আনন্দ-সম্মাননার সংস্কৃতি-সমাবেশের চিরসতীর্থ সঙ্গীত। এই আয়োজনের অনির্বাণ শিখা যেমন রবীন্দ্রগান, তেমনই মার্গসঙ্গীত, কাব্যগীতি, লোকায়ত গান শাখাপ্রশাখায় শিকড়মূলে আচ্ছন্ন করে রাখে আবহমান সংস্কৃতির বাস্তুতন্ত্র। ‘আনন্দ পুরস্কার ১৪৩২’ শীর্ষক আনন্দ-আয়োজনও সমপথগামী।
এ বারের সঙ্গীত-পর্বের প্রথম গানে সেই আবহমানতারই প্রতিফলন। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের ১১ বৈশাখ শিল্পী অপরাজিতা চক্রবর্তী প্রথম যে গানটি পরিবেশন করলেন, সেটি রবীন্দ্রনাথের ‘বাসন্তী, হে ভুবনমোহিনী’। দক্ষিণী সুরবিভঙ্গের ভাঙাগান। ঘটনাচক্রে, তিন দশক আগের ৭ বৈশাখ আনন্দ-সম্মাননার আয়োজনে এই গানেই তাঁর অনুষ্ঠান শুরু করেছিলেন কিংবদন্তি শিল্পী সাবিত্রীদেবী কৃষ্ণন। সে বার আনন্দ পুরস্কার প্রদান করা হয়েছিল আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আর রমাকান্ত চক্রবর্তীকে। সেই সন্ধ্যায় অশীতিপর সাবিত্রীদেবীর সঙ্গে তানপুরা-সঙ্গতে ছিলেন আর এক কিংবদন্তি শিল্পী সুচিত্রা মিত্র।
কর্নাটকের কিশোরী সাবিত্রী তখনও সাবিত্রী গোবিন্দ। থাকতেন তৎকালীন মাদ্রাজ, অধুনা চেন্নাইয়ে। ১৯২৮ সাল। হিবার্ট বক্তৃতা দেওয়ার জন্য জাহাজ ধরতে মাদ্রাজে গিয়ে অসুস্থ হলেন বছর-সাতষট্টির রবীন্দ্রনাথ। অ্যানি বেসান্তের আশ্রমে ক’দিন বিশ্রাম। শান্তিনিকেতনের প্রাক্তনী সি এন বাসুদেবন তখন বেসান্তের স্কুলে অঙ্কন-শিক্ষক। কবি গান শুনতে চাইলেন। বাসুদেবন আনলেন গোবিন্দ পরিবারের তিন কিশোরীকে। বোনেদের মধ্যে সব চেয়ে দুরন্ত বছর-পনেরোর সাবিত্রী। কবি কিছু গান শোনার পরে একা গাইতে বললেন সাবিত্রীকে। সাবিত্রী গাইলেন— ‘মীনাক্ষী মে মুদম্’— কবি-সঙ্গীতকার মুথুস্বামী দীক্ষিতরের রচিত দক্ষিণী পূর্বীকল্যাণীতে আদিতালে বাঁধা সংস্কৃত গান। রবীন্দ্রনাথ সাবিত্রীকে শান্তিনিকেতনে আসতে বললেন। পরে সাবিত্রী এলেন বোলপুরে। কিশোরী সাবিত্রীর বারে বারে ডাক পড়ত কবিকে গান শোনানোর। তেমনই এক দুপুর। কবি বললেন, মাদ্রাজে শোনানো দীক্ষিতরের গানটি ফের শোনাতে। সাবিত্রী গাইলেন— ‘মীনাক্ষী মে মুদম্ দেহি মে চ কাঙ্গী রাজ মাতঙ্গী’। হঠাৎ ঝড়ের বেগে কাগজ খুঁজতে শুরু করলেন কবি। কাগজ না পেয়ে সাবিত্রীকে বললেন— ফেলে দেওয়া কাগজের বাক্সে কিছু মেলে কি না দেখতে। সাবিত্রী ঝুড়ি থেকে তুলে আনলেন ফেলে দেওয়া খাম। তাতে কবি লিখলেন— ‘বাসন্তী, হে ভুবনমোহিনী’ গানটি। বাংলা বয়ানটি গাইতে বললেন সাবিত্রীকে। জন্ম নিল দক্ষিণী বসন্ত-পঞ্চমে প্রকৃতি-পর্যায়ের কাহারবা-নিবদ্ধ এই গান।
তিরিশ বছর আগের আনন্দ-আয়োজনে মূল গানের অংশ গেয়ে রবীন্দ্রনাথের এই গানটি পরিবেশন করেছিলেন সাবিত্রীদেবী। এ বার একই গান মূর্ত হল অপরাজিতা চক্রবর্তীর সুকণ্ঠে। এসরাজ-বাদনে সবার মন-ছুঁয়ে যাওয়া অপরাজিতা কণ্ঠগানের এই পর্যায়ে ইতিহাসেরই উত্তরাধিকারী হলেন। দক্ষিণী সুরে দাপট আর লাবণ্য হাত-ধরাধরি করে চলে। ভারী মুখের তবলা আর অতুলনীয় এসরাজ সহযোগে অপরাজিতার গায়কি সম্ভ্রম জানাল দুই আঙ্গিককেই।
পিলু রাগকে উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ঠুংরি-ধুনের সহজ-প্রেয় আধার বলে মনে করে। বাংলাগানের বৈঠকী-দুনিয়া পিলুকে চটুল-মজলিশি শরীরেই যাচনা করে এসেছে। ব্যতিক্রম— নিধুবাবু, শ্রীধর কথকেরা। কিন্তু সার্বিক ভাবে পিলুকে হালকা ভাবেই নিয়েছে গানভুবন। কিন্তু যা কিছু প্রচল, তাকেই প্রকরণ মানা রবীন্দ্রনাথের ব্যাকরণ নয়। তাই কাফি ঠাটের এই মায়াকে রবীন্দ্রনাথ প্রেম-বিরহ-প্রার্থনার মাধুকরীতে শ্রেয় মনে করেছেন। তাই পিলুতে ‘চোখের জলের লাগল জোয়ার’, ‘আহা তোমার সঙ্গে প্রাণের খেলা’র মতো চর্যাপদী গুপ্তসূত্রপথ। সেই আগলভাঙা চর্যাপালকই উড়ে এল আনন্দসন্ধ্যায়। অপরাজিতা তাঁর দ্বিতীয় রবীন্দ্রগান ধরলেন— ‘অলি বার বার ফিরে যায়’। মিশ্র পিলুর দাদরা। সাতাশ বছরের তরুণ রবীন্দ্রনাথের এই রচনায় পিলুর চল খানিক গৌরকীর্তনের। এবং তাতে অকল্পনীয় সঞ্চারী। বাংলা কাব্যগীতিতে সঞ্চারী প্রবর্তনে রবীন্দ্রনাথ গানের আইনস্টাইন। আইনস্টাইন যেমন বলেছিলেন— ‘আই অফন থিংক ইন মিউজ়িক’, তেমনই তাঁর গানের সঞ্চারীতে রবীন্দ্রনাথ তাঁর সুহৃদ বিজ্ঞানসাধকের মতোই চতুর্থ ‘ডাইমেনশন’-এর প্রতিষ্ঠা ঘটাতেন। অলির বার বার ফিরে আসা-যাওয়ার মাঝে সঞ্চারীতে নিভৃত-কামনার যে আশামেঘটুকু জমে থাকে, তা যেন কোনও সঞ্চয়বৃষ্টির— তাই সঞ্চারীতে সম্ভবত দেশ রাগের জলকণা ভেসে আসে। স্নিগ্ধ শ্রীখোল-সঙ্গতের সাহচর্যে অপরাজিতা অনবদ্য গাইলেন এ গান।
আনন্দ-আয়োজনের তৃতীয় রবীন্দ্রগান পূজা পর্যায়ের— ‘এত আনন্দধ্বনি উঠিল কোথায়’। বাহার-নিবদ্ধ ধামার। এই ভাঙাগানের রচনাকালে রবীন্দ্রনাথ ২৪ বছরের। মাঘোৎসব উপলক্ষে বাঁধা পাঁচ পঙ্ক্তির গান। পুরো গানটিই ব্রহ্মসূত্রসন্ধানী প্রশ্ন বা বিস্ময়াবেশ। মূল গান রঙ্গরস-রচিত ‘আজু ব্রজ মে সইয়াঁ খেলোঙ্গি হোরি’। মূল গানটিও পাঁচ পঙ্ক্তির। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গানটি ভাবের দিক থেকে পুরোপুরি আলাদা। রবীন্দ্রনাথের এ-গানে প্রেমের সুরচলন বাঁক নেয় ব্রহ্মসঙ্গীতে। ধ্রুপদে-ধামারে যে চেনা বিষ্ণুপুরী আঙ্গিক, তা যে রবীন্দ্রনাথে অন্তত নিখাদ বিষ্ণুপুরী নয়, বরং অনেক আঙ্গিকের সঙ্গমলব্ধ, পাখোয়াজের সঙ্গে অপরাজিতার পরিবেশনে তা সুন্দর ভাবে প্রতিভাত হল।
আনন্দসন্ধ্যায় অপরাজিতা এবং তাঁর দুই সুদক্ষ সতীর্থ— তালবাদ্যে তুহিন সেনগুপ্ত আর এসরাজে তথাগত মিশ্র প্রথম তিনটি গানে রবীন্দ্রবিশ্বে সুচারু পরিভ্রমণ করলেন। শান্তিনিকেতনে প্রশিক্ষিত অপরাজিতার তিন সপ্তকে অবাধ বিচরণ, স্পষ্ট উচ্চারণ, অমোঘ স্বরপ্রয়োগ মোহিত করল। এর পরে, অনুষ্ঠানের শেষ গানে, আনন্দ-আয়োজন উত্তরাধিকারের আর এক মোড়ে এসে দাঁড়াল। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘প্রভু নষ্ট হয়ে যাই’ কবিতার সুরারোপিত বয়ান পেশ করলেন অপরাজিতা। বাংলা কবিতায় সুরারোপ করে বেশ কিছু সার্থক-সুন্দর গান জন্ম নিয়েছে। তথাগত মিশ্র সুরারোপিত শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বহুশ্রুত এই কবিতাটির গানরূপ তাতে নতুন মাত্রা যোগ করল। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে দীক্ষিত তথাগত কবিতাটিতে কাফির অনুপম প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। গানের সুরচলন টপ্পাঙ্গের। বিস্তারধর্মী স্বরক্ষেপণ। স্বরান্ত শব্দের দীর্ঘ উচ্চারণ। এ-গানেও শ্রোতাদের চমকিত করলেন অপরাজিতা। রবীন্দ্রনাথের ভাঙাগান দিয়ে শুরু হয়ে বাংলা কাব্যগীতির যে যাত্রা শুরু হয়েছিল এ বারের আনন্দ-আয়োজনে, সাফল্যের সঙ্গে তা ধারাবাহিকতায় লীন হল এই নান্দনিক প্রয়াসে।
এ বার আনন্দসন্ধ্যায় সম্মানিত পরিমল ভট্টাচার্যের উপন্যাস ‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’ শিকড়ের প্রত্নসন্ধানী। তাঁকে সম্মাননা-অর্পণের সাঙ্গীতিক আনন্দ-আয়োজনটিও বাংলা কাব্যগীতি, মার্গগান এবং কাব্যে নিহিত সুরের আবহমানতার কাঁটাতারহীন চিরস্বাধীন শিকড় স্পর্শ করল।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)