অনুপ্রবেশ রুখতে সদ্য দু’দিন আগে বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া বসাতে ২৭ একর জমি বিএসএফের হাতে তুলে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। তার পরেই গত কাল রাতে দিল্লি এসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে দেখা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। আজ তিনি বলেন, ‘‘রাজ্যে ডিটেনশন কেন্দ্র গড়ার কোনও প্রশ্নই নেই। অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত হলেই তাঁদের ফেরত পাঠানো হবে।’’
অনুপ্রবেশকারীদের দেশে ফেরানোর আগে আইনি এবং অন্যান্য নানা কারণে তাঁদের ডিটেনশন কেন্দ্রে রেখে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আজ দিল্লিতে মুখ খুলেছেন শুভেন্দু। তিনি বলেন, ‘‘রাজ্যে ডিটেনশন কেন্দ্রের প্রশ্নই নেই। অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত হলে তাঁদের নিজেদের দেশে ফেরত পাঠানো হবে। কারণ এঁদের রাখলেই, তাঁদের খাওয়া-পরার যাবতীয় খরচ দিতে হবে সরকারকে। অনুপ্রবেশকারীদের জেলে রেখে ভারতীয় করদাতাদের অর্থ কেন খরচ করা হবে? চিহ্নিত হওয়ার পরেই তাদের ফেরত পাঠানো হবে।’’ অনেকের মতে, এ হল অসম-মডেল। ওই রাজ্যে যাচাইয়ের জন্য সময় দেওয়ার পক্ষপাতী নয় সে রাজ্যের হিমন্তবিশ্ব শর্মার সরকার। কারণ বিষয়টি আইনটি জটে জড়িয়ে গেলে দীর্ঘ সময় লেগে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। কিন্তু ওই মডেল মানতে গেলে সুনালী বিবির মতো অনেককেই হেনস্থার শিকার হতে হবে বলে মেনে নিচ্ছেন রাজনীতিকেরা।
এ দিন অমিত শাহ বিএসএফের একটি পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে জানান, অনুপ্রবেশ রোখার প্রশ্নে সুষ্ঠু সমন্বয় গড়ে তুলতে অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন তিনি। এ ছাড়া দ্রুত ‘ডেমোগ্রাফি মিশন’ কাজ করা শুরু করতে চলেছে বলেও জানিয়েছেন শাহ। অনুপ্রবেশের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতেই ২০২৫ সালে ওই মিশনের ঘোষণা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রীনরেন্দ্র মোদী।
অনুপ্রবেশ রুখতে দেশের পূর্ব-পশ্চিম উভয় সীমান্তেই অত্যাধুনিক সীমান্ত রক্ষা ব্যবস্থা (স্মার্ট বর্ডার) গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র। শাহ জানিয়েছেন, অনুপ্রবেশ রোখার প্রশ্নে সবচেয়ে আগে প্রয়োজন হল নিশ্ছিদ্র সীমান্ত। তাই ‘স্মার্ট বর্ডার’ প্রকল্প হাতে নিয়েছে কেন্দ্র। সীমান্ত সুরক্ষায় যে ফাঁক রয়েছে, তা মূলত ড্রোন, রেডার, ক্যামেরা এবং অন্য উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে বর্ডারকে নিশ্ছিদ্র করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।বিএসএফের অনুষ্ঠানে শাহ বলেন, কেবল অনুপ্রবেশকারীদের রোখা নয়, যাঁরা এ দেশে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে রয়েছেন, তাঁদের চিহ্নিত করে নিজেদের দেশে (মূলত বাংলাদেশে) পাঠাবে সরকার। জনবিন্যাসকে পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা কোনও ভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
পশ্চিমবঙ্গ, অসম ও ত্রিপুরায় এখন বিজেপি সরকার। নীতিগত ভাবে যারা অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে। কেন্দ্রের মতে, ওই তিনটি রাজ্যের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে গত কয়েক দশকে জনবিন্যাসের সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। যার অন্যতম কারণ হল, বাংলাদেশ থেকে হয়ে চলা অনুপ্রবেশ। পশ্চিমবঙ্গে গত চার দশকের বেশি সময় ধরে যা রুখতে আগ্রহী ছিল না বাম ও তৃণমূল সরকার। বর্তমানে কেন্দ্রে ও তিন রাজ্যে একই দলের সরকার হওয়ায় অনুপ্রবেশ প্রশ্নে কড়া নীতি নিয়ে এগোনোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, সীমান্ত পাহারার দায়িত্বে থাকা বিএসএফকে সম্পূর্ণ ভাবে অনুপ্রবেশ রোখার প্রশ্নে সক্রিয় থাকতে নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি সীমান্ত এলাকাগুলিতে ধারাবাহিক অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে কৃত্রিম ভাবে সীমান্তবর্তী এলাকার জনঘনত্ববিন্যাস পাল্টে ফেলার যে ‘চক্রান্ত’ শুরু হয়েছে, তা রোখার দায়িত্ব বিএসএফকে দিয়েছেন শাহ। শাহ বলেন, ‘‘খুব দ্রুত দেশে ‘ডেমোগ্রাফি মিশন’ শুরু হবে। দেশের জনবিন্যাসে যে পরিবর্তন হয়েছে, তা পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার লক্ষ্যেই ওই উদ্যোগ। বিএসএফের ওই অনুষ্ঠানে শাহ বলেন, ‘‘ভবিষ্যতে বিএসএফের দায়িত্ব বাড়তে চলেছে। প্রাচীন পদ্ধতি দিয়ে আর সীমান্ত সুরক্ষিত রাখা সম্ভব নয়। তাই সীমান্তে নিশ্ছিদ্র সুরক্ষার লক্ষ্যে একটি একটি নিরাপত্তা গ্রিড বানানোর প্রয়োজন রয়েছে, যাতে বিএসএফের পাশাপাশি থাকবেন রাজ্য পুলিশ, আধাসেনা, মাদক নিয়ন্ত্রণ বুরো, গোয়েন্দা ও রাজ্য পুলিশের প্রতিনিধিরা।’’
অন্য দিকে, অনুপ্রবেশ প্রশ্নে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া, সমন্বয়সাধন ও অনুপ্রবেশ প্রশ্নে সামগ্রিক নীতি প্রণয়নের লক্ষ্যে অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার মতো সমমনোভাবাপন্ন রাজ্যগুলির সঙ্গে দ্রুত বৈঠকে বসবেন বলে জানিয়েছেন শাহ। আজ শাহ জানান, কেবল অনুপ্রবেশই নয়, জাল টাকা, মাদক, গরু পাচার, মানবপাচার, ড্রোন হামলা রোখার মতো বিষয়গুলি নিয়ে সার্বিক নীতির প্রয়োজন রয়েছে। বিএসএফের ডিজি প্রবীণ কুমার জানিয়েছেন, গত এক বছরে তিনশোর কাছাকাছি ড্রোন গুলি করে নামিয়েছে বিএসএফ। যদিও প্রায় সব ক’টিই হয়েছে পাকিস্তান সীমান্তে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)