Advertisement
E-Paper

ঠাকুরভাইদের বক্তব্যে আশঙ্কা, শাহের বক্তব্যে ‘জবাব’ মেলেনি! মতুয়া ভোটারদের উদ্বেগে চাপে বিজেপি, ময়দানে হাজির শুভেন্দু

মতুয়া তথা শরণার্থীদের বিষয়ে ‘আশ্বাসবাণী’ ইতিমধ্যেই শুনিয়েছেন মোদী এবং অমিত শাহ। গত ২০ ডিসেম্বর খারাপ আবহাওয়ার কারণে তাহেরপুরের সভায় যেতে না-পেরে মোদী কলকাতা বিমানবন্দরে বসে ফোনে ভাষণ দিয়েছিলেন।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ ২০:৫৭
Suvendu Adhikari takes the stage to address Matua issue as pressure mounts on BJP in refugee areas

(বাঁ দিকে) অমিত শাহ, শুভেন্দু অধিকারী (ডান দিকে)। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

বার বার ‘পাশে থাকা’র বার্তা। কখনও প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে, কখনও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তরফ থেকে। হিন্দু উদ্বাস্তু বা শরণার্থীদের ‘কোনও চিন্তা নেই’ বলে বার বার আশ্বাস। বিজেপি তবু উদ্বেগ কাটাতে পারছে না মতুয়াপ্রধান এলাকায়। কারণ, এসআইআর-এর ফলে কোনও মতুয়া ভোটারের নাম কাটা যাবে না, এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারেননি। উল্টে মতুয়া মহাসঙ্ঘের দুই সঙ্ঘাধিপতি বিজেপির জনপ্রতিনিধি হওয়া সত্ত্বেও প্রকাশ্যেই মেনে নিয়েছেন যে, বেশ কিছু নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্য দিকে মতুয়া অঞ্চলে জোরদার প্রচারে নেমেছে তৃণমূল। পরিস্থিতির মোকাবিলায় এ বার পাল্টা আক্রমণের পথে নামলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। সোমবার বিধাননগর সেক্টর ফাইভে বিজেপি রাজ্য দফতরে তিনি সাংবাদিক বৈঠক শুরু করেন মতুয়া প্রসঙ্গ দিয়ে। প্রশ্নোত্তর পর্বের আগে তাঁর বক্তব্যের সিংহভাগ জুড়েই ছিলেন মতুয়ারাই। এবং মূল নিশানায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রস্তাবিত ঠাকুরনগর সফরের আগে, বিরোধী দলনেতা রাজ্যের শাসকদলের বিরুদ্ধে মতুয়া প্রশ্নে সঙ্ঘাতের সুর কিছুটা চড়িয়ে রাখতে চাইলেন বলেও অনেকে মনে করছেন। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে বলে সোমবার অভিযোগ করেন শুভেন্দু। তিনি বলেন, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর সরকার মতুয়া সমাজকে ভোটব‍্যাঙ্কের চোখে দেখেন। তাই তাঁদের মধ্যে নানা ভাবে বিভ্রান্তি তৈরি করার চেষ্টা করেন। মতুয়া ঠাকুরবাড়িতে বিভাজন ঘটানোর চেষ্টাও আমরা দেখেছি। মমতাবালা ঠাকুরকে ব্যবহার করে ঠাকুরবাড়িতে অশান্তি তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’’

শুভেন্দু তাঁর বক্তব্য দিয়ে এক দিকে যেমন তৃণমূলকে প্রতিহত করতে চাইছেন, তেমনই তাঁকে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করতে হচ্ছে বিজেপি নেতাদেরই তৈরি করে দেওয়া বিভ্রান্তি এবং আশঙ্কার পরিবেশকে।

কিছু দিন আগেই বনগাঁর বিজেপি সাংসদ তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শান্তনু প্রকাশ্য মঞ্চ থেকে বলেন, ‘‘৫০ লক্ষ রোহিঙ্গাকে ভোটার তালিকা থেকে সরাতে যদি এক লক্ষ মতুয়াকে আপাতত আত্মত্যাগ করতে হয়, তা হলে আমরা তা করব।’’ শান্তনু মতুয়া সমাজের উদ্দেশে আরও বলেছিলেন, ‘‘আপাতত ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লেও চিন্তার কারণ নেই। একবার-দু’বার ভোট দিতে হয়তো পারবেন না। কিন্তু সিএএ-র মাধ্যমে নাগরিকত্ব দিয়ে আবার ভোটার তালিকায় নাম তোলার ব্যবস্থা আমরাই করে দেব।’’ শান্তনুর দাদা তথা গাইঘাটার বিজেপি বিধায়ক সুব্রত ঠাকুরের মন্তব্যে আবার সেই আশ্বাসের সুরটুকুও ছিল না। লক্ষাধিক মতুয়া যে শুনানিতে ডাক পেয়েছেন, তা নিয়ে তাঁরাও উদ্বিগ্ন বলে সুব্রত জানিয়েছিলেন।

সিএএ-তে আবেদন করা মতুয়াদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাবে না, বা তাঁদের সকলের নাগরিকত্ব এসআইআর পর্বের মধ্যেই হয়ে যাবে, এমন প্রতিশ্রুতি বা কোনও নির্দিষ্ট পদক্ষেপের ঘোষণা নরেন্দ্র মোদী বা অমিত শাহও এখনও করেননি। যদিও আশ্বাসবাণী শুনিয়েছেন মোদী এবং শাহ দু’জনেই। গত ২০ ডিসেম্বর খারাপ আবহাওয়ার কারণে তাহেরপুরের সভায় যেতে না-পেরে মোদী কলকাতা বিমানবন্দরে বসে ফোনে ভাষণ দেন। সে ভাষণে মতুয়াদের এসআইআর-উদ্বেগ প্রসঙ্গ ছিলই না। পরে সন্ধ্যায় মোদী সমাজমাধ্যমে লিখেছিলেন, ‘‘আমি প্রত্যেকটি মতুয়া ও নমশূদ্র পরিবারকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে, আমরা সর্বদা তাঁদের পাশে থাকব।’’ আরও লিখেছিলেন, ‘‘তাঁরা (মতুয়া ও নমশূদ্ররা) তৃণমূলের দয়ায় এখানে থাকছেন না। আমাদের সরকারের আনা সিএএ-র সৌজন্যে মর্যাদার সঙ্গে ভারতে বাস করা তাঁদের অধিকার। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার শপথ নেওয়ার পরে আমরা মতুয়া এবং নমশূদ্র সমাজের জন্য আরও অনেক কিছু করব।’’ তার ১০ দিন পরে শাহ কলকাতায় সাংবাদিক বৈঠকে আনন্দবাজার ডট কমের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, ‘‘মতুয়াদের ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। যে শরণার্থীরা পশ্চিমবঙ্গে এসেছেন, তাঁরা ভারতের নাগরিক। এটা বিজেপির প্রতিশ্রুতি। তাঁদের কেউ ক্ষতি করতে পারবেন না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও পারবেন না।’’ কিন্তু মোদীর পোস্ট বা শাহের ‘জবাব’ মতুয়াদের উদ্বেগের পূর্ণ নিরসন ঘটাতে পারেনি। কারণ যে ভোটারেরা সিএএ-তে নতুন করে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেছেন, বা যাঁরা করেননি, তাঁদের কাউকেই নিশ্চিন্ত করার মতো কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এই পরিস্থিতিতেই মতুয়া ময়দানে হাজির হলেন শুভেন্দু এবং রক্ষণের ‘শ্রেষ্ঠ কৌশল’ আক্রমণকেই হাতিয়ার করে। শুভেন্দু বলেন, ‘‘সিএএ পাশ হওয়ার পরে গোটা দেশে কোথাও বিরোধিতা হয়নি। কিন্তু এখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্যা-ক্যা-ছি-ছি বলে মিছিল করতে নেমেছিলেন। বলেছিলেন সিএএ মানেই এনআরসি। তাঁর ভুল বোঝানোয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অনেকে বিভ্রান্ত হন। সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীরা তাঁদের রাস্তায় নামান। তার ফলে অনেক অশান্তি হয়, ক্ষয়ক্ষতি হয়। ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে ফাটল ধরে।’’ এনআরসির ভয় দেখিয়ে রাজ্যের সংখ্যালঘু ভোটের পুরোটাই মমতা নিজের ঝুলিতে পুরে ২০২১ সালে ভোটে জিতেছিলেন বলে শুভেন্দু দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘‘সিএএ কার্যকর হওয়ার পরে এটা প্রমাণ হয়েছে যে, এটা এনআরসি নয়। কিন্তু আবার একটা ভোট এসেছে। তাই আবার ভয় দেখাতে হবে। এ বার হাতিয়ার করেছেন এসআইআর-কে।’’

প্রমথরঞ্জন ঠাকুরের আমল থেকে মতুয়াদের ভারতীয় নাগরিকত্ব সংক্রান্ত আন্দোলন শুরু হলেও দশকের পর দশক বিষয়টি নিয়ে কোনও সরকার উপযুক্ত পদক্ষেপ করেনি বলে শুভেন্দু অভিযোগ করেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, ‘‘২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময়ে শান্তনু ঠাকুরের সমর্থনে সভা করতে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রতিশ্রুতি দিয়ে গিয়েছিলেন যে, মতুয়াদের নাগরিকত্বের ব্যবস্থা তিনি করবেন। সিএএ পাশ করিয়ে তিনি কথা রেখেছেন।’’ তার আগে পর্যন্ত কেন্দ্রে ও রাজ্যে ক্ষমতায় থাকা কংগ্রেস ও বামেরা বার বার প্রতিশ্রুতি দিয়েও মতুয়াদের নাগরিকত্বের ব্যবস্থা করেনি বলে শুভেন্দু তোপ দাগেন। তবে শুভেন্দুর আক্রমণের মূল লক্ষ্য সোমবার কংগ্রেস বা বামেরা ছিল না। ছিলেন মমতা।

মমতা মালদহের গাজোলে সভা করতে গিয়ে মতুয়া সমাজের পূজ্য গুরুচাঁদ ঠাকুরের নামকে ‘অপমানজনক’ ভাবে উচ্চারণ করেছিলেন বলে সোমবার তোপ দাগেন শুভেন্দু। বড়মার (বীণাবাণি দেবী) চিকিৎসা নিয়েও মমতা ‘অপপ্রচার’ করেছিলেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘‘মিথ‍্যাচার করে, অপপ্রচার করে মমতা হিন্দুদের দুর্বল করার চেষ্টা করছেন এবং ঠাকুরবাডিতে বিভাজন তৈরি করার চেষ্টা করছেন। আমরা এর তীব্র নিন্দা করি।’’

এই রকম এক আবহেই আবার ঠাকুরবাড়ি যাচ্ছেন অভিষেক। আগামী ৯ জানুয়ারি ঠাকুরনগরের ঠাকুরবাড়িতে গিয়ে হরিচাঁদ ঠাকুরের মন্দিরে পুজো দেবেন বলে অভিষেক ঘোষণা করেছেন। তা নিয়ে শান্তনু ইতিমধ্যেই হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন। তিনি বলেছেন, ‘‘যদি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ঠাকুরবাড়িতে পুলিশবাহিনী নিয়ে ক্ষমতা দেখাতে আসেন, আমি তাঁকে পুজো করতে দেব না।’’ ফলে কয়েক বছর আগে ঠাকুরবাড়িতে অভিষেকের সফর ঘিরে যেমন ধুন্ধুমার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, এ বারও তেমনই ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকছে। আগের বার শান্তনুর বাধায় হরিচাঁদ ঠাকুরের মন্দিরে ঢুকতে না-পারা অভিষেক এ বার আরও বেশি প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামবেন বলে অনেকে আঁচ করছেন। সেই কারণেই শুভেন্দুকেও এ বার মাঠে নামানো হল বলে একাংশের মত। এসআইআর নিয়ে এমনিতেই শান্তনু-সুব্রতদের উপরে চাপ রয়েছে। সেই চাপকে আরও বাড়াতে অভিষেক নিজে ঠাকুরনগর যাচ্ছেন। এ রকম পরিস্থিতিতে শান্তনুর হয়ে রাজ্য বিজেপি-কেও যে ময়দানে নামতে হবে, তা বিজেপি নেতৃত্ব আঁচ করেছেন। তাই ‘শান্তনুর বাড়িতে হামলার চেষ্টা’র অভিযোগ তুলে শুভেন্দু সোমবার সরব হয়েছেন বলে অনেকে মনে করছেন। ঠাকুরবাড়িতে বিভাজন ঘটিয়ে এবং মতুয়া এলাকায় বিভ্রান্তি তৈরি করে তৃণমূল ভোটে ভাগ বসানোর চেষ্টা করছে বলে তিনি দাবি করেছেন।

Matua Voters SIR BJP Matua West Bengal Politics Suvendu Adhikari
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy