা ফেঁসে গাড়ি দাঁড়ালেই হামলা করাটা দস্তুর। অভিজ্ঞতা এমনই হুড়ার বাসিন্দা শিক্ষক কমলেশ মাহাতোর (নাম পরিবর্তিত)। কয়েকবছর আগে রাতে রাস্তায় পড়ে থাকা গাছের ডালের উপরে দিয়ে গাড়ি নিয়ে যেতেই চাকার হাওয়া ফুস। কোনওমতে রাস্তার এক পাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে নীচে নেমে নজর করতেই চোখে পড়ে চাকায় বিঁধে রয়েছে ‘ফালি’। কিছুটা দূরে জমির পাশ থেকে রাস্তার দিকে উঠে আসছে অনেকগুলো টর্চের আলো। ঘটনাচক্রে পুলিশের টহলদার ভ্যান ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানে গিয়ে পড়ায় নিশ্চিত হামলার হাত থেকে বেঁচে যান শিক্ষক।

‘‘তবে সবার এত সৌভাগ্য হয় না’’, বলছেন এলাকাবাসী। তাঁদের ক্ষোভ, পুলিশি টহলদারি নিয়ে। ‘সিভিক ভলান্টিয়ার’দের নজরদারির কাজে ব্যবহার করায় ‘ফালিবাজ’দের উৎপাত কমে যাওয়ার যে দাবি জেলা পুলিশের কর্তারা করেন, তা খারিজ করে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ‘‘হুড়া বা বোরোর অনেক জায়গাতেই সিভিক ভলান্টিয়ারদের নজরদারি নেই। ‘ডিউটি’ দেওয়া হলেও, তাঁরা ঠিকঠাক নজরদারি করছেন কি না, সে দিকে নজরও নেই পুলিশের।’’ পুলিশ এ অভিযোগ মানেনি।

তবে ঘনিষ্ঠ মহলে জেলা পুলিশের একাধিক কর্তা মেনেছেন, থানা এলাকাভিত্তিক নজরদারির বদলে সম্মিলিত নজরদারির কৌশল নেওয়া হলে ‘ফালিবাজ’দের রুখতে বিশেষ সময় লাগবে না। বিশেষ করে বোরো থানা এলাকায় যেখানে ‘ফালি’র উৎপাত ঘটছে, সেখানে পৌঁছনো মানবাজার বা বরাবাজার থানার পুলিশের পক্ষে তুলনামূলক সহজ। সে জন্য ওই থানাগুলির মধ্যে সমন্বয় রাখা জরুরি।

জেলার পুলিশ সুপার রূপেশ কুমার বলেছেন, ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলেও ফালির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ফালি-কাণ্ড বাড়তে দেব না।’’

পুলিশ সুপারের এ হেন দাবির পরেও বুকে বল পাচ্ছেন না স্থানীয় বাসিন্দারা। বরং মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ‘‘ছিনতাইয়ের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হলেও গাড়ির চাকায় ফালি লাগায় অকুস্থলে পৌঁছতে পারেনি জেলা পুলিশ। এমন নজিরও আছে কিন্তু।’’(শেষ)

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy