বেলা দেড়টা। সবেমাত্র কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক শেষ হয়েছে। এ কে গোপালন ভবনের বারান্দায় পশ্চিমবঙ্গের এক নেতা দু’হাত তুলে বললেন, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য। তাহার উপরে নাই!’
চণ্ডীদাসের এই আপ্তবাক্য মেনে নিলেন সিপিএমের শীর্ষ নেতৃত্ব।
সাধারণ মানুষ ও নিচু তলার কর্মী-সমর্থকদের দাবিকে সামনে রেখেই কংগ্রেসের সঙ্গে কার্যত জোটের ছাড়পত্র আদায় করলেন আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের নেতারা। তৃণমূলকে হঠাতে কংগ্রেস-সিপিএমের জোট হোক— মানুষের এই চাহিদার সামনে হেরে গেল সিপিএমের চিরাচরিত তাত্ত্বিক অবস্থান আঁকড়ে থাকার মানসিকতা।
আজ কেন্দ্রীয় কমিটি পশ্চিমবঙ্গের সিপিএম নেতাদের কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে আলোচনা শুরু করার ছাড়পত্র দিয়েছে। বিশাখাপত্তনম পার্টি কংগ্রেসের রাজনৈতিক লাইন মাথায় রেখে কংগ্রেসের নাম করে জোটের কথা বলতে পারছে না সিপিএম। কিন্তু কেন্দ্রীয় কমিটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘তৃণমূলকে পরাস্ত করতে সিপিএম সমস্ত গণতান্ত্রিক শক্তির সহযোগিতা চাইবে, যাতে মানুষের জোট আরও মজবুত হয়। তৃণমূলকে পরাস্ত করার পাশাপাশি বিজেপি’কে বিচ্ছিন্ন করাও এর লক্ষ্য হবে’।
যার অর্থ, কী ভাবে বোঝাপড়া হবে, তা নিয়ে অধীর চৌধুরীদের সঙ্গে আলোচনা করবেন সূর্যকান্ত মিশ্ররা। মুখে জোট না বলেও তৃণমূলের বিরুদ্ধে অধিকাংশ আসনে সর্বসম্মত বিরোধী প্রার্থী দাঁড় করানোর প্রক্রিয়া নিয়েই কথা হবে। সীতারাম ইয়েচুরি বলেন, ‘‘রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলী নির্বাচনী রূপরেখা ঠিক করে পলিটব্যুরোকে জানাবে। পলিটব্যুরোকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার দিয়েছে কেন্দ্রীয় কমিটি।’’ পলিটব্যুরোয় বাংলার ৩ জন সদস্যের মাধ্যমেই যোগাযোগ রাখবেন ইয়েচুরিরা।
ইয়েচুরিদের সিদ্ধান্ত জেনে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী বলেছেন, ‘‘সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটি আজ যা বলেছে, তার মোদ্দা অর্থ হল জোট হচ্ছে। সাধারণ মানুষ ও নিচু তলায় কর্মীদের যে জোট হয়ে গিয়েছে, তাকে অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা আমার বা অন্য কারও নেই!’’ হাইকম্যান্ডের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করলেও অধীর বুঝিয়ে দিয়েছেন, জেলায় জেলায় বাম-কংগ্রেসের বোঝাপড়া এখন অনিবার্য। এআইসিসি-র তরফে বাংলার দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা সি পি জোশীর বক্তব্য, ‘‘সিপিএমের এই সিদ্ধান্তে রাজ্য নেতৃত্ব কী ভাবে সাড়া দিচ্ছেন, তা দেখতে চাই। তার পরে দু-এক দিনের মধ্যে হাইকম্যান্ডও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলবে।’’
জোটের প্রস্তুতি শুরু হচ্ছে কাল থেকেই। এক দিকে কলকাতায় রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠক বসছে। অন্য দিকে দিল্লিতে বসছেন বাম দলের শীর্ষ নেতারা। যেখানে সিপিএমের অবস্থান ব্যাখ্যা করবেন ইয়েচুরি। দলেরই বড় অংশের মতে, কেন্দ্রীয় কমিটিতে সিপিএমের আজকের সিদ্ধান্ত আক্ষরিক অর্থেই ‘ঐতিহাসিক’। বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতির বদলে তত্ত্বগত অবস্থান আঁকড়ে থাকাই সিপিএমের অভ্যাস। তা সে জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী করার প্রস্তাব খারিজ করাই হোক বা পরমাণু চুক্তির বিরোধিতায় ইউপিএ-সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার। প্রথমটিকে জ্যোতিবাবু নিজেই ‘ঐতিহাসিক ভুল’ আখ্যা দিয়েছিলেন। রাজ্যে ক্ষমতা হারিয়ে দ্বিতীয় ভুলের মাসুল দিয়েছে সিপিএম। তাই গৌতম দেব, শ্যামল চক্রবর্তী, অশোক ভট্টাচার্যেরা এ বারের সিদ্ধান্তকে ‘ঐতিহাসিক ও ইতিবাচক’ আখ্যা দেন। প্রাথমিক শর্ত হিসাবে ২০১১ সালে যারা যে কেন্দ্র জিতেছিল, তাদের সেই আসন ছেড়ে এগোনোর কথা বলেছেন শ্যামলবাবু।
আসন সমঝোতার পদ্ধতি শেষ পর্যন্ত যা-ই হোক, পার্টি কংগ্রেসের বেঁধে দেওয়া লাইন সত্ত্বেও জোটের দরজা খোলাকেই সাফল্য হিসেবে দেখছে আলিমুদ্দিন। কেরলের আপত্তি হাতিয়ার করে এস আর পিল্লাইরা নমনীয়তা দেখাতে রাজি ছিলেন না। কিন্তু বাংলায় তৃণমূল শাসনে ‘অস্বাভাবিক পরিস্থিতি’ কাটিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই আসল কাজ, এই যুক্তি দেখিয়েই জিতল আলিমুদ্দিন।
সহ-প্রতিবেদন: প্রসূন আচার্য