যথেষ্ট হয়েছে। হুমায়ুন কবীরের মতো লোকজনকে ‘শিক্ষা’ দেওয়ার সময় এসেছে। সোমবার বিধানসভায় দাঁড়িয়ে এভাবেই নওদার বিধায়ককে হুঁশিয়ারি দিলেন শুভেন্দু অধিকারী। রেজিনগর এবং শক্তিপুরের কর্মসূচিতে যে ভাষণ দিয়েছিলেন হুমায়ুন, তার পরিপ্রেক্ষিতে কোন কোন ধারায় এফআইআর রুজুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা-ও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর মতে, নিজের ছেড়ে আসা রেজিনগর আসনে পুত্রকে উপনির্বাচনে প্রার্থী করে জিতিয়ে আনতে চান বলেই এ সব বলছেন হুমায়ুন। তবে এ ধরনের কথাবার্তা আর বলা যাবে না। হুমায়ুনকে ‘সংযত’ হতেও বলেন শুভেন্দু। আম জনতা উন্নয়ন পার্টি (এজেইউপি)-র বিধায়ক জানিয়েছেন, তিনি শুভেন্দুকে কিছু বলেননি। তাঁকে গ্রেফতার করতে হলে করবে।
সোমবার বিধানসভায় প্রথমে দু’টি কর্মসূচিতে হুমায়ুন যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তা পড়ে শোনান মুখ্যমন্ত্রী। তার পরেই বলেন, ‘‘দু’টি ঘটনার পরে মনে হয়েছে, এনাফ ইজ় এনাফ (যথেষ্ট হয়েছে)। সময় এসেছে এই ধরনের লোককে সবক শেখানোর।’’ সুর চড়িয়ে শুভেন্দু আরও বলেন, ‘‘আপনাকে পরিষ্কার বলছি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন (রাজ্যের) মুখ্যমন্ত্রী নন। আপনি দুর্বল মুখ্যমন্ত্রী পেয়ে যা খুশি করেছেন, বলেছেন।’’
তার পরেই শুভেন্দু স্পষ্ট করে দেন, তাঁর সরকার কী পদক্ষেপ করেছে। তাঁর কথায়, ‘‘আমি আপনাকে বলে গেলাম, দু’টি এফআইআর স্টার্ট করেছি।’’ মুখ্যমন্ত্রী জানান, ২৬ জুনের ঘটনায় রেজিনগর থানায় কেস ২১৯, ২২৬ রুজু হয়েছে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৫২, ১৯৬, ১৯৭, ২২৪, ২৯৯, ৩৫১ (২), ৩৫২, ৩৫৩ ধারার অধীনে। দ্বিতীয় ঘটনায় শক্তিপুর থানায় ১৭৬/২২৬ এ আর একটি মামলা রুজু করা হয়েছে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ধারা আরোপ করা হয়েছে বলে জানান শুভেন্দু।
মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, হুমায়ুন যে ভাষায় বক্তৃতা করেছেন, তা করার ক্ষমতা তাঁকে কেউ দেয়নি। তাঁর কথায়, ‘‘আপনাদের নিশ্চিত করছি, এত বড় ক্ষমতা (ওঁকে) কেউ দেয়নি।’’ কেন নওদার বিধায়ক এ সব বলছেন, তার কারণ ব্যাখ্যাও করেন শুভেন্দু। তাঁর কথায়, ‘‘কেন করছেন জানি, রাজনৈতিক কারণ জানি, দু’টি এজেন্ডা ছিল।’’ এর পরেই আরও বিশদে শুভেন্দু জানান, হুমায়ুনের প্রথম উদ্দেশ্য ছিল,ভরতপুর, রেজিনগর, নওদায় সব নির্বাচিত পঞ্চায়েত, তা সে যে দলেরই হোক, নিজের দলে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু তিনি তা করতে পারছেন না। হুমায়ুনের দ্বিতীয় উদ্দেশ্য নিয়ে শুভেন্দু বলেন, ‘‘বিধানসভা ভোটে দু’টি আসনে জিতেছেন। নিয়ম মেনে রেজিনগর আসন ছেড়ে দিয়েছেন। আগামী ২-৩ মাসে সেখানে ভোট হবে। ওই আসনে আপনি আপনার ছেলেকে জেতাতে চাইছেন।’’ শুভেন্দুর কথায়, ‘‘ওই আসনে ৭২ শতাংশ মুসলিম রয়েছেন। মুসলিম ভোট কনসোলিডেট (ঐক্যবদ্ধ) করার জন্য আপনি এই খেলা খেলছেন।’’ মুখ্যমন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘‘কান খুলে শুনে রাখুন, আপনাকে এ ভাবে হুমকি, বেপরোয়া, লাগামছাড়া কথা বলতে দেব না, দেব না, দেব না।’’
নাম না করে সন্দেশখালিতে শাহজাহান শেখ, ক্যানিংয়ে শওকত মোল্লা, ফলতার জাহাঙ্গির খানের কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন শুভেন্দু। প্রসঙ্গত, তিন জনেই এখন জেলে। তার পরেই শুভেন্দু বলেন, ‘‘পুলিশ তার ব্যবস্থা নিচ্ছে। এক সপ্তাহ পরে মুর্শিদাবাদ যাচ্ছি। ভারতের সংবিধান, আইন শেষ কথা বলে, বাতেলাবাজ শেষ কথা বলে না।’’ হুমায়ুনকে হুঁশিয়ারি দিয়ে শুভেন্দু এর পরে বলেন, ‘‘সংযত হোন। সতর্ক হোন। এ ধরনের কথা প্রত্যাহার করুন। ভবিষ্যতে এ ধরনের কথা বলার আগে ২৫ বার ভাববেন।’’ কী ভাবে পদক্ষেপ করা হবে, তা-ও জানিয়ে দিয়েছেন শুভেন্দু। তিনি বলেন, ‘‘হুঁশিয়ারি দিয়ে সকলকে আশ্বস্ত করছি। আপনারা ভাবছেন, কেস হয়েছে অ্যাকশন কবে হবে? যারা ওঁকে ডেকেছিল, তাদের আগে তুলব, তার পর আপনার কাছে যাব। যা করার করব, আমি আশ্বস্ত করছি। ধরে রাখুন এটা ওঁর শেষ বক্তব্য। এ সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে।’’
আরও পড়ুন:
হুমায়ুনের কোন বক্তব্যের জন্য এই পদক্ষেপ তা-ও বিধানসভায় পড়েছেন শুভেন্দু। তিনি বলেন, ‘‘মাননীয় হুমায়ুন কবীর যে বক্তৃতা করেছেন, তা পড়ে শোনাচ্ছি। ২৬ জুন বলেছেন। পার্টির মিটিং করেছেন রেজিনগরে। সেখানে তিনি বলছেন, ‘এই যে অনামিকা ঘোষ ভোটে হেরে মনে করছেন আমি এমএলএ। এখানে এখন আস্ফালন করে বেড়াচ্ছেন! তা আমি শুভেন্দুকে বলেছি, আপনি ভোটে জিতেছেন, আপনার দল জিতেছে ভাল কথা! মুর্শিদাবাদে আস্ফালনটা কম করবেন। আমি যে দিন ময়দানে মুসলমানদের নিয়ে নেমে যাব না, এমন স্যাঁটা ভাঙা মার শুরু করব, যে ময়দানে আপনাদের পতাকা বহন করার লোক থাকবে না। বহরমপুরের সেন্ট্রাল জেলের যা আয়তন, তাতে ৪৭০০-৪৮০০ জনের বেশি ধরে না। লাফিয়ে লাফিয়ে লোককে রাস্তায় নিয়ে নামাব, স্যাঁটাভাঙা মারব...।’’’ প্রসঙ্গত, ‘স্যাঁটা’ শব্দটির অর্থ অঞ্চলভেদে পৃথক। ভাষাতত্ত্ববিদ সত্রাজিৎ গোস্বামী বলছেন, ‘‘পুরুলিয়ায় শব্দটির অর্থ যৌনাঙ্গ। বীরভূম অঞ্চলে এটি শিরদাঁড়া বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। আবার বাংলাদেশের কুষ্ঠিয়া, পাবনার গ্রাম্যভাষায় এটি ধিক্কার বা ঘৃণার্থে ব্যবহৃত হয়।’’
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের পর হুমায়ুন বলেন, “আমি মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কিছু বলিনি। যাঁরা নবাগত বিজেপি, ৪ মে-র পরে যাঁরা বিজেপি হয়েছেন, তাঁরা যে ভাবে এলাকায় অশান্তি অত্যাচার করেছেন, তার বিরুদ্ধে বলেছি। তাতে যদি আমাকে গ্রেফতার করা হয়, হবে। আমি তো এই লোকগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করে নতুন দল তৈরি করেছি। জিতেছি।’’