Advertisement
E-Paper

মা তুই পর হলি, কান্না বুধন, পিঙ্কির

ব্রাজিলের দশ নম্বর জার্সি গায়ে বসা লিকপিকে শিবুকে দেখে কে বলবে ক্লাস সেভেনের ছেলে বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে গঙ্গা এ পার, ও পার করে! শিবনাথের পিঠোপিঠি দাদা লোকনাথের বাঁ উরুর পিছনে এক খাবলা মাংস উঠে যাওয়া কাটা দাগ।

ঋজু বসু

শেষ আপডেট: ০১ অক্টোবর ২০২২ ১০:১৬
বিশ্বকর্মার কাঠামো গঙ্গা থেকে তোলার পরে বুধনের ছেলে শিবু। নিমতলার ঘাটে। ছবি: দেশকল্যাণ চৌধুরী

বিশ্বকর্মার কাঠামো গঙ্গা থেকে তোলার পরে বুধনের ছেলে শিবু। নিমতলার ঘাটে। ছবি: দেশকল্যাণ চৌধুরী

মহালয়ায় ‘পিন্ডির দোকান’ দিয়েছে বুধন। চালগুঁড়ো, তিল, যব, ঘি, মধু, সুপারি, কলা…! “পিন্ডি আবার কী! লোকে শুনলে কী ভাববে! বল পিণ্ড্ …পিণ্ড্ দান”, হসন্তে চাপ দিয়ে বরকে বকে পিঙ্কি। বাপের দুরবস্থায় ফিকফিক হাসে ছোট ছেলে শিবু ওরফে শিবনাথ দাস!

ব্রাজিলের দশ নম্বর জার্সি গায়ে বসা লিকপিকে শিবুকে দেখে কে বলবে ক্লাস সেভেনের ছেলে বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে গঙ্গা এ পার, ও পার করে! শিবনাথের পিঠোপিঠি দাদা লোকনাথের বাঁ উরুর পিছনে এক খাবলা মাংস উঠে যাওয়া কাটা দাগ। সেদিকে দেখিয়ে বাপ বুধন হাসে, “এ সব আমাদের ছেলেখেলা! আমার পায়ে তো আঠারোটা সেলাই পড়েছিল। পেরেক বারো মাস ফুটতেই থাকে। তিন মাস হলে একটা করে টিটেনাস নিই। ঠাকুরের ‘কাটমা’ তুলব আর এটুকু লাগবে না।” কিন্তু এখন ভয়, কাঠামো তোলাটাই না বরাবরের মতো বন্ধ হয়ে বসে।

শিবনাথ, লোকনাথ, উপরের দাদা বিট্টু ও তাদের বাপ মিলে এ লাইনে সত্যিই টিম ব্রাজিল। জোয়ার হোক, ভাটা হোক এ গঙ্গা তাদের মায়ের কোল! নিমতলার বিখ্যাত লিট্টি ঘাটে লালচে ঘোলাটে জলের দিকে তাকিয়ে বুধন বলে, “গঙ্গার জলকে কখনও নোংরা বলবেন না! বলুন তো আমি এখনই দু’ঢোঁক খেয়ে নিচ্ছি। মড়া ভাসলেও মা গঙ্গা মা গঙ্গাই! আমাদের হাগা, মোতা, বাঁচা সব এখানে।”

পিঙ্কিকে অবশ্য ডাক্তার গঙ্গায় নাইতে মানা করেছে। সে সুলভ শৌচাগারে চান করে। কিন্তু ছট এলে তাকেও নামতে হয়। দেড় ঘণ্টাটাক গঙ্গায় থাকে। মানসিক আছে যে! তিন ছেলে আর বাপ মিলে ভাসানে গঙ্গায় ঝাঁপ দিলে পিঙ্কিও পাড়ে বসে থাকে। ঠাকুরের কাপড়টা খুলে তার হাতেই তো দেয় ওরা। এমন দশ-পনেরোটা শাড়ি হলে ১০০০-১৫০০ হাতে আসে! আর এক-এক পিস কাটমা ১৫-২০ টাকায় নেয় কুমোরটুলির পালেরা।

নেয় না কি নিত! কী বলা ঠিক হবে গুলিয়ে যায় পিঙ্কির। কয়েক বছর ধরেই বচ্ছরকার দিনটাও পাল্টে গিয়েছে। এই গঙ্গা কিনারের বাসিন্দাদের পুজোর সব থেকে বড় দিনেই নিষেধের ভ্রুকুটি! সরস্বতী, গণেশ বা বিশ্বকর্মায় এখনও জল থেকে কাটমা তোলা যায়। কিন্তু দুর্গা, লক্ষ্মী, কালী, জগদ্ধাত্রী পুজোয় অসম্ভব। পুলিশ পাড়ে ঘেঁষতেই দেবে না। মা গঙ্গার জলসীমা সে দিন তাদের কাছে বিদেশ। নিমতলার এই ঘাটে কলেজ স্কোয়ার, সিমলা ব্যায়াম সমিতি বড় বড় পুজোর ভাসান। আগে পুজো শেষ হলেই পুজো শুরু হত বুধন-পিঙ্কির। গঙ্গাদূষণ রুখতে সঙ্গত কারণেই দুর্গোৎসবে প্রতিমার কাঠামো জলে ফেলা বন্ধ করেছে প্রশাসন। পিঙ্কি বলে, “এখন ঠাকুর জলে পড়তেই দু’টো হুকগাড়ি (‌ক্রেন) টেনে তোলে। ঠাকুরটা গুঁড়িয়ে সবসুদ্ধ অন্য গাড়িতে করে ঘাট থেকে ক্লিয়ার! ছুঁতেও পারি না!”

বছর তিনেক আগে এক বার কলেজ স্কোয়ারের ঠাকুর ভাসানের সময় তক্কে তক্কে জলে ছিল বুধন। ঠাকুর পড়তেই ঝট করে কাপড়টা খুলছিল। পুলিশ সব ক্যামেরায় দেখেছে! বুধনকে ওরা ডেকে নিয়ে শ্মশানের পাশেই ফাঁড়িতে বসিয়ে রাখে রাতভর। পিঙ্কি বলে, “আচ্ছা স্যার, আমরাও তো গঙ্গা পরিষ্কার করেই ঠাকুরের সব কাটমা তুলে আনি! তাহলে দোষটা কী? গঙ্গাকে কি আমরা ভালবাসি না? আমাদের পেটেই কেন লাথিটা পড়ল!”

চক্ররেলের লাইনের দু’ধারে সারি সারি ঝুপড়ি ঘরের ছাদে এখনও রাখা টাটকা ভাসান হওয়া গণেশ-বিশ্বকর্মার কাঠামো। এ সব বেশির ভাগই বিক্রি হবে না। এই দুর্দৈবের বাজারে জ্বালানির কাজ দেবে। তবে মা দুগ্গার কাঠামোর দিকে এখনও তাকিয়ে থাকে কুমোরটুলি। তৈরি কাঠামো পেলে কালী, জগদ্ধাত্রী পুজোর চাপে সময় বাঁচে। তা ছাড়া, শিরীষ, কর্পূর বা শাল কাঠের কম দাম! ‘রিসাইকল’ করার আশাতেই পুজোয় বুধন-ছোটকাদের কাঠামোর বরাত দেয় পালমশাইয়ের লেবাররা। আজকাল অবশ্য সহজে তা জোটে না।

বুধন-পিঙ্কির ঘরটা তবু এখনও চেনা যায় মা দুগ্গার বেনারসির রঙেই। লাল, হলদে, বেগনি ঝলমলে সোনালি বুটিদার শাড়িতেই ঘরের দেওয়াল। পিঙ্কি বলে, “সব বিক্রি করতে মন করে না! একটু টিপ, সিঁদুরে আমারও শাড়ি পরতে ভাল লাগে! ঘরটাও সাজিয়েছি।” দিনভর দফায় দফায় চক্ররেলের নিঃশ্বাসের ছোবলে সে ঘর কেঁপে কেঁপে ওঠে। দু’ধারে সরে যায় মানুষ, কুকুর, বেড়াল। বাচ্চাগুলো হাতের কাছে না-থাকলে ঘরে বসে পিঙ্কির বুক কাঁপে। মহম্মদ আলি পার্কের কালী ঠাকুরের কাটমা আর নিমতলার মড়ার খাটের কাঠ দিয়ে পাকা হাতে বুধন ঘরটা দাঁড় করিয়েছে।

এ ঘরেই এলাকার এক বাবুর থেকে ধার করা ইলেকট্রিক মিটারে সন্ধেয় টিভি সিরিয়াল চলে। মোবাইলে গেম খেলে রবীন্দ্রনাথের স্কুল দি ওরিয়েন্টাল সেমিনারির ছাত্র শিবনাথ, লোকনাথ। ওরা গর্বিত, এই নিমতলাতেই ইস্কুলের সেই বিখ্যাত ছাত্রের সমাধি। ছেলেদের মন জোগাতে কোনও দিন ডিমভাজার সঙ্গে বাসি ভাত নেড়েচেড়ে ‘ফাইডরাইস’ রেঁধে দেয় মা। শাড়ি আর প্লাস্টিকের দেওয়ালের খোলা ঘর থেকে তার ফোনটা চুরি হওয়া ইস্তক পিঙ্কির ‘লক্ষ্মীর ভান্ডারে’র কিস্তি কয়েকটা বাকি পড়ে আছে। পুজোর ভাসানের রোজগার বন্ধ হতে সে এখন ভূতনাথ মন্দিরেও রুটির দোকান দিয়েছে।

বুধন ভাবে, গঙ্গামাটি, গঙ্গাজলের একটা দোকান যদি দিতে পারতাম ! তা ছাড়া কাটমা তোলা মানা হলেও জলে ভলান্টিয়ারির জন্য তো লোক নেয় পুলিশ। তখন কাঠামো জলে পড়লে ক্রেনের হুকে বিঁধে তা তুলতে হয়। কমবেশি ১০০০ টাকা হাতে আসে! তার বদলে মহালয়া, নীলষষ্ঠী, শ্রাবণী মেলায় খুচখাচ দোকান ভরসা। ঝুপড়িঘরে একটা দামি চাকাওয়ালা সুটকেস বার বার খোলে, বন্ধ করে পিঙ্কি। লকডাউনের আগে গঙ্গার ও পারে রঙ্গিলা মলে পুজোর কেনাকাটির ‘গিফট’ হিসাবে পেয়েছিল। “ছেলেগুলোকে কী দেব জানি না! এ পুজোয় হাতে ফুটোকড়িটি নেই!”

পুজো এলে ভাসানের দিনটা ভেবে তাই বুক ঠেলে কান্না আসে! ছেলেরা টো টো করে ঘোরে। সারা পুজো গঙ্গার দিকে ঠায় তাকিয়েই বসে থাকে বুধন ও পিঙ্কি। তিরিশের কোঠাতেই বুড়িয়ে যাওয়া মন। বুধন বলে, “মা দুগ্গা শেষে আমাদের পর করে দিল! ঠাকুর গঙ্গায় পড়লে আমরাও কাঁদি, তবে অন্য কারণে!”

জলই জীবন কথাটা জীবন থেকেই শেখা যে!

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy