আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে এ বছর নিস্তব্ধ রইল পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্তের নো-ম্যান’স ল্যান্ড। প্রায় পঁচিশ বছর ধরে চলে আসা দু’দেশের যৌথ ভাষা উৎসব গত বছরের মতো এ বারও সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় কাঁটাতারের দু’পারে ভিড় করেও মন ভরল না ভাষাপ্রেমীদের। বিএসএফের কড়া পাহারায় বন্ধ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ফিরে যেতে হল বহু মানুষকে।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বনগাঁ পুরসভা, ছয়ঘরিয়া পঞ্চায়েত ও বনগাঁ পঞ্চায়েত সমিতির উদ্যোগে এ দেশের আয়োজন হত। ২১ ফেব্রুয়ারি নো-ম্যান’স ল্যান্ডে ভাষা শহিদ রফিক, সালাম, বরকত, সফিউর, জব্বারের স্মৃতিবেদিতে মাল্যদান করা হত। দু’দেশের অতিথিদের মধ্যে মিষ্টি ও ফুলের তোড়া বিনিময়, আলিঙ্গন, ভাষা ও বন্ধুত্বের বার্তা— সব মিলিয়ে সীমান্ত পরিণত হত মিলন মেলায়। উদাত্ত কণ্ঠে ভেসে আসত গানের সুর, “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি...।” সীমান্তে টাঙানো থাকত শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার ছবি। কাঁটাতারের দু’পারে দাঁড়িয়ে হাজার মানুষ সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকতেন।
এ বার সকাল থেকেই সীমান্তে ভিড় জমাতে শুরু করেন বহু মানুষ। নাটাবেড়িয়ার বাসিন্দা কৃষ্ণা হালদার বিএসএফের অনুমতি নিয়ে নো-ম্যান’স ল্যান্ডের বন্ধ দরজার সামনে এসে দাঁড়ান। ওপারে একই ভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁর খুড়তুতো বোন রাধা, যিনি বাংলাদেশের কুষ্টিয়া থেকে বেনাপোলে এসেছিলেন।
শোনা গিয়েছিল, ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানের সময়ে সাময়িক ভাবে গেট খুলে দেওয়া হতে পারে। সেই আশাতেই দুই বোন এসেছিলেন। কিন্তু এ বছর কোনও অনুষ্ঠানই না হওয়ায় দূর থেকে হাত নেড়ে ফিরে যেতে হল তাঁদের। কৃষ্ণা বললেন, “কাকার পরিবার বাংলাদেশেই রয়ে গিয়েছেন। ভেবেছিলাম, অন্তত দু’টো কথা বলব। কিন্তু দূর থেকে দেখেই ফিরতে হল।’’
বনগাঁর গৃহশিক্ষক হরিপদ বিশ্বাস প্রতি বছরের মতো এ দিন ছাত্রছাত্রীদের ছুটি দিয়ে সাইকেলে চেপে পেট্রাপোলে আসেন। বললেন, “করোনার বছরেও অনুষ্ঠান হয়েছিল। এ বছর হতাশ হলাম। আশা করি, আগামী বছর আবার আগের মতো অনুষ্ঠান হবে।”
বনগাঁ নাকপাড়ার বাসিন্দা বিল্টু মণ্ডল ও তাঁর স্ত্রী সৌমিতাও এ দিন সীমান্তে এসে শুনশান দৃশ্য দেখে হতাশ। শ্রীপল্লির প্রবীণ বাসিন্দা অরুণ চক্রবর্তী বলেন, “দু’দেশের একই ভাষাভাষী মানুষের মেলবন্ধনের দিন ছিল এটা। পরম্পরা এ বছর রক্ষা করা গেল না, তবে আশা ছাড়ছি না।”
বকচরার একটি বেসরকারি স্কুল থেকে শিক্ষক-শিক্ষিকারা পড়ুয়াদের সীমান্তে এনেছিলেন ভাষা উৎসব দেখাতে। অনুষ্ঠান না হওয়ায় হতাশ মুখে নো-ম্যান’স ল্যান্ডের বন্ধ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে মোবাইলে ছবি তুলে ফিরে গেলেন তাঁরা।
কেন বন্ধ হল যৌথ উৎসব?
গত বছরও যৌথ উৎসব হয়নি, যদিও পেট্রাপোলে আলাদা ভাবে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু এ বছর তাও হয়নি। ২০২৪ সালের ৫ অগস্ট বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়। পরিস্থিতির জেরে দু’দেশের প্রশাসনিক স্তরে সমন্বয় সম্ভব হয়নি বলে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন। সীমান্তের ভাষা উৎসবের অন্যতম আয়োজক বনগাঁ পঞ্চায়েত সমিতির পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ প্রসেনজিৎ ঘোষ বলেন, “১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে ভোট হয়, ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার গঠিত হয়। এত কম সময়ে ও দেশের সঙ্গে আলোচনা করা সম্ভব হয়নি। আশা করছি, আগামী বছর আবার এক সঙ্গে ভাষা উৎসব করা যাবে।”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)