রাজ্যসভার তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ মৌসম বেনজির নূরকে দলে ফিরিয়ে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার মন্তব্য করেছেন, ‘‘এত দিন জানলা খুলে রেখেছিলাম। এখন দরজা খুলে দিচ্ছি!’’ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের মুখে এক দরজা খোলার পাশাপাশি অন্য দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বলেই কংগ্রেস সূত্রে ইঙ্গিত।
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসের অবস্থান কী হবে, সেই প্রশ্নে নানা জল্পনা ও সংশয় রয়েছে বিভিন্ন শিবিরে। কংগ্রেস নেতৃত্ব ধারাবাহিক ভাবে বলে চলেছেন, রাজ্যের ২৯৪টি কেন্দ্রেই লড়াইয়ের জন্য তাঁরা প্রস্তুত। আবার শেষ মুহূর্তে নির্বাচনী কৌশল কী দাঁড়াবে, সেই সম্ভাবনা প্রকাশ্যে তাঁরা খোলা রেখে দিয়েছেন। তবে দলীয় সূত্রের ইঙ্গিত, রাজ্যে বিরোধী দল হিসেবে কংগ্রেস শাসক দল তৃণমূলের সঙ্গে সমঝোতা করে নির্বাচনে লড়বে, এমন সম্ভাবনা কার্যত ক্ষীণতর হয়ে এসেছে। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই মন্তব্য করেছেন, রাজ্যে তাঁদের কংগ্রেসকে দরকার নেই। শূন্যের গেরো কাটিয়ে কিছু বিধায়ক পেতে কংগ্রেস তৃণমূলের দিকে হাত বাড়াবে কি না, সেই প্রশ্ন অবশ্য আছে রাজনৈতিক শিবিরের একাংশে। এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশনে দরবার সেরে বেরিয়ে অভিষেক যে ভাবে রাহুল গান্ধীর নাম না-করে ‘ভোট চুরি’ সংক্রান্ত প্রতিবাদের শিথিলতা নিয়ে কটাক্ষ করেছেন, তাতে পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়েছে। তৃণমূলে ‘বিক্ষুব্ধ বা হতাশ’ তেমন কোনও নেতা আগ্রহী থাকলে তাঁদের জন্য কংগ্রেসে জায়গা তৈরির দায়িত্ব হাতে নিয়েছে এআইসিসি। মৌসম যার ফসল। দলীয় সূত্রের বক্তব্য, বিশেষ হইচই না-করে কৌশলে এগিয়ে তৃণমূলের সঙ্গে সমঝোতার রাস্তা বন্ধ করে ফেলছে কংগ্রেস।
প্রদেশ কংগ্রেসের এক নেতার মতে, ‘‘রাজ্যে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা তৃণমূলের দুর্নীতি, অপশাসনের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ বিস্তর। বিজেপিকে অবশ্যই আমরা রুখতে চাই। কিন্তু তার জন্য তৃণমূলের পাশে থেকে তাদের বিরুদ্ধে থাকা ক্ষমতা-বিরোধিতার দায় আমরা নিতে যাব কেন? এই মুহূর্তে কয়েকটা আসনের জন্য ভবিষ্যতের বড় ক্ষতি ডেকে আনা হবে তাতে।’’ তাঁর আরও সংযোজন, ‘‘কংগ্রেসের উল্লেখযোগ্য শক্তি মুর্শিদাবাদ, মালদহ, উত্তর দিনাজপুরের মতো যে সব জেলায়, সেখানে দলের কেউই তৃণমূলের সঙ্গে যেতে ইচ্ছুক নন। ফের বামেদের সঙ্গে সমঝোতা না একা লড়াই, সেই প্রশ্নে দু’রকম মতই রয়েছে।’’
উত্তর দিনাজপুরে তৃণমূল থেকে বিজেপি ঘুরে আসা অমল আচার্যকে সাম্প্রতিক কালে শুভঙ্কর, মুর্শিদাবাদে তৃণমূলের জেলা পরিষদের সদস্য শাহনাজ বেগমদের অধীর চৌধুরী কংগ্রেসের পতাকা ধরিয়েছেন। এআইসিসি-ও এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে যাওয়ায় বিষয়টি অন্য মাত্রা পাচ্ছে। ভোটের রণকৌশল চূড়ান্ত করার আগে এআইসিসি প্রদেশ নেতৃত্বের মত আরও বিশদে শুনবে। এই সংক্রান্ত প্রশ্নে শুভঙ্কর বলছেন, ‘‘প্রদেশ সভাপতি হিসেবে আমার লক্ষ্য প্রতি বিধানসভায়, সম্ভব হলে প্রতি বুথে কংগ্রেসের পতাকা এবং কর্মী দেখতে পাওয়া। সেই সাংগঠনিক লক্ষ্যের কথাই বারবার বলছি।’’ এআইসিসি-র সাধারণ সম্পাদক এবং রাজ্যের পর্যবেক্ষক গুলাম আহমেদ মীরেরও বক্তব্য, ‘‘সব দলই তার নিজের সংগঠনের বিস্তার চায়। এর মধ্যে কোনও অন্যায় নেই, অন্য কিছুর সম্পর্কও নেই।’’ দিল্লিতে মৌসমকে যোগদান করিয়ে ফিরেই হুগলির পুইনানে ‘বিশ্ব ইজতেমা’র আসরে গিয়েছিলেন মীর-শুভঙ্কর।
নির্বাচনে কী অবস্থান হতে পারে, সে দিকে ইঙ্গিত করে কংগ্রেসের এক নেতার মন্তব্য, ‘‘কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কলকাতা সফরের সময়ে আমাদের সভাপতির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দেশে গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ বা মন্দির-মসজিদের রাজনীতির যে পথে বিজেপি চলছে, সেই কেতাব খুলেই এখানে তৃণমূল চলছে। এর পরে তৃণমূলের প্রতি নরম হওয়ার জায়গা কোথায়!’’ দলেরই কেউ কেউ তবু মনে করিয়ে দিচ্ছেন, রাজনীতি ‘সম্ভাবনার শিল্প’!
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)