×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

০৫ অগস্ট ২০২১ ই-পেপার

কল্পতরু হয়ে বাম গড়ে জয় জাকিরের

নিজস্ব সংবাদদাতা
রঘুনাথগঞ্জ ২১ মে ২০১৬ ০২:৩৯
জয়ের হাসি। তৃণমূল প্রার্থী জাকির হোসেনকে নিয়ে উচ্ছ্বাস কর্মী-সমর্থকদের। অর্কপ্রভ চট্টোপাধ্যায়ের তোলা ছবি।

জয়ের হাসি। তৃণমূল প্রার্থী জাকির হোসেনকে নিয়ে উচ্ছ্বাস কর্মী-সমর্থকদের। অর্কপ্রভ চট্টোপাধ্যায়ের তোলা ছবি।

শুরুতেই বড় সাফল্য। সিপিএমের খাস তালুকে জয় পেলেন সদ্য রাজনীতিতে যোগ দেওয়া তৃণমূল প্রার্থী জাকির হোসেন। হারালেন কংগ্রেসের বর্ষীয়ান বিধায়ক সোহরাব হোসেনকে। সিপিএমের জেলা সম্পাদক মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্যেরও খাসতালুক বলে পরিচিত জঙ্গিপুর। দীর্ঘদিন ধরেই জঙ্গিপুর পুরসভা বামেদের দখলে। এ সব কিছুকে সরিয়ে জাকির ২০,৬৩৩ ভোটে জঙ্গিপুর থেকে জয়ী হলেন। আর জেতার পরই জঙ্গিপুরজুড়ে একটাই জল্পনা—জাকির মন্ত্রী হতে পারেন। এই জল্পনাতে মজেছে জঙ্গিপুর।

গত লোকসভায় জঙ্গিপু্রে কংগ্রেসের প্রাপ্ত ভোট ছিল প্রায় ৪৩ হাজার। সিপিএম ভোট পেয়েছিল ৫২ হাজার। তৃণমূলের বরাতে জুটেছিল সাকুল্যে ২৯ হাজার ভোট। এ বার জাকির ৬৬,৮৬৯ পেয়ে বিধায়ক হলেন।

তবে একটু কান পাতলেই জঙ্গিপুর জুড়ে এটাকে অর্থের জয় বলা হচ্ছে। বিড়ি ও একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মালিক জাকিরের অর্থের অভাব নেই। বিরোধীদের অভিযোগ, টাকা ছড়িয়ে জাকির কার্যত ভোট কিনেছেন। জাকিরের টাকা ছড়ানোর পদ্ধতিটাও বেশ অভিনব।

Advertisement

প্রার্থী হওয়ার আঁচ পেয়েই তিনি গোটা বিধানসভা এলাকা নিজের ছবি সংবলিত পোস্টার-ব্যানারে ছেয়ে দেন। এতেই বহু লক্ষ টাকা খরচ করেন। জেলার রাজনৈতিক ধারণা ছিল, জঙ্গিপুরে সিপিএমের সঙ্গে অন্য দলের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। জয়-পরাজয় নির্ধারণ টেনেটুনে হাজার খানেক ভোটে। কিন্তু সে সব কিছুই হল না। যদিও বিরোধীরা দাবি করছে, আসলে অর্থের কাছে হেরে গিয়েছে তারা। বেলাগাম টাকা ছড়িয়ে ভোট করিয়েছেন জাকির। মূলত বিড়ি মালিক ও ব্যবসায়ী হিসেবে জাকিরের পরিচিতি। প্রচারে তিনি সরাসরি রাজনীতির কথা বলেননি। সর্বত্রই শুনিয়েছেন উন্নয়নের কথা। তিনি জানেন রাজনীতির কথাতে বিতর্ক বাঁধবে। মানুষের কাছে উন্নয়নের স্বপ্ন ফেরি করেছেন। রাস্তা-ঘাট-পানীয় জলের সমস্যার কথা বলেছেন। সমাধানের আশ্বাসও দিয়েছেন।

জামুয়ার পঞ্চায়েতের এক গ্রামে গিয়ে প্রচারে গিয়ে শুনেছেন জল সমস্যা। শুনেই বকলমে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার নামে ওই গ্রামে জলের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এই ভাবে গ্রামে গ্রামে ঘুরে সমস্যা মেটানোর চেষ্টা করেছেন। সিপিএমের ‘গড়’ বলে পরিচিত একাধিক গ্রামে গিয়ে পানীয় জলের সমস্যা মিটিয়ে দিয়েছেন। সে সব এলাকায় কার্যত একচেটিয়া ভোট পেয়েছেন জাকির।

বিরোধী নেতারা জানাচ্ছেন, স্রেফ টাকার জোরেই জাকিরের এই জয় এসেছে। তিনি অবশ্য জানাচ্ছেন, জেতার পরও তিনি পাখির চোখ করবেন পানীয় জলের সমস্যাকে। ভোটে জিতেই জাকিরের ঘোষণা, ‘‘দিন সাতেকের মধ্যেই জলের সমস্যা মেটানোর কাজ শুরু করব। নিজেই অর্থেই চলবে কাজ। জেলায় আরও বিভিন্ন রকমের শিল্প গড়তে চাই। রাজনীতির রং দেখে কাজ করতে চাই না।”

কংগ্রেস প্রার্থী সোহরাবের নির্বাচনী এজেন্ট হাসানুজ্জামান বলেন, ‘‘জাকির সেই অর্থে মার্কামারা রাজনীতিক নন। জাকিরের কর্মসংস্থানের আশ্বাসকে বিশ্বাস করেছেন বেকার যুবক-যুবতীরা। তাঁদের বিরাট অংশের সমর্থন পেয়েছেন তিনি। তাছাড়া জোট নিয়ে সিপিএম-কংগ্রেস যখন দর কষাকষি করছিল, তখন থেকেই জাকিরের প্রচার শুরু হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া দেদার টাকা ছড়ানো তো হয়েছিলই।’’

সিপিএম প্রার্থী সোমনাথ সিংহরায়ও মানছেন জঙ্গিপুরে জোটের প্রার্থী নিয়ে দোদুল্যমানতা ক্ষতি করেছে তাঁদের। তার কথায়, “শাসক দলের প্রার্থীর অর্থের বাহুল্য তো ছিলই। তাছাড়া জাকির কার্যত প্রচারে ঝড় তুলেছিলেন।’’ জঙ্গিপুর পুরসভা থেকে পঞ্চায়েত এলাকা— সর্বত্রই সিপিএমের আধিপত্য। তা সত্ত্বেও দলীয় প্রার্থীর শোচনীয় হারে বিব্রত মৃগাঙ্কবাবু। তিনি এটাকে অঘটন বলে মনে করছেন।

বৃহস্পতিবার দুপুরে জয়ের খবর পেয়ে দলবল নিয়ে গণনা কেন্দ্রে যান জাকির। সেখানেই দেখা হয় পরাজিত প্রার্থী ‘মাস্টার মশাই’ মহম্মদ সোহরাবের সঙ্গে। একে অপরের দিকে হাত বাড়িয়ে দেন। রঘুনাথগঞ্জ-১ ব্লকের তৃণমূলের সভাপতি মুক্তিপ্রসাদ ধর বলছেন, “জাকির কাজের ছেলে। শিল্পপতি হিসেবে জেলায় পরিচিত মুখ। উনি মন্ত্রী হলে জঙ্গিপুরে উন্নয়নের বান আসবে।’’ আর জাকির বলছেন, ‘‘মন্ত্রী কে হবেন, তা ঠিক করবেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি যা নির্দেশ দেবেন সেই অনুযায়ীই কাজ করব।’’

Advertisement