ভোটের ফল প্রকাশের পরে বিধায়কদের প্রথম বৈঠকে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই তাঁর সামনে ‘ঢাল’ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। এ বার ভোট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে দলীয় বৈঠকেই প্রশ্নের মুখে পড়লেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। দলনেত্রী মমতার উপস্থিতিতেই মঙ্গলবার ঘুরিয়ে এই প্রশ্ন তুলেছেন নবনির্বাচিত বিধায়কদের একাংশ।
ফল প্রকাশের পর থেকে দলের অনেকের সমালোচনার মুখে পড়েছেন অভিষেক। কালীঘাটে তৃণমূলের বিধায়কদের নিয়ে বৈঠকে সেই পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছে অভিষেককে। পরিষদীয় দল নিয়ে আলোচনা করতে মমতা এ দিন যে বৈঠক ডেকেছিলেন, সেখানেই একাধিক বিষয় নিয়ে মুখ খুলেছেন তৃণমূলের বিধায়কেরা। সেই প্রশ্নের কেন্দ্রে ছিলেন ফলতার নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো দলীয় প্রার্থী জাহাঙ্গির খান। দলে অভিষেকের ‘আস্থাভাজন’ জাহাঙ্গিরকে নিয়ে প্রশ্ন তোলেন দুই বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা। তাঁরা বলেন, ‘জাহাঙ্গির যা করেছে, তা শৃঙ্খলাভঙ্গের শামিল। কেন তাঁকে বহিষ্কার করা হল না’? তখনই দলের আর এক বিধায়ক কুণাল ঘোষ বলেন, ‘দলের মুখ পুড়িয়েছে জাহাঙ্গির’। প্রসঙ্গত, দিন কয়েক আগে বিধায়কদের সঙ্গে প্রথম বৈঠকেই এ বারের ভোটে তাঁর ভূমিকাকে স্বীকৃতি জানাতে মমতার নির্দেশে সকলে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানিয়েছিলেন অভিষেককে।
অভিষেকের নির্বাচনী কেন্দ্র ডায়মন্ড হারবারে ফলতা থেকেই বিরাট ‘লিড’ পেত তৃণমূল। ভোটের প্রচারে গিয়ে সাংসদ বলেছিলেন, জাহাঙ্গির শ্মশান চেয়েছিলেন, সেখানে বৈদ্যুতিক চুল্লি হবে। যাঁদের ৪ মে-র পরে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু হবে, তাঁদের সেখানে সৎকার হবে! এ কথা উল্লেখ করেই সন্দীপন, ঋতব্রতেরা প্রশ্ন করেন, এত ‘প্রশ্রয়ে’র পরে এখন কোনও ব্যবস্থা হবে না কেন? তাঁদের মতে, দলকে বিপন্ন করে প্রার্থী জাহাঙ্গির লড়াইয়ের ময়দান থেকে পালিয়েছেন! খানিকটা চাপে পড়েই অভিষেক জানিয়ে দেন, ‘দল বিবৃতি দিয়েছে’। প্রসঙ্গত, জাহাঙ্গির সরে দাঁড়ানোর কথা জানানোর পর তৃণমূলের তরফে তার নিন্দা করে জানানো হয়, ওই সিদ্ধান্ত দলের নয়। প্রার্থীর ‘ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত’।
ওই বৈঠকেই কলকাতায় তাঁর সম্পত্তি নিয়ে শুরু জল্পনা নিয়ে মুখ খুলেছেন অভিষেক। এই সম্পর্কে মমতা বলেন, ‘ওরা ( বিজেপি ) অভিষেক আর আমাকে গ্রেফতার করতে চায়। যা খুশি করতে পারে! আমি মাথা নত করব না।’ আর অভিষেক প্রথমে বলেছেন, ‘এখানে আরও অনেক অভিষেক থাকতে পারে।’ একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, বেআইনি নির্মাণের কথা বলে তাঁর বাড়িতে যে নোটিস পাঠানো হয়েছে তাতে, অনিয়ম কোথায়, তার কোনও উল্লেখ নেই।
কালীঘাটে এ দিনের বৈঠকে ভোট-পরবর্তী সন্ত্রাসের প্রেক্ষিতে দলের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিধায়কদের অনেকে। কুণাল বলেছেন, ‘বুলডোজ়ার’ দিয়ে উচ্ছেদের বিরোধিতা করে সিপিএম নেমে পড়েছে। আমরা ঘরে বসে আছি। রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে হবে’ মমতা ও অভিষেকের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ভোট-পরবর্তী সন্ত্রাস সামাল দিয়ে কর্মীদের ঘরে ফেরানো হলেও নতুন করে মামলা করা হচ্ছে। অবিলম্বে রাজ্য স্তর থেকে আইনি সাহায্য দিতে হবে’। মমতা সেই সাহায্যের আশ্বাস দিয়ে কয়েকটি কর্মসূচি নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। ‘জীবন- জীবিকা রক্ষা’র স্লোগানে আগামী ২১ মে হাওড়া, শিয়ালদহ ও বালিগঞ্জে বুলডোজ়ার অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে তৃণমূল।
সূত্রের খবর, দল পরিচালনা নিয়ে অসন্তোষ জানিয়ে বৈঠকে মমতার উদ্দেশে কুণাল বলেছেন, ‘দিদি, আমরা যাতে নিজেদের কথাও বলতে পারি, সে ব্যবস্থা করা দরকার’। তাঁকে সমর্থন করেন অনেকেই। তখনই অভিষেক বলেন, ‘আমি দফতরেই থাকি। সকলের সঙ্গে কথা বলব’। বিধানসভায় বিরোধী দল ও দলনেতার স্বীকৃতি নিয়ে যে টানাপড়েন চলছিল, তা কাটাতে এ দিন প্রয়োজনীয় চিঠি তৈরি হয়েছে। বিধানসভার সচিবালয়েরপরামর্শ মতোই তা জমা দেওয়া হবে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)