পশ্চিমবঙ্গের সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির কর্মী ও পেনশনভোগীদের মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) এবং মহার্ঘ ত্রাণ (ডিআর) সংক্রান্ত বকেয়া পর্যালোচনায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করল রাজ্যের অর্থ দফতর। সোমবার জারি হওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ২০০৮ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের বকেয়া ডিএ এবং ডিআর সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের অগ্রগতি খতিয়ে দেখতে বুধবার একটি বৈঠক ডাকা হয়েছে।
নবান্নের অর্থ দফতরের অডিট শাখা থেকে জারি হওয়া এই নির্দেশে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মী ও পেনশনভোগীদের প্রতি মাসে প্রকৃতপক্ষে কত ডিএ এবং ডিআর প্রদান করা হয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্য ইতিমধ্যেই সংগ্রহের জন্য ১২ মার্চ একটি চিঠির মাধ্যমে অনুরোধ জানানো হয়েছিল। সেই প্রক্রিয়ার অগ্রগতি পর্যালোচনা করতেই এই বৈঠকের আয়োজন করা হচ্ছে। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বৈঠকটি বুধবার বিকেল ৪টেয় নবান্নের অর্থ দফতরের কনফারেন্স হলে অনুষ্ঠিত হবে। এই বৈঠকে উপস্থিত থাকার জন্য উচ্চশিক্ষা দফতর, স্কুল শিক্ষা দফতর, জনশিক্ষা সম্প্রসারণ ও গ্রন্থাগার পরিষেবা দফতর, পুর ও নগরোন্নয়ন দফতর, সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা দফতর, পরিবহণ দফতর এবং পঞ্চায়েত ও গ্রামীণ উন্নয়ন দফতরের শীর্ষ আধিকারিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিটি দফতরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রধান বা হিসাব শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক এবং আর্থিক উপদেষ্টাকে সঙ্গে নিয়ে বৈঠকে উপস্থিত থাকতে। প্রয়োজনে অন্য কোনও আধিকারিককেও সঙ্গে আনা যেতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন অর্থ দফতরের অতিরিক্ত মুখ্যসচিব। প্রশাসনিক মহলের মতে, দীর্ঘ দিনের ডিএ বকেয়া ইস্যুতে তথ্য সংগ্রহ ও পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এই বৈঠক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া ডিএ দেওয়ার কাজ শুরু করে নবান্ন।
ঘটনাচক্রে, বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার প্রায় এক ঘণ্টা আগে ১৫ মার্চ ডিএ সংক্রান্ত বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের সমাজমাধ্যমে যে পোস্টটি করেছিলেন তাতে বলা হয়েছিল, শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী, পঞ্চায়েত, পুরসভা, সরকার অনুমদিত স্বশাসিত সংস্থা এবং সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত সংস্থাগুলিও ডিএ পাওয়ার অধিকারী। তিনি জানিয়েছিলেন, রাজ্য সরকারি কর্মচারী, পেনশনভোগী, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং বিভিন্ন অনুদানপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের রোপা ২০০৯ অনুযায়ী বকেয়া ডিএ ২০২৬-এর মার্চ থেকে দেওয়া শুরু হবে। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণাকে নিজেদের জয় হিসাবে দেখছিল সরকারি কর্মচারী সংগঠনগুলি। দেশের সর্বোচ্চ আদালত তাদের নির্দেশে চলতি বছর মার্চ এবং আগামী সেপ্টেম্বর মাসে ডিএ মিটিয়ে দেওয়ার সময়সীমা বেঁধে দেয় রাজ্য সরকারকে।
চলতি মাসে পৃথক তিনটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে ডিএ দেওয়ার কাজ শুরু করে অর্থ দফতর। একটি পোর্টাল তৈরি করে ডিএ দেওয়ার পদ্ধতিগত কাজ শুরু হয়। কিন্তু ২৩ মার্চ একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানানো হয়, দু’কিস্তিতে নয়, চলতি মার্চ মাসে একবারেই রাজ্য সরকার ডিএ-র অর্থ মিটিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একে একে বকেয়া ডিএ-র টাকা দেওয়া শুরু হয়। এ ক্ষেত্রে অভিযোগ ওঠে, রাজ্য সরকার শুধুমাত্র সরকারি কর্মচারীদেরই ডিএ দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের ডিএ দেওয়া হলেও, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-অশিক্ষক কর্মী এবং পঞ্চায়েত, পুরসভা ও অন্যান্য স্থানীয় সংস্থার অনুদানপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা বকেয়া ডিএ পাননি।
ইতিমধ্যে সরকারি কর্মচারীদের সংগঠন সংগ্রামী যৌথ মঞ্চের আহ্বায়ক ভাস্কর ঘোষ জানিয়েছেন, রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া ডিএ হিসাবে যে পরিমাণ অর্থ দেওয়া হয়েছে, তা কোথাও অর্ধেক, কোথাও আবার অর্ধেকের কম, তাই তাঁরা আবার বিষয়টি আদালতে জানাবেন। আগামী ১৫ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টে ফের ডিএ মামলার শুনানি। সেখানেই এই বিষয়টি তুলে ধরা হবে। যদিও তৃণমূলের সংগঠন এই অভিযোগ অস্বীকার করে সরকারের পাশেই দাঁড়িয়েছে। সেই আবহেই নতুন করে ডিএ এবং ডিআর সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা বৈঠক ডাকল নবান্ন।