এক বিধানসভায় দুই তৃণমূল! মঙ্গলবার বাজেট অধিবেশনে রাজ্যপালের ভাষণের উপর আলোচনায় শাসক বিজেপি-কে তেমন কোনও ঝক্কিই পোহাতে হল না। বরং কালীঘাটের তৃণমূল বনাম বিদ্রোহী তৃণমূলের কটাক্ষ পাল্টা-কটাক্ষ এমন জায়গায় গেল, যা শুনে হেসে ফেললেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজেই।
অধিবেশনের গোড়ার দিকেই মঙ্গলবার বলতে ওঠেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-পন্থী বেলেঘাটার তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ। তিনি উঠতেই বিজেপি বিধায়কেরা ‘চোর-চোর’ স্লোগান দিতে শুরু করেন। পাল্টা কুণাল একটি গোপন ক্যামেরা অভিযানের প্রসঙ্গ তোলেন। কিন্তু তা কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন স্পিকার রথীন্দ্র বসু। তার পর কুণালও বলতে থাকেন, দফায় দফায় বাধাও তৈরি হয়। এক সময় কুণাল বলেন, ‘‘বন্ধুরা ভাল বলবেন, শত্রুরা খারাপ বলবেন। কিন্তু আমায় অস্বীকার করতে পারবেন না। নামটা মনে রাখবেন। কুণালকুমার ঘোষ!’’
এখানেই থামেননি কুণাল। বিদ্রোহী শিবিরের কান্ডারি তথা বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে থাকা পুরনো মহিলাঘটিত অভিযোগের কথাও তোলেন তিনি। তা-ও কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন স্পিকার। এর পর এক সময় সরাসরি স্পিকারের সঙ্গে সংঘাতে জড়ান কুণাল। গলা চড়িয়ে স্পিকারের উদ্দেশে বেলেঘাটার বিধায়ক বলেন, ‘‘আপনি এ ভাবে কথা বলতে পারেন না। আপনিও প্রথম বারের বিধায়ক।’’ সরকারি বেঞ্চ থেকে এর পর কুণালের উদ্দেশে প্রশ্ন ছোড়া হয়, স্পিকারের সঙ্গে এ হেন আচরণ কেন? কুণাল পাল্টা বলেন, ‘‘স্পিকার ওই রকম করলে তাঁকে রসগোল্লা খাওয়াব নাকি?’’ রাজ্যপালের ভাষণ উপর বক্তৃতায় কিছু নির্দিষ্ট বিষয় কুণাল বলার চেষ্টা করলেও মূলত তাঁর নিশানায় ছিলেন ঋতব্রতেরাই। কুণাল বলেন, ‘‘আমাদের সরকার নিশ্চয়ই ভুলভ্রান্তি করেছিল। কিন্তু আমরা বেইমান নই।’’
একেবারে শেষ বেলায় মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণের আগেই বক্তৃতা করেন ঋতব্রত। তিনিও স্বভাবসিদ্ধ ঢঙে ইতিহাস, সাহিত্যের প্রসঙ্গ টেনে বক্তৃতা শুরু করলেও নাম না-করে নিশানা করেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। ঋতব্রত বলেন, ‘‘বহু জায়গায় ক্যাঙারু কোর্ট আর খাপ পঞ্চায়েত চলছে। সাধারণ তৃণমূলকর্মীদের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হচ্ছে। একজন চার্টার্ড ফ্লাইটখ্যাত মাফিয়ার ঔদ্ধত্য এবং দুর্নীতির নেটওয়ার্কের জন্য যেন সাধারণ তৃণমূলকর্মীরা আক্রান্ত না-হন, তা সরকারকে সুনিশ্চিত করতে হবে।’’ এর পাশাপাশি ঋতব্রত মঙ্গলবার দেখাতে চেয়েছেন, তাঁর বা তাঁদের বিরোধিতা হবে গঠনমূলক। গোড়াতেই তিনি বলেন, ‘‘আমাদের সরকারের সময়ে যেমন রাজ্যপালের ভাষণে ‘জয়বাংলা’ লেখা ঠিক হয়নি, তেমন এখনও ‘ভয় আউট, ভরসা ইন’ লেখাও ঠিক হয়নি। এটাও রাজনৈতিক স্লোগান।’’
আরও পড়ুন:
কুণাল যখন ঋতব্রতদের নিশানা করেছেন, তখনও দেখা গিয়েছে নিজের আসনে বসে মুচকি হাসছেন মুখ্যমন্ত্রী। আবার অভিষেককে নিশানা করে যখন ঋতব্রত যখন পাল্টা ফিরিয়ে দিচ্ছেন, তখনও শুভেন্দুর অভিব্যক্তিতে বদল হয়নি। শুভেন্দুর বলার মাঝেই উঠে দাঁড়িয়ে কুণাল আর্জি জানান, তাঁর কিছু বলার আছে। হাসতে হাসতে শুভেন্দু বলেন, ‘‘বলুন আপনি।’’ তখন কুণাল বলেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী দুর্নীতিগ্রস্তদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করার যে কথা বলেছেন, তাকে সমর্থন করছি। কিন্তু তৃণমূলের সঙ্গে থেকে আজ যারা পিঠ বাঁচানোর চেষ্টা করছে, তাঁদের কেউ যেন ছাড় না-পায়।’’
মঙ্গলবারের অধিবেশনে কালীঘাট তৃণমূলের পক্ষে কুণাল ছাড়াও বলেন কালীগঞ্জের বিধায়ক আলিফা খাতুন। আবার ঋত-পন্থীদের দিক থেকে বক্তৃতা করেন সমর মুখোপাধ্যায়ের মতো প্রবীণ বিধায়ক। বক্তব্য পেশ করেছেন আইএসএফ, সিপিএম এবং কংগ্রেসের বিধায়কেরাও। তবে অধিবেশন সাক্ষী থাকল দুই তৃণমূলের তোপ-পাল্টা তোপে। ফাঁকা জমি পেল সরকার। হাসলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু।