কংগ্রেস থেকে তৃণমূলে গিয়েছিলেন ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে। সাত বছর পর সেই জানুয়ারি মাসেই তৃণমূল থেকে কংগ্রেসে ফিরলেন রাজ্যসভার সাংসদ মৌসম বেনজির নুর। শনিবার তিনি দিল্লির ২৪ নম্বর আকবর রোডে কংগ্রেস দফতরে গিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে পুরনো দলে যোগ দিলেন।
মৌসমের যোগদান কর্মসূচিতে দিল্লিতে উপস্থিত ছিলেন প্রবীণ কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ, পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেসের পর্যবেক্ষক গোলাম আহমেদ মির, প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার এবং মালদহ দক্ষিণের কংগ্রেস সাংসদ তথা সম্পর্কে মৌসমের দাদা ইশা খান চৌধুরী। মৌসম কংগ্রেসে ফিরে আসার পর সাংবাদিক বৈঠকে ইশা বলেন, “ওঁর রক্তে কংগ্রেস রয়েছে। অন্য দলে যাওয়ার ফলে আমাদের পরিবারের মধ্যেও বিভাজন তৈরি হয়েছিল। আজকে সব বিভাজন ঘুচে গেল।”
কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার আগে মৌসম নুর। রয়েছেন কংগ্রেসের অন্য নেতারাও। ছবি: সংগৃহীত।
মৌসমকে কংগ্রেস থেকে তৃণমূলে যোগ দেওয়ানোর নেপথ্যে ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। সাত বছর আগে শুভেন্দুই ছিলেন মালদহ, মুর্শিদাবাদে তৃণমূলের পর্যবেক্ষক। তিনিই মৌসমকে নিয়ে নবান্নে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। তখন অবশ্য শুভেন্দু তৃণমূলে ছিলেন।
ইতিমধ্যেই তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ইস্তফাপত্র পাঠিয়েছেন মৌসম। তিনি জানিয়েছেন, রাজ্যসভার সাংসদপদ থেকেও ইস্তফা দেবেন। আগামী সোমবার রাজ্যসভার চেয়ারম্যানের দফতরে সেই চিঠি জমা দিতে যাবেন তিনি। রাজ্যসভায় মৌসমের মেয়াদ আর কয়েক মাস। কিন্তু তার আগেই সেই পদ ছেড়ে দিতে চলেছেন তিনি। মৌসম বলেন, ‘‘আমি বরকত (বরকত গনিখান চৌধুরী) সাহেবের পরিবারের সদস্য। তাঁর ঐতিহ্য বহন করছি। পারিবারিক ভাবেই আমরা কথা বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, কংগ্রেসে ফিরব।’’
তবে তৃণমল নিয়ে কোনও রকমের নেতিবাচক মন্তব্য করেননি মৌসম। তিনি বলেন, ‘‘আমি কয়েক বছর আগে তৃণমূলে গিয়েছিলাম। তবে তৃণমূলও আমাকে কাজ করার সুযোগ দিয়েছিল। আমাকে রাজ্যসভার সাংসদ করেছিল, জেলা সভাপতির দায়িত্ব দিয়েছিল।’’ কংগ্রেস দফতরের সাংবাদিক বৈঠকেও মমতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে ‘আমাদের নেত্রী’ বলে সম্বোধন করেন মৌসম।
মৌসমের রাজনীতির মূল জায়গা মালদহ। তাঁর তৃণমূল ছেড়ে কংগ্রেসে যাওয়ার ফলে কি মালদহে ধাক্কা খাবে শাসকদল? রাজ্যসভার সাংসদের কংগ্রেসে যোগদান নিয়ে তৃণমূলের মুখপাত্রেরা জানিয়ে দিচ্ছেন, দলের তরফে কোনও ধরনের প্রতিক্রিয়া দেওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ঘটনাচক্রে, তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যখন উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ারের কর্মসূচি শেষ করে ফিরছেন, সেই সময়ে মালদহের তৃণমূলে ভাঙন ধরল। মৌসমের কংগ্রেসে যোগদানের ঘটনায় স্তম্ভিত তৃণমূলেরও অনেকে। দলের এক লোকসভার সাংসদের কথায়, ‘‘কারও কাছে কোনও আভাস ছিল না। থাকলে তিন দিন আগে দল কখনও মৌসমকে বিধানসভাভিত্তিক সমন্বয়কের দায়িত্বে রাখত না। পুরোটাই আকস্মিক ভাবে ঘটেছে।’’
বিধানসভা ভোটে কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে বামেদের সঙ্গে জোট করবে, না কি একক ভাবে লড়াই করবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। কিন্তু মৌসমের চোখে রাজ্য রাজনীতিতে মূল বিরোধী কে? তৃণমূল থেকে কংগ্রেসে যাওয়া নেত্রী বলেন, ‘‘যে দল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে লড়বে তারা বিরোধী। তবে সার্বিক ভাবে কংগ্রেসের কাছে প্রধান বিরোধী দলের নাম বিজেপি-ই।’’
তৃণমূল ছেড়ে কংগ্রেসে গেলেও মৌসম স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তাঁর চোখে প্রধান বিরোধী পদ্মশিবিরই। আর কংগ্রেসের জোট ভবিষ্যৎ কী হবে? এ প্রসঙ্গে মৌসমকে প্রশ্ন করা হলেও প্রবীণ নেতা জয়রাম নিজেই জবাব দিতে চেয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘‘আমাদের উদ্দেশ্য কংগ্রেসকে মজবুত করা। কংগ্রেস মজবুত হলে তবে জোট মজবুত হবে। কংগ্রেস দুর্বল হলে জোটও দুর্বল হবে।’’ কিন্তু সেই জোট কাদের সঙ্গে? বামেদের সঙ্গে? না কি তৃণমূলের সঙ্গে? জয়রাম তার কোও সুস্পষ্ট জবাব দেননি।
গত দেড় দশক ধরে মমতা তথা তৃণমূলের দিকে সংখ্যালঘুদের সমর্থন থাকলেও আগামী বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে নানা কারণে তা নিয়ে প্রশ্ন, কৌতূহল তৈরি হয়েছে। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদের নেতা হুমায়ুন কবীর নতুন দল গড়ে তৃণমূলকে ‘শিক্ষা দেওয়া’র ডাক দিয়েছেন। আবার সংখ্যালঘু অধ্যুষিত মালদহের নেত্রী মৌসম তৃণমূল ছেড়ে কংগ্রেসে ফিরে গেলেন। ফলে পাশাপাশি দুই জেলার সমীকরণ নিয়ে শাসকদলের অন্দরেও আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছে।