তাঁকে অশ্বমেধের ঘোড়া করে বিধানসভা ভোটের অনেক আগে থেকে ঘনঘন উত্তরবঙ্গে ছুটিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তারই ফল পেয়ে মুর্শিদাবাদের মতো অধরা জেলাতেও ৩২% ভোট পেয়েছিল তৃণমূল। অথচ সেই শুভেন্দু অধিকারী কি না ঘরের মাঠেই গোল খেয়েছিলেন তিন-তিনটে! পূর্ব মেদিনীপুরের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা, তখনও তমলুকের সাংসদ। কিন্তু নিজের লোকসভা কেন্দ্রের আওতায় তিনটি বিধানসভা আসনে হারের মুখ দেখতে হয়েছিল দলকে!
নন্দীগ্রাম বিধানসভা আসনে জিতে এখন রাজ্যে পরিবহণমন্ত্রী শুভেন্দু। তিনি সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ায় তমলুক লোকসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে তাঁর ভাই দিব্যেন্দু অধিকারী প্রার্থী হয়েছেন। তবে হলদিয়া-তমলুক জানাচ্ছে, আসলে ছায়াপ্রার্থী এ বারও শুভেন্দুই! পোস্টারে, ব্যানারে, দেওয়াল লিখনে দিব্যেন্দুর নাম থাকলেও বিধানসভা ভোটের ক্ষত মেরামত করে মর্যাদা ফেরানোর লড়াই পরিবহণমন্ত্রীরই।
কী ভাবে? তমলুক লোকসভা কেন্দ্রের আওতায় ৭টি বিধানসভা আসনের মধ্যে তৃণমূল হেরেছিল হলদিয়া, তমলুক এবং পাঁশকুড়া পূর্বে। এর মধ্যে হলদিয়ায় হারের ব্যবধান ছিল ২১ হাজারের একটু বেশি। পাঁশকুড়া পূর্বে প্রায় পাঁচ হাজার ভোটে এবং তমলুক বিধানসভা কেন্দ্রে মাত্র ৫২০ ভোটে পরাস্ত হয়েছিল শাসক দল। যদিও এর পরেও ৭টি বিধানসভা মিলিয়ে তমলুক লোকসভায় ৯৪ হাজার ভোটে এগিয়েছিল তৃণমূল। এর মধ্যে নন্দীগ্রামেই শুভেন্দুর জয়ের ব্যবধান ছিল ৮১ হাজার। কিন্তু অধিকারী পরিবারের ঘনিষ্ঠ সূত্রে বলা হচ্ছে, ব্লক স্তরের প্রতিটি নেতাকে ডেকে শুভেন্দু পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়েছেন, উপনির্বাচন বলে গা-ছাড়া দিলে চলবে না। ৭টি বিধানসভার মধ্যে ৭টিতেই এ বার তাঁর ‘লিড’ চাই। জয়ের ব্যবধান হওয়া চাই কম করে দু’লক্ষ। তা ছাড়া, উপনির্বাচনকে তিনি এতটাই ব্যক্তিগত লড়াই করে নিয়েছেন যে, দলের রাজ্য স্তরের অন্য কোনও নেতাকে প্রচারের জন্য বিশেষ আহ্বানও জানাচ্ছেন না পরিবহণমন্ত্রী!
দলীয় সূত্রে বলা হচ্ছে, তমলুক-হলদিয়ায় দলের সাংগঠনিক ত্রুটি ঠিক করতে বিধানসভা ভোটের পর থেকেই সক্রিয় শুভেন্দু। তৃণমূলের অনেকের মতে, দলীয় অন্তর্ঘাতের কারণেই বিধানসভায় হলদিয়া ও পাঁশকুড়ায় হেরেছিলেন তাঁরা। এর মধ্যে হলদিয়ায় হার শুভেন্দুকে সব চেয়ে বেশি বিঁধেছে। তাই সবার আগে সেখানে ঘর গুছিয়েছেন তিনি। নিচু তলায় সন্দেহভাজন কিছু নেতার দায়িত্ব ঘরোয়া ভাবে কমিয়ে ‘ভরসাযোগ্য’ কিছু নতুন মুখকে ইদানীং তলে তলে গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। ব্লক ও বুথ ধরে ধরে কোথায় কত ভোট কমেছে, তার হিসেব কষে সেখানে বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষে পৌঁছে যাচ্ছেন সশরীর। দলে বিবদমান গোষ্ঠীগুলির মধ্যে কোন্দল থামিয়ে একসঙ্গে ভোটের প্রচারেও নামিয়েছেন। যেমন, তমলুকের শহীদ মাতঙ্গিনী ব্লকে বিধানসভা ভোটে ৮ হাজার ভোটে পিছিয়ে ছিল তৃণমূল। স্থানীয় দুই নেতা জয়দেব বর্মণ ও দিবাকর জানার মধ্যে অন্তর্কলহের দিকে অনেকের আঙুল ছিল বলে সম্প্রতি ওই দু’জনকে একসঙ্গে নিয়ে বসেন শুভেন্দু।
সাংগঠনিক ভাবে ক্ষত মেরামতের চেষ্টা করেই থেমে থাকছেন না পরিবহণমন্ত্রী। তাঁর দফতরকে কাজে লাগিয়ে হলদিয়া-তমলুকে একগুচ্ছ পরিষেবাও শুরু করেছেন তিনি। যেমন, নন্দীগ্রাম থেকে কলকাতা পর্যন্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সরকারি বাস পরিষেবা শুরু করেছেন। হলদিয়া-কলকাতা সরকারি বাস পরিষেবা বাড়িয়েছেন। মেচেদা সেন্ট্রাল বাসস্ট্যান্ডের কাজ প্রায় শেষ করে এনেছেন। কুকরাহাটি ফেরিঘাটের সংস্কারেও হাত লাগিয়েছেন। তার পরে ইদ-দুর্গা পুজোয় ৩০ হাজারের বেশি শাড়ি, ধুতি, লুঙ্গি বিতরণ তো রয়েছেই।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে অবশ্য তমলুকে তৃণমূলের লড়াই এ বার গত ভোটের থেকে সহজ। কারণ, কংগ্রেস ও বামেদের মধ্যে সমঝোতা ভেস্তে গিয়েছে। তমলুক, পাঁশকুড়ায় কংগ্রেসের ভাল ভোট রয়েছে। বিরোধী ভোট ভাগাভাগির জন্য এমনিই সুবিধা পাওয়ার কথা তৃণমূলের। আবার হলদিয়ায় প্রাক্তন সিপিএম নেতা লক্ষ্মণ শেঠ সম্প্রতি বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। সিপিএম যাতে হলদিয়ায় হারে, তার জন্য সব রকম ভাবে চেষ্টা করবেন তিনিও। আরও উল্লেখযোগ্য, হলদিয়া, তমলুক, নন্দীগ্রামের মতো অঞ্চলে সংখ্যালঘু জনসংখ্যা এলাকা ভিত্তিতে কোথাও ২০%, তো কোথাও ৫০%-এর বেশি। কংগ্রেস-বামেরা রাজনৈতিক ভাবে দুর্বল হওয়ায় এই ভোটও তৃণমূলের দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেই অনেকের মত।
তবে এ সব সাত-পাঁচ অঙ্ক, গত ভোটের ব্যর্থতা কোনও বিষয়েই মন্তব্য করতে নারাজ শুভেন্দু। শুধু বলছেন, ‘‘ভোটের ফলাফলই প্রমাণ দেবে, তমলুক লোকসভায় তৃণমূলের ভিত কত মজবুত!’’